
আলমগীর শাহরিয়ার
রোম শহর যখন ধ্বংস হচ্ছিল এবং পুড়ছিল তখন পরাক্রমশালী রোম সাম্রাজ্যের অন্যতম অধিপতি সম্রাট নিরো নাকি বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। যদিও বাদ্যযন্ত্রটি বাঁশি নাকি অন্যকিছু ছিল, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক আছে, কিন্তু নিরোর নির্বিকারত্বে তিলে তিলে গড়ে ওঠা প্রাচীন শহর রোম যে পুড়ে অঙ্গার হয়েছিল– তা নিয়ে কারও সংশয় নেই। অবিমৃশ্যকারী, অদূরদর্শী নেতৃত্বের ফলে তৈরি হওয়া নৈরাজ্যের আগুনে এভাবে শুধু রোম নয়, পৃথিবীর অনেক সমাজ-সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেছে। নির্বিকার নিরোর বাঁশি একটি ব্যর্থ, অথর্ব, উদাসীন রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতীক হিসেবে ভাবা হয়। দেশের অন্যতম শীর্ষ দুটি মিডিয়া হাউসে আগুন দেওয়া ও লুটপাট করা হয়েছে। অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন সেসব গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিক ও অফিস স্টাফরা।
প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের সাংবাদিকরা শেষ পর্যন্ত রেহাই পেলেও ময়মনসিংহের ভালুকায় নিরীহ পোশাক শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাস এই ধর্মোন্মাদ জনতার মব থেকে রেহাই পাননি। ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগ তুলে তাঁকে নির্মমভাবে পিটিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। রাষ্ট্র, সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মবের এই চোরা স্রোতকে আটকাতে পারেনি। এমন লোমহর্ষক ঘটনা শুনে গা শিউরে ওঠে। কেবল মধ্যযুগের অন্ধকার ও বর্বর সময়ের সঙ্গে এর তুলনা চলে। সভ্য দুনিয়ায় এমন ঘটনা কল্পনাতীত। দিপু দাসের অবুঝ মেয়েটি আজীবন এই ভয়ানক ঘটনার স্মৃতিচারণ করে সমাজে সংকুচিত মন নিয়ে বড় হবে– ভাবলে মানুষ হিসেবে নিজেকে বড় অকিঞ্চিৎকর মনে হয়। ধর্মের নামে এই অধার্মিকদের উৎপাতে সমাজ ছেয়ে গেছে। দেশের স্বাধীনতা, গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র কেন হুমকির মুখে? পাকিস্তান আমল থেকে বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশের অনন্য অবদান রাখা প্রতিষ্ঠান ছায়ানট, উদীচীতে একযোগে আগুন, হামলা, লুটপাট নিছক দুষ্কৃতকারীদের ঘটানো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতি বিনাশে পরিকল্পিত আঘাত।
দিপু চন্দ্রের ঘটনার কাছাকাছি সময়ে লক্ষ্মীপুর জেলায় এক বিএনপি নেতার ঘরেও আগুন লাগিয়েছে এই চলমান মবের কারিগররা। ৭ বছর বয়সী আয়শা আক্তার নামে একটি ছোট্ট শিশু অবরুদ্ধ তালাবদ্ধ ঘরে সেই আগুনে পুড়ে মারা গেছে। এই হৃদয়বিদারক ঘটনা আমাদের মানুষ হিসেবে বড় অপরাধী করে তোলে। চারদিকে এই গণঅপরাধপ্রবণতার সংকটময় দিক হচ্ছে, দিন দিন আমরা অনুভূতিশূন্য হয়ে উঠছি এবং বড় বড় ঘটনাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। অর্থাৎ সমাজে এসব ঘটনার অভিঘাত কত গভীর উদ্বেগের– সেই বোধ লোপ পাচ্ছে।
মধ্যযুগের সর্বশেষ কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর বলেছিলেন, ‘নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়?’ যখন কোনো নগরে আগুন লাগে, সেই আগুনের লেলিহান শিখা থেকে কেউ রেহাই পায় না। আমরা সেই অনিশ্চয়তায় ভরা সর্বগ্রাসী আগুনকাল পার করছি, যখন ইতিহাসবিস্মৃত প্রজন্ম তৈরি করতে স্বাধীনতার স্থপতিকে অমর্যাদা করা হয়; যখন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কবরে আগুন দেওয়া হয়; জীবিতদের লাঞ্ছনা করে তাদের গৌরবগাথা তুলে ধরা ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়; স্বাধীনতা জাদুঘরের অমূল্য ঐতিহাসিক দলিল বিনষ্ট করা হয়; পীরের লাশ কবর থেকে তুলে ধর্মোন্মত্ত জনতা পুড়িয়ে দিয়ে উল্লাস করে; সুফি সাধকদের মাজার গুঁড়িয়ে দেয় উগ্রবাদীরা। ভিন্নমতকে নির্মমভাবে দমন করলে, লুটপাটকে প্রশ্রয় দিলে সামাজিক মূল্যবোধ ভেঙে পড়ে। আজ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে মানুষ, আবেগ-অনুভূতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, মুক্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতীকখ্যাত ঘর।
চলমান এই দহনকাল থেকে উত্তরণ খুব জরুরি। লাগাম টেনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি এই মব সন্ত্রাসীদের। সমাজে স্থিতিশীলতা না এলে এই রাষ্ট্র, লাখ লাখ শহীদের রক্তে পাওয়া এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হবে।
আলমগীর শাহরিয়ার: যুক্তরাজ্যপ্রবাসী
কবি ও গবেষক
