ঢাকা থেকে মোহাম্মদ মিজানুর রহমান
ঢাকা: আলোক শিক্ষালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক অধ্যাপক রাশেদা নাসরীন এর উদ্যোগে প্রতি বছরের মতো এবছরও বিজয়ের মাসে ‘বিজয়ফুল উদযাপন কর্মসূচি–২০২৫’ আয়োজন করা হয়। প্রতিবছর বৃহৎ পরিসরে বিজয়ফুল পরানো, পথচারীদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরা, শিক্ষার্থীদের হাতে বিজয়ফুল তৈরি, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিজয় র্যালিসহ নানা আয়োজন হয়ে থাকে।
তবে, এ বছর বিশেষ পরিস্থিতির কারণে স্কুলের বাইরে জনসমাগমে কর্মসূচি পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। নিরাপত্তাজনিত বিষয় এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার বিরোধী চক্রের নাশকতামূলক কার্যক্রমের আশঙ্কায় সীমিত পরিসরে স্কুল ক্যাম্পাসেই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ১–১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের সামনে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস উপস্থাপন চলছে। মহান বিজয় দিবস ১৬ই ডিসেম্বর উপলক্ষে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছে।
স্কুলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা বুকে বিজয়ফুল ধারণ করে বিজয়ের মাসের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের আত্মত্যাগ।
শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সামনে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা, সংগ্রামের পথ, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথা এবং স্বাধীনতার মূল্য সম্পর্কে প্রাণবন্ত বর্ণনা উপস্থাপন করেন। শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দিয়ে এসব কথা শোনে এবং নিজেরা হাতে বিজয়ফুল তৈরি করে দেশপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতি গভীর অনুরাগ অর্জন করে।
মর্যাদা, শৃঙ্খলা ও শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে বিজয়ের মাসের প্রথম দিনটি সফলভাবে উদযাপিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের অজানা তথ্য নিয়ে শিক্ষক আলোচনা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে ৬ই ডিসেম্বর।
শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে আলোক শিক্ষালয়ে প্রতি মাসে সমসাময়িক ও ঐতিহাসিক বিষয়ে মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বিজয়ের মাস উপলক্ষে ডিসেম্বর মাসের আলোচ্য বিষয় নির্ধারিত হয়— “মুক্তিযুদ্ধের অজানা তথ্য”।
আলোচনার পূর্বে শিক্ষকরা বই, গবেষণা, প্রবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ ও ঐতিহাসিক নথির ওপর ভিত্তি করে নিজ নিজভাবে তথ্য সংগ্রহ করেন। প্রস্তুতকৃত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, প্রশ্ন ও বিশ্লেষণমূলক ধারণা তারা আলোচনায় উপস্থাপন করেন।
শিক্ষকদের স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধের বহু অজানা, কম আলোচিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে, যা শিক্ষকদের ইতিহাসবোধ, গবেষণাচেতনা ও দেশপ্রেমকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
আলোক শিক্ষালয়ের পরিচালক অধ্যাপক রাশেদা নাসরীন অনলাইনে যুক্ত হয়ে আলোচনার সার্বিক তদারকি করেন এবং কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ফলাফল ও গুরুত্ব:
১. শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে:
বিজয়ফুল উদযাপন কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস, আত্মত্যাগের গল্প ও বিজয়ের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
নিজের হাতে বিজয়ফুল তৈরি করায় শিক্ষার্থীরা ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে অনুভব করতে পেরেছে। তাদের মাঝে দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ আরও বেড়েছে।
২. শিক্ষকদের ক্ষেত্রে:
আলোচনায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষকদের জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আরও বস্তুনিষ্ঠ, বিশ্লেষণধর্মী ও গভীর হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সত্য ও সঠিক তথ্য উপস্থাপনে শিক্ষকদের দায়িত্ববোধ আরও শক্তিশালী হয়েছে।
৩. প্রতিষ্ঠানগতভাবে:
আলোক শিক্ষালয় বিজয়ের মাসকে সগৌরবে ও মর্যাদার সঙ্গে উদযাপন করছে। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সৃজনশীল আয়োজনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণে অঙ্গীকারবদ্ধ প্রমাণিত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, এই বছরের বিজয়ফুল উদযাপন ও শিক্ষক আলোচনা কর্মসূচি ছিল অত্যন্ত সফল, অর্থবহ এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ বিকাশে অনন্য দৃষ্টান্ত।
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে আলোক শিক্ষালয়ে বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান:
১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের এক গৌরবময় দিন। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ, অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগ ও জাতির অশেষ ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার স্মরণে সারা দেশের মতো আলোক শিক্ষালয়েও যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান বিজয় দিবস উদযাপিত হয়েছে।
এ উপলক্ষে আলোক শিক্ষালয়ে আয়োজিত হয় একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিল নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নির্বাহী পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক কাজী মদিনা, সহ-সভাপতি প্রকৌশলী মির্জা আবু তাহের, ড. মোঃ জসীম উদ্দিন ও তাহমিনা বেগম, নির্বাহী সদস্য সাবিকুন নাহার তাজী ও শামসুন্নাহার তাহের এবং প্রাক্তন শিক্ষক মোহাম্মদ নুরুল্লাহ আহমেদ। তাঁদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন শিক্ষক মাহবুবা চৌধুরী। এ সময় শিক্ষক ফারজানা মাহনুর, শিক্ষক সাবেরা এবং প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান বিজয় দিবসের তাৎপর্য ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করার গুরুত্ব নিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন।
সাংস্কৃতিক পর্বে শিক্ষার্থীরা পরিবেশন করে দেশাত্মবোধক গান, কবিতা আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশনা, যা উপস্থিত দর্শকদের মাঝে গভীর আবেগ ও দেশপ্রেমের অনুভূতি সৃষ্টি করে।
অনুষ্ঠানের পুরো সময়জুড়ে আলোক শিক্ষালয়ের পরিচালক অধ্যাপক রাশেদা নাসরীন অনলাইনের মাধ্যমে যুক্ত থেকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।
লেখক: প্রধান শিক্ষক, আলোক শিক্ষালয়, ঢাকা।
