উল্লেখ করা যেতে পারে যে, জুবিন গর্গ মূলত অসমীয়া, বাংলা এবং হিন্দি ভাষায় গান করেছেন। তবে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, বোরো, ইংরেজি, গোয়ালপাড়িয়া, কন্নড়, কারবি, খাসি, মালায়ালাম, মারাঠি, নেপালি, ওড়িয়া, সংস্কৃত, সিন্ধি, তামিল, তেলুগু, তিওয়া সহ আরও অনেক ভাষা ও উপভাষায় গান করেছেন তিনি।
[সম্প্রতি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে মারা গেছেন ভারতের অসামান্য জনপ্রিয় শিল্পী জুবিন গর্গ (১৯৭২-২০২৫)। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মাসাধিক কাল পরেও জুবিনের স্মৃতির প্রতি শোক জানাতে প্রতিদিন উপস্থিত হচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। সেই মানুষদের ভিড়ে একদিন ছিলেন বাঙালি লেখক সুস্মিতা নাথ। ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের ‘রাজপুত্র’ নামে খ্যাত গায়ক, সুরকার, গীতিকার জুবিনের প্রতি লক্ষ মানুষের ভালোবাসা নিয়ে লিখেছেন তিনি।
তিনি একাধার ছিলেন একজন যন্ত্রবাদকও। ঢোল, দোতারা, ড্রামস, গিটার, হারমোনিয়াম, ম্যান্ডোলিন, কীবোর্ড, তবলা এবং বিভিন্ন পার্কিউশন যন্ত্র সহ ১২টি যন্ত্র বাজাতেন তিনি। তিনি ছিলেন আসামের সর্বাধিক বেতনের গায়ক। ১৯৯২ সনে জুবিনের প্রথম অসমীয়া এ্যাডলবাম ‘অনামিকা’ মুক্তি পায়। “শুধু তুমি” বাংলা চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করে তিনি শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতকারের পুরস্কার লাভ করেছিলেন। হিন্দি “ইয়া আলি” গানের জন্য জুবিন গার্গ গ্ল’বেল ভারতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও স্টারডার্ড পুরস্কার লাভ করেছিলেন।
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে সিঙ্গাপুরে সমুদ্রে স্কুবা ডাইভিং করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন জুবিন গর্গ; তাঁকে পুলিশ উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলেও শেষপর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন তিনি।]
জুবিনের জন্য সাধারণ মানুষের ভালোবাসার কথা লিখেছেন সুস্মিতা নাথ। সুস্মিতা বাঙালি লেখক। ভারতের আসামে তাঁর জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা। অধ্যাপনা দিয়ে পেশাগত জীবনের শুরু। পরবর্তীকালে লেখালিখির জগতে আসা। বাংলা ভাষার জনপ্রিয় অধিকাংশ পত্র পত্রিকা যেমন দেশ, সানন্দা, আনন্দমেলা, সন্দেশ, কিশোর ভারতী, নবকল্লোল, শুকতারা, গৃহশোভা, সুখী গৃহকোণ, বসুমতী, আনন্দবাজার পত্রিকা, উত্তরবঙ্গ সংবাদ, উত্তরের সারাদিন, যুগশঙ্খ, ইত্যাদিতে তিনি নিয়মিত লিখে থাকেন। প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে উড়ন্ত মানুষ, কেঁচোর গর্তের রহস্য, ভাবীকাল, সেজোমামা ও বারো ভূতের গল্প, ক-লৌম-এ ছায়ামানবী, রহস্যাঘেরা আধডজন ইত্যাদি। বাংলামেইল আজ সুস্মিতা নাথের লেখাটি প্রকাশ করেছে।
অবিনশ্বর জুবিন
সুস্মিতা নাথ
