আজ ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৭২ সালের এই দিনে পাকিস্তানের কারাগারে প্রায় ২৯০ দিন বন্দিদশা শেষে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে আসেন। বঙ্গবন্ধুর এই প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয় পূর্ণতা লাভ করে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতেপাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকায় বাঙালীদের উপরে গণহত্যা চালানো শুরু করলে সেদিন মধ্য রাত অর্থাৎ ২৬ মার্চ বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ইপিআরের ওয়্যারলেসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণাকে ‘বিচ্ছিনতাবাদ’ অ্যাখ্যা দিয়ে তাকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানে নিয়ে যায় পাকিস্তানি বাহিনী।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন এবং প্রহসনের বিচারে মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কার মধ্য দিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত কাটান। এ সময় তাঁর নেতৃত্বেই পরিচালিত হয় বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ, আর তিনি নিজে বন্দি অবস্থায় মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করলেও বঙ্গবন্ধু তখনও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন। বিজয়ের পর বিশ্বনেতারা তাঁর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হন। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পরাজিত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। মুক্তির পর লন্ডন ও দিল্লি হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি ঢাকায় পৌঁছান।
সেই ঐতিহাসিক দিনের স্মরণে প্রতিবছর ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালিত হয়ে আসছে।
১৯৭২ সালের সেদিন বঙ্গবন্ধুর আগমন ঘিরে পুরো দেশজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। লাখ লাখ মানুষ ঢাকা বিমানবন্দর থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পর্যন্ত রাস্তায় জড়ো হয়ে প্রিয় নেতাকে অভ্যর্থনা জানান। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে ঢাকার আকাশ-বাতাস।
স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু। দীর্ঘ নয় মাসে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের চালানো গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের কথা স্মরণ করে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
সেদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, “যে মাটিকে আমি এত ভালোবাসি, যে মানুষকে আমি এত ভালোবাসি, যে জাতিকে আমি এত ভালোবাসি—আমি জানতাম না, সে বাংলায় আমি আসতে পারবো কিনা। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।”
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার মানুষ নতুন করে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়।
সেই শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যায়। তাঁর নেতৃত্বেই সংগঠিত হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধ।
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন যুদ্ধবিধ্বস্ত ও সদ্য স্বাধীন জাতির হৃদয়ে নতুন অনুপ্রেরণা জাগিয়েছিল। তিনি নিজেই এই প্রত্যাবর্তনকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা’ হিসেবে।
