গাজীপুরের কালীগঞ্জে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় হিন্দু ব্যবসায়ী লিটন চন্দ্র ঘোষকে (৫৫) নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তীব্রতা বৃদ্ধির একটি উদাহরণ।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপর হামলা এবং হত্যার ঘটনায় উদ্বেগজনক বৃদ্ধি ঘটেছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ব্যাপক সমালোচনা ডেকে এনেছে।
আজ ১৭ই জানুয়ারি, শনিবার দুপুরে কালীগঞ্জ পৌরসভা-সংলগ্ন বড়নগর সড়কে লিটন চন্দ্র ঘোষ ওরফে কালীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তিনি ‘বৈশাখী সুইটমিট অ্যান্ড হোটেল’-এর মালিক ছিলেন।
পুলিশের তথ্য অনুসারে, একটি কলাগাছের ছড়ি চুরির অভিযোগে তার দোকানের এক কর্মচারীকে মারধর করা হয়। কর্মচারীকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে লিটনও হামলার শিকার হন। হামলাকারীরা কিল-ঘুষি এবং লাঠি-শাবল দিয়ে তাকে আঘাত করে, ফলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
পুলিশ এ ঘটনায় একই পরিবারের তিনজন—স্বপন মিয়া, তার ছেলে মাসুম মিয়া এবং স্ত্রী মাজেদা খাতুনকে গ্রেপ্তার করেছে।
স্থানীয়রা জানান, এই হত্যাকাণ্ডটি সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। লিটনের ওপর হামলাকারীরা মুসলিম। তারা হামলার সময় লিটনের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে কটূক্তি করে, জঘন্য ভাষায় জাত-পাত তুলে গালাগাল দেয়।
এই ঘটনা ইউনূস সরকারের আমলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার নিয়মিত উদাহারণ। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। যদিও ড. ইউনূস দাবি করেন, “এসব হামলা-হত্যা ধর্মীয় কারণে নয়, আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসাবে করা হচ্ছে।”
বিবিসির সাক্ষাৎকারে এভাবেই তিনি সংখ্যালঘু নিপীড়নের ঘটনাগুলোকে বৈধতা দেন। পাশাপাশি হামলাকারিদেরও দায়মুক্তি দিয়েছেন।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৪ আগস্ট থেকে ২০২৫ জুন পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ৪৪২টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে হত্যা, ধর্ষণ, মন্দির-ঘর-দোকান লুটপাট এবং ধর্মীয় স্থান ধ্বংস অন্তর্ভুক্ত।
২০২৫-২০২৬ সালে ৪৫ দিনে ১৫ জন হিন্দু নিহত হয়েছে, যা অতীতের তুলনায় আশঙ্কাজনক। সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে, ডিসেম্বর মাসে ৫১টি হামলা এবং ১০ জন হিন্দু নিহত হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সহিংসতা রাজনৈতিক এবং সাম্প্রদায়িক উভয় কারণে ঘটছে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য চরমপন্থী গোষ্ঠী ক্ষমতায় উঠে এসেছে, যার ফলে হিন্দু এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের উপর হামলা বেড়েছে।
ইউনূস সরকারে আজ্ঞাবহ গণমাধ্যম এবং নিজস্ব প্রেস উইং বিভিন্ন সময়ে এই অভিযোগগুলোকে ‘ভারতীয় গণমাধ্যমের অপপ্রচার” বলে অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন যে এগুলো রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক নয়। যদিও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, ইউনূস সরকারের নিষ্ক্রিয়তা এবং অস্বীকারের কারণে সহিংসতা দিন দিন বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই সহিংসতার খবরগুলো বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন সংখ্যালঘু সুরক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা অভিযোগ করেছেন যে ইউনূস সরকার চরমপন্থীদের উৎসাহতি করছে এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষায় সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ।
জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল এবং অন্যান্য সংস্থা বলছে, এই হিংসা মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আইসিসিপিআর-এর মতো আন্তর্জাতিক চুক্তির লঙ্ঘন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কমিশনার জনি মুর বলেছেন, ড. ইউনূস সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন জাতিগত-ধর্মীয়সহ সকল সংখ্যালঘুর সুরক্ষায়।
এমন পরিস্থিতিতে ইউনূস সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। সংখ্যালঘু সুরক্ষা না হলে দেশের স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিপন্ন হবে। গাজীপুরের এই ঘটনা একটি সতর্কতা—সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময় এসেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