এ কথা নিশ্চিত যে, এখন থেকে অসমের প্রায় প্রতিটি মা তাদের শিশু সন্তানকে বলবেন, “বড় হও। জুবিনের মতো বড় হও।” অনেকে তাদের সদ্যজাত পুত্র সন্তানের নামও রাখবেন ‘জুবিন’। কন্যা হলে হয়তো ‘জুবি’ অথবা ‘জুবিনা’ও রাখতে পারেন। আসলে অসম তাদের প্রিয় মানুষটিকে ভুলতে চায় না। প্রতিটি শ্বাস প্রশ্বাসে মনে রাখতে চায় তাঁকে। আর এখানেই জুবিনের সার্থকতা। শিল্পী তো অনেক আছেন, জুবিনের চেয়েও বড় বড় শিল্পী এ দেশে জন্মেছেন, জুবিনের চেয়েও অনেক বেশি সময় পৃথিবীতে থেকেছেন এবং সঙ্গীতসুধায় জনগণকে মোহিত করেছেন, কিন্তু জুবিনের মতো মানুষের মনে বসত করতে আর কে পেরেছেন? মৃত্যুর এত দিন পরেও কে এমনভাবে জীবিত থাকতে পেরেছেন? কে এত ভালোবাসায় নিত্য সিক্ত হতে পেরেছেন? কেউ নয়। আমি আবার বলছি, কেউ নয়। এ দেশের কোনও কবি, সাহিত্যিক, সঙ্গীতশিল্পী, নেতা, অভিনেতা, ধর্মগুরু, কেউ নন। জুবিন প্রমাণ করে দিল, সত্যি সে অসমের রাজকুমার। এমন এক রাজকুমার যে ক্ষমতায় নয়, ভালোবাসায় দখল করে ছিল এই বিপুল সাম্রাজ্য।
গুয়াহাটির প্রান্তদেশে সোনারপুরের যে স্থানে জুবিনের অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল, যেখানে পুঞ্চভূতে মিলিয়েছিল তাঁর নশ্বর দেহটি, সে জায়গা এখন আক্ষরিক অর্থেই তীর্থক্ষেত্রে পরিণত। এতদিন কেবল শুনছিলাম, এবং টিভিতে এবং বিভিন্ন ভিডিওয় দেখছিলাম শুধু। এবার সেটা চাক্ষুষও করে এলাম। শুধু গুয়াহাটি বা এর আশপাশ থেকেই নয়, অসমের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাত/আট ঘণ্টা কিংবা তারও বেশি যার্নি করে বাসের পর বাস বোঝাই হয়ে মানুষ আজও প্রতি মুহূর্তে সেখানে পৌঁছাচ্ছে। চব্বিশঘণ্টা সেখানে মানুষের ভিড়। মানুষ আসছে, শান্তিপূর্ণ ভাবে প্রদীপ ধুপকাঠি জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছে, ‘গামোছা’ রাখছে, জুবিনের গান গাইছে, …কোথাও কোনও বাড়াবাড়ি বা অরাজকতা নেই। হুলুস্থুল নেই, ঝগড়া মারামারি নেই। এমনকী মাঝ রাতেও একই দৃশ্য।
নির্জন আশাপাশটা এখন জনসমারহে পূর্ণ। ফুল, মালা, গামোছা, প্রদীপ, ধুপকাঠি, চা, স্ন্যাক্স থেকে শুরু করে খাবার ব্যবস্থা থাকা প্রচুর অস্থায়ী দোকানে ভরে দ্রুত উঠছে জায়গাটা। হয়তো আগামীতে হোটেল-রিসোর্টও গড়ে উঠবে। কে বলবে মাত্র দেড় মাস আগেই এ এক জনহীন প্রান্তর ছিল।
দুদিনের জন্যে একটু বেরিয়েছিলাম। জুবিনক্ষেত্রের সামনের রাস্তা দিয়ে যখন যাই, তখন সকাল সাড়ে ন’টা। তখন দেখেছি, রাস্তার ধার ঘেঁষে সারী সারী প্রায় শ’খানেক দূরপাল্লার বাস দাঁড়ানো। বাসগুলো রাজ্যের বিভিন্ন অংশ থেকে জুবিন ভক্তদের নিয়ে এসেছে। বাসগুলো ছাড়াও ছোট ছোট ভ্যানগাড়ির সংখ্যাও নিতান্ত কম নয়। এ ছাড়া তো আছেই ব্যক্তিগত গাড়ি। সেখানের পার্কিং স্পেস এবং আশপাশের অঞ্চল মিলিয়ে আরও অন্তত শ’ দুয়েক প্রাইভেট কার। আর মানুষ? সে তো অগুনতি। কোনও মেলা, সঙ্গীতানুষ্টান কিংবা কোনও জনপ্রিয় নেতার ভাষণস্থল থেকেও কয়েক গুণ বেশি ভিড় সেখানে। ভিড় দেখেই তখন থামিনি। ভাবলাম হয়তো রবিবারের ছুটির দিন বলে, কিংবা সকাল বলেই এতটা ভিড়। তিল ধারণের জায়গা নেই। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, মঙ্গলবারে ফেরার পথে রাতের দিকে আসব। আমাদের গাড়ির চালক যদিও বললেন, ‘মাঝ রাতেও এমনই ভিড় পাবেন ম্যাডাম।’ এবং সে কথা যে কতটা সত্যি, সে তো কালই দেখলাম।
