তোফায়েল আহমেদ
বঙ্গবন্ধু যখন মিয়ানওয়ালি কারাগারে বন্দী, তখন হাবিব আলী ছিলেন সেই কারাগারের প্রিজন গভর্নর। তার মুখে শোনা যাক সেই সময়কার কথা। তিনি বলেন:
“বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর অর্থাৎ ১৬ই ডিসেম্বরের ১০ দিন পর ২৬শে ডিসেম্বর রাতে মুজিবকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ পাবার পরপরই একটা ট্রাক নিয়ে মিয়ানওয়ালি কারাগারের যাই। এমন সময় সেখানে যারা কয়েদি ছিল তারা মুজিবকে ফিসফিস করে বলছিল যে, ওরা এসেছে। মুজিবও ফিসফিসিয়ে বললেন যে, শেষ পর্যন্ত আমি মাথা নত করবো না। তার আগে মিয়ানওয়ালি কারাগারেই সেলের মধ্যে একটা কবর খোঁড়া হয়েছিল।
মুজিব যখন জিজ্ঞেস করেছিল, এটা কী? তখন তাকে বলেছিলাম যে, যুদ্ধ চলছে, এটা বাংকার। শেল্টার নেবার জন্য। আসলে ছিল কবর। তখন মুজিবকে একজন কয়েদি বলছিল যে, আসলে এটা কবর। আপনি যদি আজ বের হন আপনাকে মেরে এখানে কবর দেওয়া হবে।
তখন মুজিব আমাকে বলেছিল, কবরকে আমি ভয় পাই না। আমি তো জানি ওরা আমাকে ফাঁসি দেবে। কিন্তু আমি জানি আমার বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবে। এবং আমি এও জানি, বাংলার দামাল ছেলেরা হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে। সেই বাঙালি জাতিকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না। তিনি সেদিন মিনতি করে বলেছিলেন, আমাকে হত্যা করে এই কবরে না, এই লাশটি আমার বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দিও। যে বাংলার আলো-বাতাসে আমি বর্ধিত হয়েছি- সেই বাংলার মাটিতে আমি চির-নিদ্রায় শায়িত থাকতে চাই।
যাহোক, ইতিমধ্যে ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। ক্ষমতা হস্তান্তরকালে ইয়াহিয়া খান তখন ভুট্টোকে বলেছিলেন যে, শেখ মুজিবকে হত্যা করার অনুমতি দাও, আমার জীবনে যদি কোনো ভুল করে থাকি তাহলে শেখ মুজিবকে ফাঁসিকাষ্ঠে না ঝুলানো। তখন প্রেসিডেন্ট ভুট্টো আমার নিকট জরুরি বার্তা প্রেরণ করেন যে, শেখ মুজিবকে কারাগার থেকে দ্রুত নিরাপদ কোনো স্থানে সরিয়ে ফেলা হোক।
তখন আমি মুজিবকে মিয়ানওয়ালি কারাগার থেকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে ট্রাক নিয়ে কারা ফটকে আসি এবং সেলের মধ্যে গিয়ে শেখ মুজিবকে আমার সঙ্গে যেতে অনুরোধ করি। কিন্তু তিনি আমাকে বাধা দেন। তখন আমি তাকে বলি, শেখ, আমি আপনার একজন শুভাকাঙ্খি, বন্ধু। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমি আপনাকে এখান থেকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে এসেছি। কারণ, এখানে কমান্ডো আসতে পারে। তারা আপনাকে হত্যা করবে। আমার ওপর আপনি আস্থা রাখুন। তারপর মুজিবকে ট্রাকে তুলে, ট্রাকের মধ্যে লুকিয়ে, আমার চশমা ব্যারাজ নামক বাড়িতে নিয়ে যাই।
সেখানে গিয়েই তিনি একটা টেলিফোন করতে চান। মুজিব আমাকে বলেছিলেন, আমি কী আমার স্ত্রীর সাথে কথা বলতে পারি। তখন আমি তাকে বলেছিলাম, না, আমার একমাত্র কাজ হলো আপনার জীবন রক্ষা করা। আপনি টেলিফোন করতে পারবেন না। তখন তিনি বললেন, আমি কী খবরের কাগজ পড়তে পারি। আমার উত্তর ছিল, না। এরপর বললেন, আমি কী এক কাপ চা পেতে পারি। তখন তাকে এক কাপ চা দেওয়া হয়।
