সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন হরি কুন্ঝরু
(প্রকাশিত: The Yale Review, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫)
⸻
প্রশ্ন:
আপনার গল্প “An Angel Passed Above Us”-এ ইউক্রেন যুদ্ধের পটভূমি ব্যবহার করেছেন। এই যুদ্ধ আপনার কাছে কী অর্থ বহন করে—একজন মানুষ, একজন ইউরোপীয়, এবং একজন লেখক হিসেবে?
ক্রাসনাহোরকাই:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আবার ফিরে এসেছে — আমি প্রায় সেটাই অনুভব করি।
মানুষ যেন কিছুই শেখেনি।
হাঙ্গেরি ইউক্রেনের পাশের দেশ, অথচ আমাদের সরকার “নিরপেক্ষতা”র কথা বলে।
আমি ভেবে পাই না, কীভাবে একটি দেশ নিরপেক্ষ থাকতে পারে যখন তার পাশের মানুষগুলো প্রতিদিন মরছে, যখন রুশ সেনারা অন্যের ভূমি দখল করছে।
এটা কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বরং এক নৈতিক প্রশ্ন।
যে দেশ এমন সময়ে নীরব থাকে, সে নিজের আত্মাকে হারায়।
এবং আমাদের সবাইকে সেই দায় নিতে হয় — কারণ আমরা সবাই এই পৃথিবীর বাসিন্দা।
⸻
প্রশ্ন:
এই গল্পে আপনি আহত সৈনিক ও এক সহৃদয় মহিলার কথোপকথনের মধ্যে এক ধরনের “দৈব আশ্রয়” দেখিয়েছেন। যুদ্ধের এই ভয়াবহতার মধ্যে আশা কোথায় পেলেন?
ক্রাসনাহোরকাই:
আশা সব সময়ই থাকে, কিন্তু তা দেখা যায় না।
মানুষ আহত হয়, ক্লান্ত হয়, ভেঙে পড়ে — তবু এক ক্ষীণ আলোর মতো কিছু ভেতরে জ্বলতে থাকে।
আমি বিশ্বাস করি, সেই আলোই শিল্প।
একজন লেখক, একজন শিল্পী কেবল সেই অদৃশ্য আলোর সাক্ষী — তার কর্তব্য সেটিকে শব্দে রূপ দেওয়া।
এই গল্পের মহিলা চরিত্রটি কোনো বীর নয়, কোনো মুক্তিদাতা নয় — সে কেবল একজন মানুষ, যে অন্য একজন মানুষকে ভুলে যেতে দেয় না যে সে এখনো বেঁচে আছে।
এটাই আসলে মানবতার মূল।
⸻
প্রশ্ন:
আপনি প্রায়ই “অ্যাপোক্যালিপ্স” বা “বিনাশ” নিয়ে লেখেন। আপনার কাছে এই ধারণাটি কী — একটি হঠাৎ বিপর্যয়, নাকি এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া?
ক্রাসনাহোরকাই:
অ্যাপোক্যালিপ্স কোনো একক ঘটনা নয় — এটি একটি ধীরে চলা প্রক্রিয়া।
মানুষের ইতিহাসে এই প্রক্রিয়া বহুবার শুরু হয়েছে, বহুবার চলেছে, এখনো চলছে।
আমরা এখন অ্যাপোক্যালিপ্সের মধ্যেই আছি — শুধু সেটিকে স্বীকার করি না।
যখন পৃথিবীর মাটি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়, নদী বালিতে হারিয়ে যায়, প্রাণীরা পালায়, ভাষা অর্থ হারায় — তখনই বিনাশ শুরু হয়।
কিন্তু এই ধ্বংসের মধ্যেই শিল্প জন্ম নেয়।
যে জায়গায় সবকিছু শেষ, ঠিক সেখানেই কোনো একজন লেখক নতুন বাক্য লেখে — এটাই পুনর্জন্মের চিহ্ন।
⸻
প্রশ্ন:
আপনি বলেছেন “আশা ভবিষ্যতের অধিকার, কিন্তু ভবিষ্যৎ কখনো আসে না।” এই ধারণাটিকে একটু ব্যাখ্যা করবেন?
