নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ আট মাস ধরে কারাগারে আটকে রাখার ঘটনা নতুন করে মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
অভিযোগ উঠেছে, কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত না থাকা সত্ত্বেও শুধু বাবার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে একের পর এক মামলায় জড়িয়ে কিশোরটির শিক্ষাজীবন কার্যত ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে।
ভুক্তভোগী কিশোর জিদান বেগমগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ভিপি মোহাম্মদ উল্লাহ মানিকের ছেলে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, জিদানের অপ্রাপ্তবয়স্ক স্কুলপড়ুয়া ছাত্র হলেও তার নামে একাধিক মামলা দেওয়া হয়েছে এবং গত আট মাস ধরে সে কারাগারে রয়েছে। অথচ জিদানের নিজের কোনো রাজনৈতিক পদ-পদবি নেই, কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
জিদানের পরিবার জানায়, তার বাবা মোহাম্মদ উল্লাহ মানিক প্রায় ৫ বছর আগে মারা যান। তিনি নোয়াখালী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ছিলেন এবং এলাকায় দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পারিবারিক সূত্র অনুযায়ী, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকলেও তার বিরুদ্ধে সহিংস অপরাধের কোনো দাগ ছিল না।
স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জানান, মোহাম্মদ উল্লাহ মানিককে ভালোবেসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘কালা মানিক’ নামে ডাকতেন। সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের কারণেই তার পরিবার আজ প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, কোনো শিশুকে বিনা কারণে গ্রেপ্তার করে দীর্ঘদিন কারাগারে রাখা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ এবং দেশের প্রচলিত আইন—উভয়েরই পরিপন্থী। বাংলাদেশের শিশু আইন অনুযায়ী, শিশুদের ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার ও বিচার প্রক্রিয়ায় বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ জিদানের ক্ষেত্রে সেই ন্যূনতম আইনি সুরক্ষা মানা হয়নি বলে অভিযোগ।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি কোনো কিশোরের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ও প্রমাণযোগ্য অভিযোগ না থাকে, তাহলে তাকে আটক রেখে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করা সরাসরি আইনের অপব্যবহার।
একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “রাজনৈতিক পরিচয়ের দায় সন্তানের ঘাড়ে চাপানো হলে সেটি আইনের শাসন নয়, বরং প্রতিহিংসামূলক রাষ্ট্রচর্চার উদাহরণ।”
এই ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, তাদের পরিবার ও স্বজনদের ওপর ভুয়া মামলা, মব হামলা, হত্যা, দখলবাজিসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের হাজার হাজার ঘটনা ঘটেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিরোধী বা ক্ষমতাচ্যুত দলের নেতাদের পরিবার-স্বজনদের ওপর আইন প্রয়োগ হলে তা সরকারের নিরপেক্ষতা ও মানবিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
স্থানীয়ভাবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, জিদানের মতো ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। বরং এগুলো একটি বৃহত্তর প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে পরিবারকেও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, অবিলম্বে জিদানের মামলাগুলোর নিরপেক্ষ পুনর্বিবেচনা এবং তাকে জামিনে মুক্তি দিয়ে স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনে ফেরার সুযোগ দেওয়া হোক। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে শিশু ও পরিবারের সদস্যদের হয়রানি বন্ধে স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জিদানের মতো একজন কিশোরের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে গেলে তার দায় শুধু একটি পরিবারের নয়—এর দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
