ঢাকা, ২৫ নভেম্বর ২০২৫: বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) সদস্যদের স্বাধীনতা নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলেছেন বিখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মী ডেভিড বার্গম্যান।
তিনি তার সাম্প্রতিক ফেসবুক পোস্টে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ১৭ নভেম্বর ২০২৫-এ প্রকাশিত রায়ের সময়সীমা নির্ধারণে রাজনৈতিক চাপের ভূমিকা থাকতে পারে, যা ট্রাইব্যুনালের নিরপেক্ষতাকে সন্দেহের মুখে ফেলে।
ডেভিড বার্গম্যান একজন প্রখ্যাত অনুসন্ধানী সাংবাদিক, যিনি ১৯৯০-এর দশক থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন যুদ্ধাপরাধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের উপর তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছেন। ব্রিটেনের চ্যানেল ৪-এর ‘ডিসপ্যাচেস’ প্রোগ্রামের জন্য তৈরি ‘ওয়ার ক্রাইমস ফাইলস’ ডকুমেন্টারির মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেন, যা ১৯৯৫ সালে পুরস্কার লাভ করে। বাংলাদেশে তিনি নিউ এজ, দ্য ডেইলি স্টার, বিডিনিউজ২৪.কম এবং প্রথম আলোর মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। এছাড়া আল জাজিরা, ফরেন পলিসি, দ্য ইকোনমিস্ট এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসের জন্য তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন বসবাস করে তিনি দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে বিশেষভাবে লিখে এসেছেন। মানবাধিকার সংস্থা সেন্টার ফর কর্পোরেট অ্যাকাউন্টাবিলিটির সাবেক নির্বাহী পরিচালক হিসেবে তিনি যুক্তরাজ্যে কর্পোরেট হত্যাকাণ্ড আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন।
বার্গম্যানের সাম্প্রতিক ফেসবুক পোস্টে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, শেখ হাসিনার বিচারে রায়ের সময়সীমা কারা নির্ধারণ করেছিলেন—বিচারকরা নাকি রাজনীতিবিদরা? পোস্টে তিনি লিখেছেন,
“একটি অসামঞ্জস্যতা রয়েছে রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি বাদী এবং বিবাদী পক্ষকে সরবরাহের বিলম্ব করার কারনে। আইন এখানে স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ধারা ২০(২এ)-এর মতে, রায় প্রদানের তারিখেই পূর্ণ রায় এর কপি সরবরাহ করতে হবে। রায়টি ১৭ নভেম্বর প্রকাশিত হয়েছে, অথচ এক সপ্তাহ অতিবাহিত হলেও কোনো পক্ষই রায় এর কপি পায়নি।”
তিনি আরও যোগ করেছেন, “একটি সম্ভাব্য—বরং সম্ভাব্যতম—ব্যাখ্যা হলো, বিচারকরা ১৭ তারিখে রায় লিখে শেষ করেননি, কিন্তু বাহ্যিক রাজনৈতিক চাপের কারণে রায় ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন। উদাহারন হিসাবে বলতে গেলে, এটা ভালো কিছু না।”
প্রেক্ষাপটে মনে রাখা যায়, ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশের আইসিটি-১ শেখ হাসিনা, সাবেক গৃহমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক পুলিশ মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার প্রতিবাদ দমনের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। শেখ হাসিনা এবং কামাল অনুপস্থিত ছিলেন, যা বিচারকে আরও বিতর্কিত করেছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংস্থাগুলো এই রায়কে ভুক্তভোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করলেও, বিচার প্রক্রিয়াকে “পক্ষপাতদুষ্ট এবং রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্য প্রণোদিত” বলে তীব্র সমালোচনা করছে।
বার্গম্যানের এই পোস্ট আইসিটির পদ্ধতিগত সমস্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনাকে নতুন করে জিইয়ে তুলেছে, বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের পটভূমিতে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রায়ের কপি বিলম্বিত হওয়া আইনের লঙ্ঘন এবং এটি বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