ক্রাসনাহোরকাই:
মানুষ সব সময় ভবিষ্যতের কথা ভাবে — আমরা বলি, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু সেই “একদিন” কোনোদিন আসে না।
আমরা কেবল এই বর্তমানেই বেঁচে আছি — এখানে, এখন।
সুতরাং, যদি কোনো মুক্তি থাকে, তা আজই, এই মুহূর্তেই।
আশা কোনো দূরের বিষয় নয়;
আশা হলো বর্তমানের ভেতরে লুকানো এক ক্ষণস্থায়ী ঝলক।
তুমি সেটা দেখলে বাঁচো; না দেখলে ধীরে ধীরে পাথরে পরিণত হও।
⸻
প্রশ্ন:
আপনার গল্পে শিল্প ও নৈতিকতার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। আপনি কি মনে করেন শিল্প এখনো মানুষকে রক্ষা করতে পারে?
ক্রাসনাহোরকাই:
হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি শিল্প এখনো পারে — কিন্তু সেটা “রক্ষা”র অর্থে নয়।
শিল্প আমাদের বাঁচায় না, বরং আমাদের “বোধ” করায়।
একজন মানুষ যখন কোনো চিত্র, কোনো বাক্য বা কোনো সুরে নিজের ছায়া দেখতে পায়, তখন সে জানে—সে একা নয়।
এই ‘একাকিত্ব ভাঙা’র মুহূর্তটাই শিল্পের বিজয়।
শিল্প আমাদের দেয় নতুন অনুভবের ক্ষমতা —
দুঃখকে দেখা, ভয়কে চিনে নেওয়া, এবং সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস।
যতক্ষণ মানুষ এই ক্ষমতা রাখবে, পৃথিবী পুরোপুরি ধ্বংস হবে না।
⸻
প্রশ্ন:
আপনি কি মনে করেন, ভাষা এই ভয়াবহ বাস্তবতা বহন করার মতো শক্তিশালী?
ক্রাসনাহোরকাই:
ভাষা ভেঙে পড়ছে — এ কথা আমি প্রায়ই বলি।
কিন্তু ভাষার ভেতরেই আমাদের শেষ আশ্রয়।
যখন মানুষ কথা বলে, লেখে, বা চুপ করে শোনে — তখনই কিছু একটা টিকে থাকে।
আমার উপন্যাসে আপনি দেখবেন, বাক্য কখনো শেষ হয় না।
কারণ আমি বিশ্বাস করি, কোনো ভাবনা, কোনো অনুভূতি আসলে “শেষ” হয় না।
যখন একটি বাক্য এগিয়ে চলে, সেটি সময়ের মতো — ক্রমাগত, অবিরাম।
এই কারণেই আমি বিরামচিহ্নের বদলে প্রবাহ খুঁজি; আমি চাই বাক্যটিও শ্বাস নিক, যেমন একজন মানুষ নেয়।
⸻
প্রশ্ন:
শেষ প্রশ্ন — যুদ্ধ, মৃত্যু, একাকিত্বের মধ্যে আপনি এখনো লিখছেন কেন?
ক্রাসনাহোরকাই:
কারণ লেখা ছাড়া আমি কিছুই করতে পারি না।
যখন আমি লিখি, তখন আমি ভয় পাই না।
লেখা আমার কাছে এক ধরনের প্রার্থনা,
যেখানে শব্দ দিয়ে আমি পৃথিবীকে আবার সাজিয়ে দেখি।
আমি বিশ্বাস করি —
যখন মানুষ শেষবারের মতো শব্দ উচ্চারণ করবে,
সেই শব্দটি হবে ভালোবাসার।
ততক্ষণ পর্যন্ত, আমি লিখে যাবো।
কুলদা রায়ের এর ওয়াল থেকে
