নোয়াখালীর হাতিয়ায় বিয়েবাড়িতে আনন্দ করতে মাইক বাজানোয় এক কনে, তার বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের মারধর করেছে মৌলবাদীরা। পরে সালিশ বসিয়ে দরিদ্র পরিবারটিকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার টাকা না দেওয়ায় বরের অটোরিকশা জব্দ করল হামলাকারীরা।
গতকাল দুপুরে উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডে একটি অনানুষ্ঠানিক সালিশ থেকে এ মধ্যযুগীয় শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসন খবর পেয়েও উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার আতঙ্কে আছে। তারা মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছে।
পরিবারটি জানায়, কয়েকজন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির উপস্থিতিতে মৌলবাদীরা বিয়ের অনুষ্ঠানে মাইক ব্যবহারের জবাবদিহি চাইতে গিয়ে প্রথমে হট্টগোল সৃষ্টি করে। স্থানীয় প্রভাবশালী আলাউদ্দিন মাঝি, তছলিম, আনোয়ার মাঝি, সেন্টু, রফিকসহ কয়েকজন বেসরকারি সালিশ বসান কনের মা-বাবার উপর। সেখানে কনের বাবা শাহজাহান ও পরিবারের সদস্যদের ১৫টি করে বেত্রাঘাতের রায় দেয় তারা। পরে তাদের ওপর ৩০ হাজার টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়।
জরিমানা দিতে না পারায় সালিশদার আফসার কনের স্বামীর একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম অটোরিকশাটি জব্দ করে নিয়ে যায়।
কনের বাবা শাহজাহান বলেন, আমি গরিব মানুষ। মেয়ের বিয়েতে একটু আনন্দ করার জন্য মাইক বাজিয়েছিলাম। এজন্য আফসার, ছারোয়ার, মালেক আমাদের সবাইকে মারধর করে। পরে সালিশ বসিয়ে বেত মারে, জরিমানা ধার্য করে। টাকা না দিতে পারায় জামাইয়ের অটোরিকশাও নিয়ে গেছে। কোথাও বিচার পাচ্ছি না। এখন আরো হুমকি-ধমকি দিচ্ছে।
সালিশে উপস্থিত থাকা আলাউদ্দিন মাঝি বলেন, রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, মহিলাদের বেত মারা হয়নি, পুরুষদের মারা হয়েছে। মহিলাদের শাসন করার দায়িত্ব শাহজাহানকে দেওয়া হয়েছিল।
এ বিষয়ে আইনজীবীরা বলছেন, এটি সম্পূর্ণ বেআইনি, ফৌজদারি অপরাধ করেছে হামলাকারীরা। আইনত এমন কোনো ঘটনায় সালিশ-বিচার করার কোনো অধিকারই নেই কারো। মাইক বাজানো নিয়ে সামাজিক কোনো আপত্তি থাকলে সেটার নিষ্পত্তি থানায় কিংবা আইন-আদালতের মাধ্যমে করা যেত। কাউকে বেত্রাঘাত, জরিমানা আদায়ের সুযোগ নেই এসব ক্ষেত্রে।
স্থানীয়রা বলেছেন, এ ধরনের সালিশ সম্পূর্ণ অবৈধ। বাংলাদেশের কোনো আইনে গ্রাম্য সালিশকে শারীরিক শাস্তি দেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়নি। তবে মৌলবাদীরা আইনের তোয়াক্কা করছে না।
সাগরিয়া ফাঁড়ির এসআই ফরহাদ হোসেন বলেন, সংঘর্ষের খবর পেয়ে গিয়েছিলাম। উভয়পক্ষকে বলেছি আইনি ব্যবস্থা নিতে। তারা সালিশ করেছে, তাই আর থাকিনি। এখনো কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি।
স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা জানান, সংস্কৃতি অঙ্গনে ‘চাপ বাড়ছে’—ইউনূস সরকারের সময়ে। মৌলবাদী গোষ্ঠীও দিনদিন আগ্রাসী হচ্ছে।
এই ঘটনায় স্থানীয় সুধীজন ও সংস্কৃতি সংগঠকরা বলছেন, ইউনূস সরকারের সময়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আঘাত এলেও কোনো বিচার হচ্ছে না।
তাদের অভিযোগ, বাউল শিল্পীদের ওপর হামলা, প্রকাশ্যে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া, বিয়ে বাড়িতে মাইক বাজানোর জন্য হামলা মূলত বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর হুমকি। তারা প্রকাশ্য ঘোষণায় সাংস্কৃতিক আক্রমণ চালাচ্ছে। উৎসব বা মাইক ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমাজে জঙ্গিবাদ কায়েম করতে চাচ্ছে।
