কবির য়াহমদ
১.
হাদির অনুসারীরা রাতভর যে তাণ্ডব চালাল, এটা পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব না। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে কেন তথ্য থাকল না? কেন সরকার কোন ব্যবস্থা নিলো না? তাণ্ডব চলাকালে সরকার-প্রশাসন কেন ক্রিয়াশীল হলো না?
অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেইজ-২ চলমান। ম্যাজেস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে সশস্ত্র বাহিনী মাঠে—তারপরেও এত বড় তাণ্ডব কীভাবে চলল?
নাশকতার এই পরিকল্পনার আশঙ্কার কথা আগেই লিখেছিলাম; লিখেছিলাম ওখানে সরকারের সক্ষমতার প্রশ্ন জড়িত—রাতভর তাণ্ডবদৃশ্য দেখার পর বলতেই হয় সরকার অক্ষম, এবং অথবা সরকার এটা চালিয়ে যেতে সুযোগ করে দিয়েছে।
এটা অন্ধকারের আততায়ীদের ড্রেস রিহার্সাল ছিল। গত বছরের আগস্টে যারা থানা লুট করেছিল, যারা সরকার পরিবর্তনের কারণে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিল, তাদের এখানে সক্রিয় থাকার বিষয় উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এরা তাদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। এবং ইঙ্গিত পেয়েছে ভবিষ্যতে প্রয়োজন পড়লে আবারও নামতে বাধা নেই তাদের। এরা বুঝতে পেরেছে মাঠে নামলে সরকার-প্রশাসনসহ সবাই নিষ্ক্রিয় থাকবে।
এত তাণ্ডবের সময়ে দেশে যেমন সরকারের অস্তিত্ব ছিল না, তেমনি অস্তিত্ব ছিল না রাজনৈতিক দলের। বিএনপি এখানে দায়িত্বশীলতা দেখিয়ে দুর্বৃত্তদের নিবৃত্ত থাকার আহ্বান জানাতে পারত, কিন্তু এই দায়িত্বশীলতা দেখাতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপি ছাড়া ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বামপন্থীরা গণতান্ত্রিক ও ইতিবাচক ধারার দল ছিল—তারাও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। অন্য যারা, তারা প্রতিক্রিয়াশীল বলে তাদের নিয়ে আশা ছিল না।
এই যে ভয়াল রাত কাটল দেশের—এটা নিঃসন্দেহে কলঙ্কের। এটা ভুলে যেতে চাইলেও ভুলে যাওয়া যাবে না।
২.
‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ কবিতায় নাগরিক কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন—‘আর কতবার দেখতে হবে এ খাণ্ডবদাহন’; কবিতাটি একাত্তরের প্রেক্ষাপটে হলেও খাণ্ডবদাহনের কালরাত দেখল কাল দেশ। স্বাধীন দেশে এ খাণ্ডবদাহনে আমরা ভীত, আমরা উদ্বিগ্ন।
জুলাই বাংলাদেশে চরমপন্থিদের যে উত্থান ঘটিয়েছে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এর প্রমাণ তারা গত ১৭-মাসে বারবার দিয়েছে। তবে গতরাতে যে প্রমাণ দিলো, সেটা আগের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে। এটা এমন একটা সময়ে ঘটল, যখন নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে দেশ।
চরমপন্থিরা গত রাতে মাঠে যত লোক নামিয়েছে, সংখ্যায় সারাদেশে হয়তো এটা ১০/১৫/২০ হাজার। এর বেশি নয় নিশ্চয়। কিন্তু এই ক্ষুদ্র একটা অংশকে সরকার মোকাবেলা করেনি। জননিরাপত্তাকে গ্রাহ্য করেনি সরকার। মাঠ খালি করে দিয়েছে নাশকতাকারীদের জন্যে। বিনা বাধায় নাশকতা করে গেছে তারা। জুলাই-আগস্টের নাশকতার পর মাঝখানে ধারণা করা হচ্ছিল শক্তি ক্ষয় হয়েছে তাদের; কিন্তু এইধারণা যে ভুল, সেটা প্রমাণ করে দিয়েছে তারা।
উগ্রপন্থীদের যে দল কাল রাতভর নাশকতা করেছে, এরাই শেষ শক্তি নয়। আরও আছে। এরা কারা—সেটা জানে সবাই। সরকারও জানে। তবে সরকার এদেরকে ধরবে না, বাধা দেবে না; কারণ এরাই সরকারের মূল শক্তি।
খাণ্ডবদাহনের কাল রাত শেষে এখন মনে হচ্ছে উগ্রপন্থীদের হাত থেকে রাজনীতিবিদদের হাতে দেশ ফিরতে বেশ কাঠখড় পোহাতে হবে। নির্বাচন যদি হয়ও তবে এই উগ্রপন্থীরা তাদের মূল শক্তিকে ক্ষমতায় বসাবে। এখানে রাজনীতি ও ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন যারা, তাদের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে যে সময় লাগবে না—এর প্রমাণ মিলেছে গতরাতে।
হাদি নামের যে ছেলেটি আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছে, তার মৃত্যুসংবাদের পর অতিআবেগে প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে বসলেন। তার ভাষণ আর নাশকতা শুরুর সময়ক্ষণ বিশ্লেষণ করলে অনেক কিছুর সঙ্গে অনেক কিছুর যোগসূত্র মিলানোর চেষ্টা করছেন অনেকেই। প্রধান উপদেষ্টাকে ভাষণ দেওয়ার সময় দিয়েছে নাশকতাকারীরা—এমনটা বলছেন যারা, তাদের কথায় সায় আমি ব্যক্তিগতভাবে দিতে না চাইলেও, যোগসূত্রের বিষয়টিও অগ্রাহ্য করতে পারছি না।
এখানে উদ্দেশ্য ও বার্তা অনেক। অস্থির দেশ আরও অস্থির হলে লাভ কার? সরকারের কি নয়? লাভ এনসিপি-জামায়াত ও ধর্মভিত্তিক দলগুলোর কি নয়?
