এজাজ মামুন
আজ শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে, মহান মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় যখন নিশ্চিত, ঠিক তার দুদিন আগে বাঙালি জাতি হারায় তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর, রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস এর যৌথ এবং সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে দেশের শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিকসহ জাতির মেধাবী ও বিবেকবান ব্যক্তিদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল উদ্দেশ্য ছিল জাতিকে মেধাহীন ও পঙ্গু করে দেওয়া, যাতে যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশ মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র নিশ্চিতভাবে বুঝতে পেরেছিল যে তাদের পরাজয় অনিবার্য। তারা জানত যে জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা বেঁচে থাকলে এ মাটিতে তাদের কোনো স্থান হবে না এবং এই দেশ আবার ফুলে-ফলে, মেধা মনন, প্রযুক্তি ও আধুনিকতায় ভরে উঠবে। এই কারণেই পরিকল্পিতভাবে বরেণ্য ব্যক্তিদের রাতের আঁধারে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করা হয়।
১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বরের এই হত্যাকাণ্ড ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম বর্বর ঘটনা যা বিশ্বব্যাপী শান্তিকামী মানুষকে স্তম্ভিত করেছিল। পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের পর ঘাতকেরা ঢাকার মিরপুর, রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন বধ্যভূমিতে তাঁদের লাশ ফেলে রেখে যায়।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পরপরই শহিদ বুদ্ধিজীবীদের নিকটাত্মীয়রা এবং বিজয়ী বাঙালি মিরপুর ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে তাঁদের গলিত ও ক্ষতবিক্ষত লাশ খুঁজে পান। লাশগুলোতে ছিল আঘাতের চিহ্ন, চোখ, হাত-পা ছিল বাঁধা। অনেককে গুলি করা হয়েছিল, আবার অনেককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। লাশের ক্ষত চিহ্নের কারণে অনেকেই প্রিয়জনের মৃতদেহ শনাক্ত করতে পারেননি।
হত্যার শিকার হওয়া নক্ষত্রপ্রতিম ব্যক্তিত্বদের মধ্যে রয়েছেন- অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী (শিক্ষক, নাট্যকার), শহিদুল্লা কায়সার (ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক), আনোয়ার পাশা (কবি, লেখক), ড. ফজলে রাব্বী ও ড. আলীম চৌধুরী (চিকিৎসক), অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য, ড. মো. মুর্তজা, ড. আবুল খায়ের, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, অধ্যাপক সিরাজুল হক ও ড. সন্তোষ ভট্টাচার্য (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক), সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, সেলিনা পারভীনসহ অসংখ্য বুদ্ধিজীবী।
১৯৭২ সালে জাতীয়ভাবে প্রকাশিত সংকলন ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুসারে, শহিদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা ছিল মোট ১ হাজার ৭০ জন।
পরিকল্পনাকারী ও ঘাতকদের পরিচয়
এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী, যিনি প্রায় ২০,০০০ বুদ্ধিজীবীকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন বলে তদন্ত কমিটির রিপোর্টে জানা যায়। তিনি এই বর্বরতার প্রধান হোতা হিসেবে কাজ করেন।
তবে তার এই নীলনকশা বাস্তবায়নের জন্য তালিকা প্রস্তুত করা এবং মাঠ পর্যায়ে হত্যাকাণ্ড কার্যকর করার দায়িত্ব দেওয়া হয় জামায়াতে ইসলামী কর্তৃক গঠিত কুখ্যাত আধাসামরিক বাহিনী আল-বদর এর ওপর। এই বাহিনীই বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিশ্চিহ্ন করার মূল কাজটি করে। আল-বদর বাহিনীর দুই প্রধান ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হয় চৌধুরী মঈনুদ্দীন (অপারেশন ইন-চার্জ) এবং আশরাফুজ্জামান খান (প্রধান জল্লাদ)।
১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের পর আশরাফুজ্জামান খানের নাখালপাড়ার বাড়ি থেকে তার একটি ব্যক্তিগত ডায়েরি উদ্ধার করা হয়। যার দুটি পৃষ্ঠায় প্রায় ২০ জন বুদ্ধিজীবীর নাম ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের কোয়ার্টার নম্বরসহ লেখা ছিল যা ছিল এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের স্পষ্ট প্রমাণ। শুধু তাই নয়, আশরাফুজ্জামান খানের গাড়ির ড্রাইভার মফিজুদ্দিনের দেওয়া সাক্ষ্য অনুযায়ী, রায়েরবাজারের বিল ও মিরপুরের শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি থেকে বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল, যাঁদের সে নিজ হাতে গুলি করে মেরেছিল।
অন্য প্রধান ঘাতক চৌধুরী মঈনুদ্দীন ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি অবজারভার ভবন থেকে বুদ্ধিজীবীদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে রাও ফরমান আলী ও ব্রিগেডিয়ার বশীর আহমেদের কাছে পৌঁছে দিতেন।
এই মূল ঘাতকদের পাশাপাশি আরও অনেকেই ছিল এই নৃশংসতায় জড়িত ছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম এ বি এম খালেক মজুমদার (সাংবাদিক শহিদুল্লাহ কায়সারের হত্যাকারীও খালেক মজুমদার তৎকালীন ঢাকা শহরের জামায়াতে ইসলামীর নেতা), মাওলানা আবদুল মান্নান (বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. আলীম চৌধুরীর হত্যাকারী), আবদুল কাদের মোল্লা (কবি মেহেরুন্নেসার হত্যাকারী)।
আমাদের শহিদ বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন মেধাবী ও ধ্রুবতারা। তাঁরা ছিলেন জাতির বিবেকের কণ্ঠস্বর। তাঁরা অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যমুক্ত, আধুনিক ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ চেয়েছিলেন।
তাঁদের এই আত্মত্যাগ আমাদের যেকোনো সংকটে সঠিক পথের সন্ধান দেয়। শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত জাতি তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছে এবং তাঁদের আদর্শকে ধারণ করে একটি উন্নত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিচ্ছে।