শুধু সাধারণ মানুষের ভিড়ই নয়, রোজ সেখানে আসছে বিভিন্ন সঙ্গীত দলও। আসছেন শিল্পীরা। কখনও দুশো জনের বাঁশী বাদকের দল এসে সমবেতভাবে জুবিনের গানের সুর বাজিয়ে চলেছেন তো কখনও কোনও নামগান বা কীর্তণের দল। এবং এটা রোজই প্রায় প্রতি বেলার দৃশ্য। এখনও সেখানে নিত্য হচ্ছে যজ্ঞ, শ্রাদ্ধকাজ, ও স্মরণসভা। কোনও লোক দেখানো ব্যাপার নয়, যারা আসছেন তাঁরা নীরবেই এভাবে শ্রদ্ধাজ্ঞাপণ করে যাচ্ছেন। যেসব সেলিব্রিটিরা আসছেন, তারাও কোনও ঢাকঢোল না বাজিয়ে, নিজের প্রচার না-করেই শ্রদ্ধা জানিয়ে চলে যাচ্ছেন। এ সব কেউ না দেখলে বিশ্বাস করানো কঠিন। প্রতিদিন সেখানে লক্ষাধিক মানুষ আসছেন শুধুমাত্র একবার প্রিয় শিল্পীর অস্তিত্ব অনুভব করতে। হ্যাঁ, আজও। জুবিনের চলে যাওয়ার দেড়মাস পরেও তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসার একটুও ঘাটতি পড়েনি। সারা ভারতে, হয়তো পৃথিবীতেও এমন নজির নেই।
শোকপ্রকাশের ক্ষেত্রে “আবেগ” শব্দটাকে লোকে অনেকটা ঋণাত্মক অর্থেই প্রয়োগ করে থাকে। কারণ ‘আবেগ’ জিনিসটাই ক্ষণস্থায়ী। হঠাৎ আবেগপ্রবণ হয়ে শোকবিহ্বল হওয়াকে তাই প্রকৃত প্রেম বা খাঁটি ভালোবাসার মতো উচ্চমার্গে বসাতে তাই অনেকেই চান না। নিন্দুকেরা নাক সিঁটকে বলে, “হুহ, দুদিনের আবেগ! দু’দিন পরেই সব ভুলে যাবে মানুষ।” কিন্তু নিন্দুকের মুখে কালি ঢেলে সেই আবেগই যখন জনমানসে স্থায়িত্ব পায়, তখন তাকে কী বলব? তখন সেটা খাঁটি ভালোবাসারও একেবারে প্রথম শ্রেণিতে এসে যায় না কি?
জুবিনের আকস্মিক চলে যাওয়ার পরে তিন-তিনটে ফেস্টিভ্যাল দেখে ফেলেছে অসম। দুর্গাপূজা, কালীপূজা এবং কাতি বিহু। কালের নিয়মে উৎসব এসেছে, মানুষ নিয়ম রক্ষার্থে আচার পালন করেছে, কিন্তু উৎসবের উন্মাদনা থেকে বিরত থেকেছে গোটা রাজ্যের আপাময় জনসাধারণ। হাজার হাজার পুজো মণ্ডপের এমন একটিও ছিল না যেখানে জুবিনের জন্যে আলাদা মঞ্চ তৈরি করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের ব্যবস্থা হয়নি। অধিকাংশ প্যান্ড্যালে মাইকে কোনও গান বাজেনি, যেখানে বেজেছে সেখানেও শুধু জুবিনের গান। কালী পুজোয় বাজি ফুটিয়ে অন্যান্যবারের মতো উল্লাসে মাতেনি কেউ। এমনকী পূর্ব নির্ধারিত সমস্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় বাঞ্চাল করা হয়েছে, নয় তো অনির্দিষ্টকালের জন্যে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর সবটাই হয়েছে স্বতঃস্ফুর্তভাবে। এর জন্যে কোনও সরকারি নির্দেশিকা, বা কোনও দল বা ব্যক্তি তাদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়নি।
সার্থক জীবন জুবিনের। সে যেমন ভালোবাসা দিয়েছে, গরিব দুঃখী আর্ত দুঃস্থ মানুষের পাশে সে যেমন থেকেছে, যেমন ভালোবেসেছে অবলা প্রাণীদেরও, সে সব বিফলে যায়নি। সেই ভালোবাসা হাজার লক্ষগুণ বৃদ্ধি পেয়ে তাঁর কাছেই ফিরে যাচ্ছে। জুবিন প্রমাণ করে দিল, ভালোবাসার চেয়ে বড় সম্পদ আর কিছু নেই। ভালোবাসার চেয়ে বড় ইনভেস্টমেন্টও আর হয় না। জুবিনের থেকে ভালোবাসার দীক্ষা নিক সবাই। কেবল শিল্পী সম্প্রদায়ই নন, আপাময় মানুষও। সেই সঙ্গে দেশের অন্য রাজ্যের মানুষও দেখুক, কীকরে ভালোবাসতে হয়, এবং ভালোবাসাকে সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে ফিরিয়ে দিতে হয়। কীকরে অমরত্ব দিতে হয় প্রিয় মানুষকে।
ভালো থেকো অবিনশ্বর জুবিন।
