বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে।
গতকাল ২৮শে জানুয়ারি ওয়েস্টমিনস্টারে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় স্পষ্ট করে বলা হয়—রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ছাড়া নির্বাচন আয়োজন করা হলে, ভোট গ্রহণ শুরুর আগেই সেই প্রক্রিয়া জনআস্থা হারাবে।
হাউজ অব লর্ডসের কমিটি রুম–৩-এ আয়োজিত “বাংলাদেশ অ্যাট দ্য ক্রসরোডস” শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ব্রিটিশ এমপি বব ব্ল্যাকম্যান সিবিই বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে, চাপ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের পরিবেশ তৈরি করে গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তার ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বৈধতা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এই সেমিনারের আয়োজন করেন লর্ড রামি রেঞ্জার। অনুষ্ঠানে অংশ নেন আইন বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী নেতা, মানবাধিকার কর্মী এবং প্রবাসী বাংলাদেশি প্রতিনিধিরা। যৌথভাবে এটি আয়োজন করে পলিটিকা নিউজ, সেন্টার ফর গ্লোবাল পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স এবং নর্থ্যাম্পটন ব্রিটিশ বাংলাদেশি বিজনেস চেম্বার।
উদ্বোধনী বক্তব্য দেন নর্থ্যাম্পটন টাউন কাউন্সিলের কাউন্সিলর নাজ ইসলাম। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পলিটিকা নিউজের এডিটর-ইন-চিফ তানভীর আহমেদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার সঞ্জয় কুমার রায়, যিনি সেন্টার ফর গ্লোবাল পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের সহ-প্রতিষ্ঠাতা।
তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে এমপি বব ব্ল্যাকম্যানের বক্তব্য।
তিনি যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ব্রিটেনের ভূমিকা এবং স্বাধীনতার পর কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনার কথা উল্লেখ করেন।
এরপর তিনি বর্তমান বাস্তবতায় এসে বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এমন দিকে যাচ্ছে, যা আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
জুলাইয়ের দাঙ্গা চলাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী হত্যার অভিযোগ আন্তর্জাতিক মনোযোগ কেড়েছিল বলে উল্লেখ করে ব্ল্যাকম্যান বলেন, সরকার পরিবর্তনের পরের ঘটনাপ্রবাহ আরও উদ্বেগজনক।
তার মতে, রাজনৈতিক দল ও নেতাদের বাদ দেওয়া, অনুপস্থিতিতে বিচার পরিচালনা এবং বিরোধী কণ্ঠের ওপর চাপ প্রয়োগ গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতাকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দিচ্ছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচন কেবল আয়োজন করলেই গণতান্ত্রিক হয় না; নির্বাচন তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন সেখানে সবাই অবাধভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। তার উদ্ধৃতি অনুযায়ী, “যদি রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দেওয়া হয়, তাহলে গণতন্ত্র নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।”
ব্ল্যাকম্যান আরও বলেন, জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে—বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাগরিক এমন রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করেন, যারা বর্তমানে স্বাধীনভাবে রাজনীতি বা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। বড় রাজনৈতিক শক্তিগুলো যদি নিষিদ্ধ, বর্জিত বা কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তাহলে সেই নির্বাচন আর প্রকৃত গণতন্ত্রের প্রতিফলন হয় না; বরং তা নিয়ন্ত্রিত সম্মতির রূপ নেয়।
ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি সম্ভাব্য একটি গণভোটের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন, যা দেশের সাংবিধানিক কাঠামো পরিবর্তনের দিকে যেতে পারে বলে আলোচনা চলছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ভোটারদের ওপর ভয়ভীতি বা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো সাংবিধানিক দিকনির্দেশনা চাপিয়ে দেওয়া হলে তা গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থী হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশকে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেবে।
মানবাধিকার প্রসঙ্গে ব্ল্যাকম্যান বলেন, বাংলাদেশে হিন্দু, খ্রিস্টান ও সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। হত্যা, অগ্নিসংযোগ, বাড়িঘর ও উপাসনালয় ধ্বংসের যেসব ঘটনা সামনে এসেছে, সেগুলো কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব নয়, বরং বাস্তব ও নথিভুক্ত ঘটনার ভিত্তিতে উঠে এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিজ নিজ সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করার আহ্বান জানান এবং যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের (এফসিডিও) আরও সক্রিয় নজরদারির দাবি তোলেন। একই সঙ্গে সংসদীয় দায়িত্বের কারণে অনুষ্ঠানের পরপরই বিদায় নেওয়ার আগে তিনি জানান, এসব বিষয় তিনি ব্রিটিশ সংসদে উত্থাপন করবেন।
সেমিনারের আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী; ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ওয়েলসের উপাচার্য ওসামা খান; গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্সের সভাপতি অধ্যাপক ড. হাবিব-ই-মিল্লাত; সাবেক বাংলাদেশি কূটনীতিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা আমিনুল হক পলাশ; মানবাধিকার আইনজীবী ব্যারিস্টার মইনুল ইসলাম মঞ্জু ও ব্যারিস্টার মাইকেল মারফি; এবং লেখক ও ডেটা বিশেষজ্ঞ আমিনা তাবাসসুম।
এছাড়া অংশ নেন বাংলাদেশ সেন্টার লন্ডনের সদস্য ও রাজনৈতিক কর্মী জাকারিয়া মাহমুদ; অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিফিল শিক্ষার্থী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক নাদিরা নাজনীন রাখি; বাংলাদেশ ক্যাটারার্স অ্যাসোসিয়েশন (ইউকে)-এর সেক্রেটারি জেনারেল মিতু চৌধুরী; ব্রিটিশ বাংলাদেশি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি বশির আহমেদ বিএইএমসহ বিভিন্ন কমিউনিটি নেতা, শিক্ষাবিদ, স্বাস্থ্যখাতের পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
লন্ডন থেকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের প্রতি যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা ছিল দ্ব্যর্থহীন। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সীমাবদ্ধ রেখে কেবল আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক বৈধতা অর্জন সম্ভব নয়। অন্তর্ভুক্তিকে যদি ঐচ্ছিক হিসেবে দেখা হয়, তবে বিশ্বাসযোগ্যতা অনিবার্যভাবেই ভেঙে পড়বে।
আর সেই বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট শুধু ওয়েস্টমিনস্টারের সভাকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—তার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের রাজপথে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে এবং দেশের অনিশ্চিত রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর।
