বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে গত দুই দশকের অর্জনকে মাত্র কয়েক মাসে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার যে নজিরবিহীন নজির স্থাপন করেছে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স ম্যাগাজিনের রিপোর্ট একটি অকাট্য দলিল ছাড়া আর কিছু নয়। আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্স সম্পাদিত এই জার্নাল সহজে কারও পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেয় না। বরং তারা তথ্য, পরিসংখ্যান ও বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। আর সেই সিদ্ধান্ত একটাই: হামের এই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী একটাই পক্ষ, আর সেটা হলো মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এটা কোনো অভিযোগ নয়, বরং রক্তাক্ত বাস্তবতার ফরেনসিক বিশ্লেষণ।
প্রথমেই মৃত্যুর অঙ্কটা পরিষ্কার করে নেওয়া প্রয়োজন। গত বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া এই মহামারিতে এখন পর্যন্ত ৩২ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। ২৫০ জনের বেশি মানুষ মারা গেছে। মৃতদের সিংহভাগই শিশু। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিত্রটা নৃশংস এক বাস্তবতার সাক্ষ্য দিচ্ছে। বেড নেই, অক্সিজেন নেই, মা তার শ্বাসকষ্টে ভোগা শিশুকে নিয়ে মেঝেতে বসে আছেন। এই দৃশ্য কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার এক সময়ের রোল মডেল বাংলাদেশের রাজধানীর। শেখ হাসিনার শাসনামলে যে দেশ টিকাদান কর্মসূচির জন্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে, সেখানেই এখন হামের প্রকোপে শিশুরা মারা যাচ্ছে। এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটা সরাসরি রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড।
এই হত্যাকাণ্ডের নীলনকশা তৈরি হয়েছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে। অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হঠাৎ করেই ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনার পরীক্ষিত ও নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি বাতিল করে উন্মুক্ত দরপত্র চালু করে। পরীক্ষিত পদ্ধতি কেন তারা বাতিল করল, সেই প্রশ্নের সদুত্তর আজও পাওয়া যায়নি। ইউনিসেফ বিশ্বের সবচেয়ে অভিজ্ঞ সংস্থা যখন টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহের বিষয়ে। তারা নিশ্চিত করে যে ঠিক সময়ে ঠিক মানের টিকা পৌঁছে যাবে। গ্যাভির অর্থায়ন আর বাংলাদেশ সরকারের বরাদ্দ ইউনিসেফের মাধ্যমেই সুচারুভাবে কাজ করছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ঠিক করল, এই পদ্ধতি আর চলবে না। উন্মুক্ত দরপত্র হবে। স্থানীয় সরবরাহকারীরা আসবে, প্রস্তাব দেবে, যাচাই হবে, তারপর অর্ডার দেওয়া হবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি শুনতে যতটা স্বচ্ছ মনে হয়, বাস্তবে তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার চোরাবালিতে ঠিক ততটাই ডুবে যায়। ফলাফল: টিকার মজুত শূন্যের ঘরে নেমে আসে। শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি থমকে যায়। সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি প্রথমে পিছিয়ে দেওয়া হয়, তারপর বাতিল হয়ে যায়। ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে। বাকি ৪১ শতাংশ শিশু ছেড়ে দেওয়া হয়েছে মৃত্যুর মুখে।
