সড়কেই থেমে গেলো খুশি ও স্নেহার উচ্চশিক্ষা যাত্রা
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহপাঠীদের সাথে জন্মদিন উদযাপন করতে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরেছেন আফসানা খুশী। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাত্রার প্রথম দিনেই নিভে যায় স্নেহার জীবন। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়ে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় জীবনের পরিসমাপ্তি হয় সম্ভাবনাময় ওই ছাত্রীর। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বাহাদুরপুর এলাকায় বাস ও সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে এই দুই শিক্ষার্থীসহ ৩ জন নিহত হয়।
গতকাল বুধবার দুপুরে সদর উপজেলার বাহাদুরপুর এলাকায় এ দুর্ঘটনাটি ঘটে। নিহত আফসানা খুশী সুনামগঞ্জ টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও সুনামগঞ্জ শহরের আরপিনগর এলাকা দোলোয়ার হোসেনের মেয়ে এবং নিহত অপর ছাত্রী সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী স্নেহা চক্রবর্তী। সে শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস গ্রামের বিপুল চক্রবর্তীর মেয়ে। নিহত অন্যজন শহরের আলীপাড়ার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম।
জানা যায়, দুর্ঘটনায় নিহত সুনামগঞ্জ টেক্সটাইল ইন্সটিটিউটের ডিপ্লোমা ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী আফসানা জাহান খুশী শহরের আরফিন নগর এলাকার অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য দেলোয়ার হোসেনের মেয়ে। সে খুবই মেধাবী ছাত্রী। স্বপ্ন ছিলো পড়া লেখা করে খ্যাতনামা ইঞ্জিনিয়ার হবার। গতকাল ছিলো খুশীর ১৯ তম জন্মদিন। সহপাঠীদের সাথে জন্মদিন উদযাপন করতে সুনামগঞ্জ টেক্সটাইল ইন্সটিটিউটে ক্লাস করতে গিয়েছিলেন খুশী। কথা ছিলো রাতে বাবা মায়ের সাথে জন্মদিনের কেক কাটবেন। কিন্তু কে জানে জন্মদিনেই সড়ক দুর্ঘটনায় জীবন প্রদীপ নিভে যাবে খুশির। তাই বাবার আক্ষেপের শেষ নেই।
আদরের মেয়েকে হারিয়ে পাগল প্রায় মা ও স্বজনরা। পরিবারের একমাত্র মেয়ের মৃত্যু মেনে নিতে পারছেননা তারা। নিহত খুশির বাবা দিলোয়ার হোসেন বলেন, বুধবার আমার মেয়ের জন্মদিন ছিলো। তাকে নিষেধ করেছিলাম ক্লাসে না যেতে। সে বললো, বান্ধবীরা তাকে খাওয়াবে। এমন খাওয়ানি খাওয়ালো সে আর ফিরে এলো না। আমার সব শেষ। আমি এখন কাকে নিয়ে বাঁচবো। একই সিএনজি অটোরিক্সাতে করে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে শহরের বাসায় ফিরছিলেন স্নেহা চক্রবর্তী। বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রার পথম দিনই দুর্ঘটনায় কবলে মৃত্যু হয় মেধাবী এই ছাত্রীর।
নিহত স্নেহার মা জয়ত্রী রাণী চক্রবর্তী জানান, স্নেহা এবার সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছেন। বুধবার ছিলো তার ভর্তির দিন। সকালে বাবার সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন স্নেহা চক্রবর্তী। এভাবে স্নেহার চলে যাওয়া মানতে পারছেন না তিনি। তাই মেয়ের কথা স্মরণ করে বার বার হাসপাতালে মুর্চ্ছা যাচ্ছিলেন শোকে কাতর এই মা।
মেধাবী এই শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে হতবাক তাঁর স্বজন ও সহপাঠীরা। ঘাতক বাস চালককে আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানান তারা। সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীর মৃত্যুর বিচারের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবস্থায় উদ্বেগ জানিয়ে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ডা.শেখ আব্দুল লতিফ বলেন, এমন মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। ভর্তির পরই সড়কে প্রাণ ঝরলো ছাত্রীটির। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন খুবই মর্মাহত। সিলেট সুনামগঞ্জ সড়ক খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা নিরাপদ সড়ক নিয়ে খুবই চিন্তিত। এদিকে, সড়ক দুর্ঘটনায় ঘাতক চালককে আটক করেছে সুনামগঞ্জ হাইওয়ে পুলিশ। ঘাতক চালকে আটকের পাশাপাশি আইনী ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাকির হোসেন।
সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে বিক্ষোভে উত্তাল সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনায় বিক্ষোভে উত্তাল সুনামগঞ্জ। নিরাপদ সড়ক ও দায়ীদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের দাবিতে সিলেট সুনামগঞ্জ-সড়ক মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও সুনামগঞ্জ টেক্সটাইল ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থীরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা থেকে সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের শান্তিগঞ্জ পয়েন্টে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। এসময় ফিটনেসবিহীন পরিবহন আটকে লাইসেন্স চেক করেন বিক্ষোভকারীরা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশের হস্তক্ষেপে ৩০ মিনিট পর অবরোধ প্রত্যাহার করে সড়কের একপাশে অবস্থান করে আন্দোলনকারীরা। প্রায় সাড়ে ৩ঘন্টা ধরে চলা অবস্থান কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা সড়ক দুর্ঘটনা, পরিবহন সিন্ডিকেট ও রাষ্ট্রতন্ত্রের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শ্লোগান দেন। শিক্ষার্থীরা সড়ক দুর্ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ড দাবি করে অনতিবিলম্বে হত্যার সাথে জড়িতদের গ্রেফতারের দাবি করে। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারা।
সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন শিক্ষার্থী তাকবিল হোসেন, জাকারিয়া নাইম, রাহাত আহমেদ, আশরাফ হোসেন প্রমুখ। সুনামগঞ্জ টেক্সটাইল ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিলেন হুমায়ুন আহমদ, শান্ত রায়, আমিন উদ্দিন, মো. লিটন, আপন আহমেদ, তামিম আহমেদ, পূর্বা তালুকদার, তুলি সরকার, সুমাইয়া আক্তার, তাহমিদা জাহান রেবিন, বুশরা আক্তার।
উল্লেখ্য, গত বুধবার দুপুরে সদর উপজেলার বাহাদুরপুর এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় সুনামগঞ্জ টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আফসানা জাহান খুশী ( ১৭) ও সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীর স্নেহা চক্রবর্তী (১৮) নামের দুই শিক্ষার্থীসহ ৩জন নিহত হোন। শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি চলাকালে আন্দোলনকারীদের দাবির সাথে একাত্মতা পোষণ করে মানববন্ধন করে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা কর্মচারীরা।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে মানববন্ধন :
এদিকে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে সুনামগঞ্জ শহরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করছে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১ টায় বিশ্বজন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে স্থানীয় ট্রাফিক পয়েন্ট ঘন্টাব্যাপী মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বজন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এর উপদেষ্টা নুরুল হাসান আতাহার’র সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক’র সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন, এইচএমপি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের প্রভাষক শাহিনা চৌধুরী রুবি, সুনামগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন, প্রথম আলোর প্রতিনিধি এডভোকেট খলিকুর রহমান, সুনামগঞ্জ রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি মাহবুবুর রহমান পীর, হাউসের নির্বাহী পরিচালক সালেহীন চৌধুরী শুভ, সুজন’র সাধারণ সম্পাদক ফজলুল করিম সাঈদ, বিশ্বজন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা কর্ণ বাবু দাস, সভাপতি মাহবুবা আক্তার জেবা সহ আরো অনেকে।
এ সময় বক্তারা বলেন, সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলছে। লক্কর ঝক্কর বাস চলছে। ড্রাইভারদের বেপরোয়া গতি সাধারণ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। বক্তারা ফিটনেস বিহীন গাড়ি বন্ধসহ সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে নিরাপদ সড়ক চাই সুনামগঞ্জ জেলা কমিটি। দুপুর ১২টায় মানববন্ধনে চালকদের প্রশিক্ষণ ও ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর দাবি জানান বক্তারা। সংগঠনের সহসভাপতি মোঃ ওবায়দুল হক মিলনের সঞ্চালনায় ও সংগঠনের উপদেষ্টা মোঃ মনসুর আলম তালুকদারের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন-সিপিবির সাবেক সভাপতি চিত্তরঞ্জন তালুকদার, সংগঠনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান, সাংবাদিক লতিফুর রহমান রাজু, দূর্ঘটনায় মৃত্যুবরণকারী আফসানা জাহান খুশির মামা সাইফুল আলম সদরুল, রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি মাহবুব রহমান পীর, দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণকারী স্নেহার ভাই রাজ চক্রবর্তী, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবু হানিফ প্রমুখ।
