অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে ছাত্রলীগের শতাধিক কর্মী নিহত হয়েছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ কর্মীদের বাড়িতে না পেয়ে তাদের বাবা–মা ও স্বজনদের হত্যা করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
রোববার বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রচারিত এক ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। বক্তব্যের শুরুতে আন্দোলন–সংগ্রামে নিহত ছাত্রলীগ কর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনা বলেন, “ফ্যাসিস্ট ইউনূস হাজার হাজার ছাত্রলীগ কর্মীকে বিনা অপরাধে জেলে রেখেছে। শতাধিক ছাত্রলীগ কর্মীকে হত্যা করেছে। ছাত্রলীগের কর্মীদের বাড়িতে না পেলে তার বাবা–মা–চাচাকে হত্যা করেছে। এরকম জঘন্য হতে পারে—এটা আমাদের চিন্তারও বাইরে ছিল।”
তিনি দাবি করেন, একটি “মেটিকুলাস ডিজাইনের” মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে ইউনূস সরকার নিজের স্বার্থ রক্ষা করছে, অথচ দেশের মানুষ নিজের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও নিরাপদ নয়।
শেখ হাসিনা বলেন, ছাত্রলীগ কর্মীদের হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরতে হবে।
তাঁর ভাষায়, “হাজারো ছাত্রলীগ কর্মীকে হত্যা করেছে, বাড়িতে না পেলে বাবা–মা–চাচাকে হত্যা করেছে—এই তথ্য সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিকভাবে জানাতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনা ধ্বংসে যারা জড়িত এবং মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা পরিয়েছে—তাদের তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে বাংলার মাটিতে তাদের বিচার করা যায়।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের প্রতি নির্দেশনা
সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, কাউকে অনুসরণ না করে জনগণের শক্তি নিয়েই পথ চলতে হবে।
তিনি বলেন, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে পাহাড়, তৃণমূল, কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে চেতনা জাগ্রত করতে হবে।
তিনি অভিযোগ করেন, শিক্ষকদের ছাত্রদের দিয়ে অপমান করা হয়েছে, প্রধান বিচারপতিকেও অপমান করা হয়েছে। এসব ঘটনা তুলে ধরে জনমত গঠনের আহ্বান জানান তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তাদের দায়িত্ব নিতে হবে। রাজধানী থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে গণসংযোগ চালিয়ে নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে বলে তিনি নির্দেশ দেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ছাত্রলীগ কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে এবং কারাগারে থাকা নেতাকর্মীদের মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি অভিযোগ করেন, অনেক ছাত্রলীগ কর্মীর শিক্ষাগত সনদ কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “পাকিস্তান আমলেও আইয়ুব খান, মোনায়েম খান ডিগ্রি কেড়ে নিয়েছিল। আমার মা বলতেন—ডিগ্রি কাড়তে পারে, বিদ্যা কাড়তে পারে না।”
নিয়োগ, শিক্ষা ও নির্বাচন প্রসঙ্গে
শেখ হাসিনা বলেন, “বিএনপি আমলে হাওয়া ভবন থেকে তালিকা আসত। এখন তালিকা আসে ইউনূস সেন্টার থেকে, জামায়াতের কাছ থেকে। কিন্তু সাধারণ মানুষ চাকরি পায় না।”
তিনি আরও বলেন, এখন দেখা যাচ্ছে মাদ্রাসায় শতভাগ পাশ হলেও স্কুলে পাশের হার কম—এর কারণ অনুসন্ধানের আহ্বান জানান তিনি।
নির্বাচন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ সবসময় নির্বাচনে বিশ্বাস করে এবং কখনো নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতা দখল করেনি।
তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ ১৩টি নির্বাচনের মাধ্যমে ৯টিতে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় এসেছে। জনগণ আওয়ামী লীগকে চায়।”
তিনি প্রশ্ন তোলেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার অধিকার কে দিয়েছে এবং বলেন, “ইউনূস আসুক নির্বাচনে, আমাদের হারাক।”
শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় জড়িতদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে, অথচ ছাত্রলীগ কর্মীদের জেলে ভরা হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের কারাগারগুলোতে বন্দিদের শোবার জায়গা নেই, যশোরসহ বিভিন্ন কারাগারে ধারণক্ষমতার বাইরে বন্দি রাখা হয়েছে।
ভোট ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে আহ্বান
শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কেউ ভোটকেন্দ্রে যাবে না।
সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এসব পরিস্থিতিতে কেউ যেন ভোটকেন্দ্রে না যায়—এটা নিশ্চিত করতে সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত মানা হবে না। ছাত্রদের মধ্যে বার্তা পৌঁছাতে হবে, সাংগঠনিক কার্যক্রম বিস্তৃত করতে হবে এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনায় নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে।