আর এই সিদ্ধান্ত যখন নেওয়া হলো, তখন ইউনিসেফ কী করছিল? উত্তরটা ভয়ংকর। ইউনিসেফের তৎকালীন বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের কাছে সরাসরি গিয়েছিলেন। তিনি অনুনয় করেছিলেন, মিনতি করেছিলেন। সায়েন্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফ্লাওয়ার্সের কণ্ঠে সেই হতাশা এখনও স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, দোহাই আপনাদের, এটা করবেন না। একজন আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ প্রতিনিধি যখন এভাবে মিনতি করেন, তখন সেটা কোনো সাধারণ অনুরোধ নয়, বরং সেটা ছিল আসন্ন বিপর্যয়ের আগাম সতর্কবার্তা। কিন্তু নূরজাহান বেগম সেই মিনতি পায়ে ঠেলে দিয়েছেন। তার চেয়েও বড় কথা, সায়েন্স পরবর্তীতে একাধিকবার তার বক্তব্য জানতে চেয়ে ইমেইল করলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। যে মানুষটির সিদ্ধান্তে শত শত শিশু মারা গেল, তিনি আজও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার মতো ন্যূনতম নৈতিকতাটুকুও দেখাননি। এই নীরবতা কোনো সাধারণ বিষয় নয়, বরং এটা অপরাধবোধের নয়, বরং অহংকারেরই প্রমাণ বহন করে।
শুধু ইউনিসেফ নয়, দেশের বিশেষজ্ঞরাও একই কথা বলছিলেন। আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএসএম আলমগীর স্পষ্ট করেই বলেছেন, টিকার অভাবের পাশাপাশি ভিটামিন এ বিতরণ কর্মসূচিও তিন দফা বাদ পড়েছে। ভিটামিন এ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। টিকা না পাওয়া শিশুর শরীরে এই প্রতিরোধ ক্ষমতাই ছিল শেষ ভরসা। সেটাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ একদিকে টিকার অভাবে শিশুকে হামের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে ভিটামিন এ না দিয়ে তার শরীরকে লড়াই করার মতো ন্যূনতম শক্তিটুকুও রাখতে দেওয়া হয়নি। এটি কোনো অব্যবস্থাপনা নয়, বরং এটি সুচিন্তিত এক নৃশংসতায় পরিণত করা হয়েছিল।
আইইডিসিআরের উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসাইনের কথাটি এর চেয়েও গভীরে আঘাত করে। তিনি বলেছেন, টিকার ঘাটতির বাইরেও এই সংকট বাংলাদেশের কাঠামোগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। আর এই দুর্বলতা কারা সৃষ্টি করেছে? তারাই সৃষ্টি করেছে যারা গণঅভ্যুত্থানের নামে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে বৈধ প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে ফেলেছিল। তারা যখন দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিচ্ছিল, তখন প্রশাসনের নিম্নতম স্তরেও স্থবিরতা নেমে এসেছিল। কেউ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে সাহস পাচ্ছিল না। কারণ সিদ্ধান্ত নিলে যে নিরাপত্তা পাওয়া যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। এর ওপর চেপে বসেছে উন্মুক্ত দরপত্র নামের সেই ব্যর্থ পদ্ধতি।
এই দরপত্র পদ্ধতি নিয়ে কথা বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের অপর স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সায়েদুর রহমান। তার যুক্তি ছিল, পুরোনো ক্রয় ব্যবস্থা জরুরি ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল এবং সেটিকে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোয় নিয়ে আসা দরকার ছিল। তিনি স্বচ্ছতার কথা বলেছেন, পক্ষপাতিত্ব এড়ানোর কথা বলেছেন। এই যুক্তি প্রথমবার শুনলে ভালো শোনায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা হতো, সেখানে স্বচ্ছতার কী অভাব ছিল? গ্যাভি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কঠোর মানদণ্ডের মধ্য দিয়েই তো এই টিকা আসত। এই পদ্ধতি কি কখনও দুর্নীতির অভিযোগে পড়েছে? না, পড়েনি। তাহলে ঠিক কী কারণে এই পরিবর্তন আনা হলো? আর এটাও বড় প্রশ্ন যে, যখন ইউনিসেফ সরাসরি বলে দিচ্ছে যে এই পরিবর্তন মহামারি ডেকে আনবে, তখন সেই ঝুঁকিটা নেওয়ার পেছনে কোন যুক্তি কাজ করেছিল? সায়েদুর রহমান সায়েন্সের ইমেইলে শিশুমৃত্যুতে শোক প্রকাশ করলেও এই মৌলিক প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গেছেন। তার শোকের বাণী কতটা মূল্যবান, সেই মূল্যায়ন ইতিহাস করবে। কিন্তু এই মুহূর্তে বাস্তবতা হলো, তার যুক্তিতর্ক এখন কেবলই ফাঁপা বুলি শোনায়।
