—শেকড়, সংগ্রাম ও প্রত্যয়: বাঙালি জাতীয়তাবাদের অপরাজেয় অভিযাত্রা
“তুমি কে? আমি কে? বাঙালি, বাঙালি!”
ইতিহাসের রাজপথ থেকে একাত্তরের রণাঙ্গন, এই স্লোগান বারবার ফিরে এসেছে। প্রশ্নটা সহজ, অথচ গভীর। উত্তর এক শব্দে, কিন্তু সেই শব্দের ভেতরে হাজার বছরের ইতিহাস জেগে আছে: বাঙালি।
যে পরিচয় এতবার প্রাণের বিনিময়ে রক্ষা করতে হয়েছে, তার মূল্য বোঝা দরকার। পরিচয় উত্তরাধিকারে মেলে, কিন্তু টিকে থাকে শুধু যত্নে। শক্ত করে না ধরলে সে নিঃশব্দে হাত থেকে সরে যায়, আর আজকের প্রজন্মের হাতেই এখন তার পাহারা।
▪️শেকড়ের কথা
আমরা হঠাৎ জন্মানো জাতি নই। চর্যাপদে আমাদের ভাষা প্রথম নিজের গলায় কথা বলেছে। সওদাগরের ডিঙা নদী বেয়ে সাগর ছুঁয়েছে। পাহাড়পুরের বিহার, জোড়বাংলার মন্দির আর বরেন্দ্রের মসজিদ একই মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে। লালনের গান আর নকশিকাঁথায় এই মাটির সুর ও রং ধরা আছে।
এই মাটি কখনো মাথা নোয়ায়নি: কৈবর্তের বিদ্রোহ, বারোভূঁইয়ার প্রতিরোধ, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, ক্ষুদিরাম আর সূর্য সেনের আত্মত্যাগ সেই ধারারই অংশ। রবীন্দ্রনাথের গান আর নজরুলের বিদ্রোহ তার আধুনিক রূপ। নদী যেমন বহু উপনদীকে বুকে নিয়েও এক নামে বয়ে চলে, বাঙালিও তেমনি বহু মত আর পথ নিয়ে এক।
▪️স্বপ্নের রূপকার
বায়ান্নয় সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার মায়ের ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন; সেই একুশে ফেব্রুয়ারি আজ সারা বিশ্বের মাতৃভাষা দিবস। সেই আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে বাঙালি শিখল, অধিকার চেয়ে নিতে হয়।
ভাষার দাবিকে অধিকারের আন্দোলনে, আর অধিকারের আন্দোলনকে স্বাধীনতার সংগ্রামে রূপ দিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছয় দফায় দিলেন মুক্তির রূপরেখা। উনসত্তরে জনগণ তাঁকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধি দিল, সত্তরের নির্বাচনে দিল সম্মতির রায়।
তারপর ৭ মার্চ: “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” সাড়ে সাত কোটি মানুষ সেই ডাকে সাড়া দিল, আর তাদের কণ্ঠে “জয় বাংলা”র বজ্রকণ্ঠ হয়ে উঠল বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম ভিত।
মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাংলার আবালবৃদ্ধবনিতার; সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ একই কাতারে লড়েছেন। তবু সেই লড়াইয়ের কণ্ঠস্বর ছিলেন একজনই। ভাষা, অধিকার আর স্বপ্নকে তিনি এক সুতোয় গেঁথেছিলেন, তাই বঙ্গবন্ধু আর বাঙালি আজ সমার্থক। তাঁকে ছাড়া বাঙালি জাতীয়তাবাদের ইতিহাস কল্পনা করা যায় না।
▪️ধর্ম ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ
এখানে একটি কথা পরিষ্কার হওয়া দরকার: ধর্ম আর বাঙালি জাতীয়তাবাদের মধ্যে মূলত কোনো বিরোধ নেই, কারণ দুটির জায়গা জীবনে আলাদা। ভাষা, গান, উৎসব আর জীবনযাপন গড়ে ওঠে মাটি, নদী আর ইতিহাসের হাত ধরে; বিশ্বাস থাকে হৃদয়ের গভীরে, মানুষ আর তার স্রষ্টার মাঝখানে। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালে কাউকে একটি বেছে নিতে হয় না। নদীও আমার, আকাশও আমার।
বাঙালি সংস্কৃতি আর ইসলামের শাশ্বত মানবিক মূল্যবোধ এই দেশের মানুষের হৃদয়ে হাত ধরাধরি করে চলে। বাংলার মানুষের উদারতা, পরমতসহিষ্ণুতা আর সাম্যের শিক্ষা যেকোনো ধর্মের প্রকৃত রূপের সঙ্গেই মেলে। ইতিহাসও তাই বলে: সুফি-দরবেশ আর বাউলের গানে বিশ্বাস আর বাংলার সুর একসঙ্গে মিশেছে।
বঙ্গবন্ধু সবসময় এই সম্প্রীতির কথাই বলতেন, যা আজ ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ কথায় প্রকাশ পায়। তিনি এমন এক স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ নিজের অধিকার নিয়ে মর্যাদায় বাঁচবে।
