প্রস্তাবিত জাতীয় গণভোটকে ঘিরে বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো ধ্বংসের গভীর আশঙ্কার কথা তুলেছেন সজীব ওয়াজেদ জয়। নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি দাবি করেন, সংসদের বাইরে বা সংসদের পূর্বানুমোদন ছাড়াই গণভোট আয়োজনের উদ্যোগ সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং এটি কার্যত “জনগণের নামে সংবিধান পাশ কাটানোর অপচেষ্টা”।
জয় বলেন, সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদে জনগণকে রাষ্ট্রক্ষমতার মালিক বলা হলেও সেই ক্ষমতা প্রয়োগের একমাত্র সাংবিধানিক পথ হলো নির্বাচিত সংসদ। বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র নয়, বরং প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের রাষ্ট্র। অথচ বর্তমান সংবিধানে বাধ্যতামূলক বা সিদ্ধান্তমূলক কোনো গণভোটের বৈধতা নেই।
সংসদকে বাদ দিয়ে গণভোট হলে তা হবে সংবিধানবিরোধী
ফেসবুক পোস্টে সজীব ওয়াজেদ জয় স্পষ্ট করে বলেন, সংবিধান সংশোধনের একমাত্র বৈধ প্রক্রিয়া নির্ধারিত রয়েছে ১৪২ অনুচ্ছেদে, যেখানে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ অবস্থায় সংসদকে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে গণভোট আয়োজন করা হলে তা হবে আল্ট্রা ভাইরেস—অর্থাৎ সংবিধানপ্রদত্ত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম।
তার ভাষায়, এ ধরনের পদক্ষেপ শুধু সংবিধানের ৭ ও ১৪২ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী নয়, বরং এটি একটি স্পষ্ট সংবিধানবহির্ভূত কার্যক্রম।
‘হ্যাঁ’ ভোট মানেই রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি ভেঙে পড়া
জয় আরও বলেন, যদি প্রস্তাবিত গণভোটের লক্ষ্য হয় বর্তমান সংবিধান বাতিল করা, তাহলে ‘হ্যাঁ’ ভোটে বিজয় মানেই বাংলাদেশ এক ভয়াবহ সাংবিধানিক শূন্যতায় পতিত হবে। কারণ সংবিধান বাতিল হয়ে গেলে রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধ কাঠামো আর অবশিষ্ট থাকবে না, আবার নতুন সংবিধান কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত কোনো বিকল্প আইনগত ভিত্তিও তৈরি হবে না।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এমন পরিস্থিতিতে কোনো রাজনৈতিক দল সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও সরকার গঠন করে শপথ নেওয়ার সাংবিধানিক সুযোগ থাকবে না। এতে রাষ্ট্রক্ষমতার বৈধ উৎস সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
গণপরিষদ ছাড়া নতুন সংবিধান মানেই বৈধতার সংকট
নতুন সংবিধান প্রণয়ন প্রসঙ্গে সজীব ওয়াজেদ জয় গণপরিষদ গঠনের ওপর জোর দেন। তার মতে, জনগণের প্রকৃত সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রকাশের একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ হলো গণপরিষদ। এতে রাজনৈতিক দল, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, নাগরিক সমাজ ও আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব।
তিনি বলেন, নির্বাহী বিভাগ বা কোনো অন্তর্বর্তী সরকার যদি গণপরিষদ ছাড়াই সংবিধান রচনা করে, তাহলে তা হবে উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সংবিধান, যা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈধতা সংকট সৃষ্টি করবে।
সাংবিধানিক অস্থিরতায় ক্ষমতা দখলের ঝুঁকি
জয়ের ফেসবুক পোস্টে আরও বলা হয়, সাংবিধানিক অনিশ্চয়তার সময় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য বদল, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাব কিংবা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বাসনের মতো ইস্যু সামনে এনে কিছু গোষ্ঠী রাষ্ট্রক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা করতে পারে।
তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংগঠিত ও আদর্শগতভাবে সংহত গোষ্ঠীগুলো দুর্বল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সুযোগ নিয়ে অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হুমকি।
‘এটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, সাংবিধানিক ঝুঁকির মুহূর্ত’
সবশেষে সজীব ওয়াজেদ জয় মন্তব্য করেন, সংবিধান সংশোধন ছাড়াই গণভোট আয়োজন, গণপরিষদ ছাড়া নতুন সংবিধান প্রণয়ন এবং পূর্বনির্ধারিতভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের ওপর নির্ভরতা—এই তিনটি বিষয় একত্রে বাংলাদেশের সাংবিধানিক শৃঙ্খলা, রাষ্ট্রক্ষমতার বৈধতা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামোর জন্য ভয়াবহ সংকট ডেকে আনতে পারে।