আমার বাড়িতে তিনি দুই দিন থাকেন। দিন দুই পরে মুজিবকে নিয়ে যাই শাহুল্যা নামক স্থানে। যেটা একসময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর রেস্ট হাউজ ছিল। পিন্ডি থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে এই শাহুল্যাতেই প্রেসিডেন্ট ভুট্টো এরপর মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। মুজিবকে সালাম দিয়ে বললেন যে, নাউ আই অ্যাম দ্য প্রেসিডেন্ট অব পাকিস্তান অ্যান্ড চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর।
ওই অবস্থায় মুজিব হেসে দিলেন। তখন ভুট্টো জিজ্ঞেস করলেন, আপনি হাসছেন কেন? তখন মুজিব বললেন, আমি বুঝতে পারি একজন প্রেসিডেন্ট সিভিলিয়ান হতে পারে। কিন্তু আমি অবাক হই যখন শুনি যে, একজন সিভিলিয়ান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। তখন ভুট্টো বলেছিলেন, দ্যাট ইজ পসিবল ইন পাকিস্তান।
তারপরই মুজিবের দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল যে, ভুট্টো, টেল মি ফার্স্ট, হোয়েদার আই অ্যাম এ ফ্রি ম্যান অর প্রিজনার। তখন ভুট্টো উত্তর দিয়েছিলেন, নাইদার ইউ আর এ প্রিজনার, নর ইউ আর এ ফ্রিম্যান। তখন মুজিব পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, ইন দ্যাট কেইস আই উইল নট টক টু ইউ।
তখন জুলফিকার আলী ভুট্টো বলতে বাধ্য হলেন যে, ইউ আর এ ফ্রিম্যান। এরপর মুজিব প্রেসিডেন্ট ভুট্টোর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। তারপরে সে অনেক রকমের প্রস্তাব দিলেন। কীভাবে একটা কনফেডারেশন করা যায়, কীভাবে একসঙ্গে থাকা যায় ইত্যাদি। কিন্তু মুজিব কোনো কথাই বললেন না। চুপ করে থেকে শুধু বললেন, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি আমার প্রিয় সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে না পারব, ততক্ষণ আমার পক্ষে কিছুই বলা সম্ভবপর নয়।
এরপর মুজিবকে একটা যৌথ ইশতেহার দেওয়া হয়েছিল স্বাক্ষর করার জন্য। মুজিব সেটাও প্রত্যাখ্যান করলেন। পরিশেষে শেখ মুজিব বললেন, আমি কী এখন দেশে যেতে পারি? ভুট্টো বললেন, হ্যাঁ, যেতে পারেন। কিন্তু কীভাবে যাবেন? পাকিস্তানের পিআইএ ভারতের ওপর দিয়ে যায় না। তখন মুজিব বললেন, সেক্ষেত্রে আমি লন্ডন হয়ে যাবো।
এরপর ৮ই জানুয়ারি শেখ মুজিব মুক্তি পেয়ে পিআইএর একটি বিশেষ বিমানে লন্ডনের উদ্দেশে যাত্রা করেন।”
কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তিলাভ এবং ভুট্টোর সঙ্গে কথোপকথনের স্মৃতিচারণ শেষে ৭৪-এর লাহোর সম্মেলনে হাবীব আলী আমাদের বলেছিলেন – তোমরা বাঙালিরা গর্বিত ও মহাসৌভাগ্যবান যে, শেখ মুজিবের মতো একজন নেতা তোমরা পেয়েছো।
লেখক: তোফায়েল আহমেদ, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর এবং বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রবাদ পুরুষ