▪️আঘাত, তবু জেগে ওঠা
একাত্তরে যে আঘাত এসেছিল, তার লক্ষ্য ছিল শুধু মানুষ নয়, বাঙালির পরিচয়। গণহত্যা হয়েছিল, ত্রিশ লাখ প্রাণ গিয়েছিল, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হয়েছিল। ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতীক শহীদ মিনার ভেঙে ফেলা হয়েছিল, আর বিজয়ের ঠিক আগে বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে হত্যা করা হয়েছিল, যাতে জাতির মনন আর বাতিঘরগুলো নিভে যায়।
তবু স্বাধীনতা এল। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশে ফিরে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,
“আমার বাঙালি আজ মানুষ। আমার বাঙালি আজ দেখিয়ে দিয়েছে দুনিয়ার ইতিহাসে এত লোক আত্মাহুতি, এত লোক জান দেয় নাই। তাই আমি বলি আমায় দাবায় রাখতে পারবা না।”
কিন্তু আঘাত থামেনি। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার স্থপতিকে সপরিবারে হত্যা করা হলো। কিছুদিন পর, ৩ নভেম্বর, কারাগারে হত্যা করা হলো মুক্তিযুদ্ধের চার জাতীয় নেতাকে। তারপর দীর্ঘদিন ইতিহাসের পাতা বদলে, নাম মুছে, সত্য আড়াল করে বাঙালির আত্মপরিচয়ের শেকড়ে টান দেওয়ার চেষ্টা চলেছে।
এমনকি ২০০১ সালের পহেলা বৈশাখের ভোরে রমনা বটমূলেও বাঙালির উৎসবের ওপর আঘাত এসেছে। তবু সত্য চাপা থাকেনি। পোড়া মাটিতে বর্ষার প্রথম বৃষ্টি পড়লে যেমন সবুজ ফিরে আসে, বাঙালির আত্মপরিচয়ও তেমনি বারবার ফিরে এসেছে।
▪️আজ, এই সময়ে
সময় বদলায়, আর হুমকিগুলোও নতুন চেহারায় ফিরে আসে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর এই পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে একটি উগ্রবাদী চক্র সুকৌশলে বাঙালি জাতীয়তাবাদ আর অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।
পহেলা বৈশাখ আর মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘অনৈসলামিক’ বলে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে, অথচ ইউনেসকো এই শোভাযাত্রাকে মানবতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মাজার আর বাউল আস্তানায় হামলা চালিয়ে উদার আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ধ্বংসের চেষ্টা হচ্ছে। নারীর পোশাক আর স্বাধীন চলাফেরার ওপর নৈতিক পুলিশিং আর ফতোয়াবাজি চলছে।
একই সঙ্গে একটি মহল দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে আজকের রাজনৈতিক ও আদর্শিক পরিসরে নতুন করে প্রাসঙ্গিক করতে চাইছে। এটা নিছক ইতিহাসচর্চা নয়। একাত্তরে পরাজিত পাকিস্তানি ভাবধারাকে ফিরিয়ে আনার সুদূরপ্রসারী চেষ্টা।
গাছ শেকড় হারালে ঝড়ে টিকে থাকতে পারে না। যে সংস্কৃতি শত শত বছর ধরে মানুষকে কাছে টেনেছে, তাকে দূরে ঠেলে দিলে ক্ষতিটা শুধু অতীতের নয়, ভবিষ্যতেরও।
▪️পায়ের নিচের মাটি
এই মাটির শেকড় হাজার বছরের, আর সেই শেকড়ে মিশে আছে ভাষার জন্য ঝরা রক্ত, মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগ আর সবাইকে নিয়ে বাঁচার শিক্ষা। এখানে ধর্ম আর বাঙালিত্ব একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। ধর্ম হৃদয়ের আলো, বাঙালিত্ব মাটির পরিচয়, আর একজন মানুষের মধ্যে দুটিই পূর্ণ মর্যাদায় থাকতে পারে। ধর্ম যার যার, মাটি সবার।
আজ সেই মাটি আগলে রাখার দায় আমাদের নতুন প্রজন্মের হাতে। পৃথিবী যত ছোট হোক, স্বপ্ন যত দূরেই যাক, যে জানে সে কোথা থেকে এসেছে, শেকড় তার সঙ্গে যায়। পরিচয় কোনো বোঝা নয়, পায়ের নিচের শক্ত মাটি। যে এই মাটি আগলে রাখে, ঝড় তাকে ফেলতে পারে না।
তাই প্রশ্ন যতবারই উঠুক, “তুমি কে? আমি কে?”, উত্তর একটাই থাকুক:
“আমরা বাঙালি।”
—
লেখা: রৌদ্র রুদ্র, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