এই মৃত্যুযজ্ঞের রাজনৈতিক মাত্রাটা আরও ভয়ংকর। ইউনূস প্রশাসন যখন ক্ষমতায় আসে, তখন থেকেই স্বাস্থ্য খাতে নূরজাহান বেগমের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তার যোগ্যতা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে অস্বস্তি ছিল শুরু থেকেই। যখন তার দপ্তর থেকে দুর্নীতির অভিযোগ উঠল, তখনও সরকারের পক্ষ থেকে তাকে রক্ষার চেষ্টা হয়েছে। প্রেস সেক্রেটারি পর্যন্ত তাকে টপ কর্পোরেট লিডার হিসেবে বর্ণনা করে রীতিমতো কৌতুকের জন্ম দিয়েছিলেন। এখন প্রশ্ন উঠছে, এই কর্পোরেট লিডারশিপের ফলাফল কী দাঁড়াল? ফলাফল হলো কয়েক শ শিশুর লাশ। এটাই কি সেই কর্পোরেট সাফল্য যা তারা দেখাতে চেয়েছিলেন?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক বে-নজির আহমেদের সতর্কবাণী পুরো পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে। তিনি বলেছেন, হাম এখন যে গতিতে ছড়াচ্ছে, তাতে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি দিয়েও এটি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়বে। অর্থাৎ, ক্ষতি এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে যেখান থেকে ফেরার পথ দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, আর তারাই এখন এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে। কিন্তু যে ক্ষতি হয়ে গেছে, তা পূরণ হওয়ার নয়। যে শিশুগুলো মারা গেছে, তারা আর ফিরে আসবে না। আর এই শিশু হত্যার দায় শুধু ইউনূস প্রশাসনের নয়, বরং দায় তাদের প্রত্যেকের, যারা এই দুঃশাসনের সঙ্গে জড়িত ছিল, সমর্থন দিয়েছে বা মুখ বুজে সহ্য করেছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাস যে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করেছেন, তাতে টিকা কেনায় দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়েছে। ইউনিসেফের রানা ফ্লাওয়ার্সও সরাসরি বলেছেন, এটা তদন্ত হওয়া উচিত। জনগণের জেনে রাখা উচিত, ঠিক কাদের স্বার্থে ইউনিসেফকে বাদ দিয়ে উন্মুক্ত দরপত্র চালু করা হয়েছিল। কারা এই দরপত্রে অংশ নিয়েছিল, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় কী ছিল, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি বেরিয়ে আসে, তাহলে হয়তো বোঝা যাবে এই পুরো ঘটনা নিছক অদক্ষতা নাকি সুপরিকল্পিত কোনো আর্থিক লেনদেনের অংশ।
আর এই পুরো সময় জুড়ে যে বিষয়টা সবচেয়ে বেশি হতাশাজনক, সেটা হলো দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে কোনো জবাবদিহিতা আশা করাও বাতুলতা। তারা কখনও মনে করেননি যে দেশের জনগণের কাছে তাদের কোনো ব্যাখ্যা দিতে হবে। তারা মনে করেছিলেন, ক্ষমতা একবার এসেছে, এখন যা ইচ্ছা করা যাবে। যুক্তি আর তথ্যের কাছে তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই। এখন যখন সায়েন্স ম্যাগাজিনের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সরাসরি আঙুল তুলছে, তখন তারা নীরব অথবা অস্পষ্ট শোকবার্তায় দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন।
মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কোনো মূল্য নেই। কিন্তু এই অবৈধ ইউনুস সরকার প্রমাণ করেছে, তাদের কাছে মানুষের জীবনের কোনো মূল্যই ছিল না। তারা যখন ক্ষমতা দখল করল, তখন হয়তো ভাবেনি যে ইতিহাসের কাঠগড়ায় তাদের এমন নির্দয়ভাবে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারা দাঁড় করিয়েছে নিজেদেরই। আর ইতিহাসের রায় অত্যন্ত কঠিন হবে। এই রায়ে শুধু ব্যর্থতা নয়, বরং গণহত্যার অভিযোগও যুক্ত হতে পারে। কারণ টিকা আটকে দেওয়ার মাধ্যমে তারা যে জনগোষ্ঠীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে, তার চেয়ে ভয়ংকর অপরাধ খুব কমই আছে। আর এই অপরাধের বিচার না হলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে তার নিজের অস্তিত্বের বৈধতাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
