চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কড়া হুশিয়ারি উপেক্ষা করে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শনিবার সকাল থেকে কর্মবিরতিতে নেমেছেন বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীরা। এতে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ পরিচালনাকারী এই সমুদ্রবন্দর।
আজ শনিবার সকাল ৮টা থেকে বন্দর জেটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানো–নামানোর কাজে যোগ দেননি বন্দর কর্মচারী ও বেসরকারি শ্রমিকরা।
ফলে জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো–নামানোর কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন শনিবার ও রবিবার বন্দর শাটডাউন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে। এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ঘিরে শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে।
ধর্মঘট পালনের পাশাপাশি বেলা ১১টার দিকে বন্দরে বড় ধরনের বিক্ষোভ মিছিল করেন শ্রমিক-কর্মচারীরা।মিছিলটি বন্দর এলাকার ভেতর থেকে শুরু হয়ে নিমতলা হয়ে ৩ নম্বর গেট পর্যন্ত যায়। পরে সেখান থেকে ফিরে এসে ৪ নম্বর গেটে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন এবং সংক্ষিপ্ত সমাবেশে অংশ নেন।
সমাবেশে শ্রমিক নেতারা বলেন, নিউমুরিং টার্মিনালটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। তা সত্ত্বেও এটি কেন বেসরকারি অপারেটরের কাছে ইজারা দেওয়া হচ্ছে—তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারা। এই চুক্তি প্রক্রিয়াকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে তারা হুঁশিয়ারি দেন যে, কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে না দাঁড়ালে ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
আন্দোলনের অংশ হিসেবে আজ সকাল ৮টা থেকে শুরু হওয়া এই কর্মবিরতি চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ থাকায় বন্দরের সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম থমকে গেছে। এর ফলে দূর-দূরান্ত থেকে পণ্য খালাসের জন্য আসা শত শত ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান বন্দরে আটকা পড়েছে।
সকাল থেকে বন্দরের বিভিন্ন প্রবেশপথে পণ্য ডেলিভারি নিতে আসা শতশত ট্রাক সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেও প্রায় সব ধরনের পণ্য খালাস কার্যক্রম বন্ধ থাকায় কোনো গাড়িকেই ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ফলে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংসহ সব অপারেশন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
বন্দর অচল থাকায় বিপাকে পড়েছেন আমদানিকারক এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা। সময়মতো পণ্য খালাস ও সরবরাহ করতে না পারায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা।
বন্দর এলাকায় যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বন্দরের প্রতিটি গেট এবং প্রশাসনিক ভবনের সামনে কড়া নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে আন্দোলনে অংশ নিলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দিয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন, সভা–মিছিল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়া সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালার পরিপন্থী এবং তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, বৃহস্পতিবার অফিস চলাকালে এনসিটি সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের প্রতিবাদে কিছু কর্মচারী বন্দর ভবন চত্বরে মিছিল করেন এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী বলেও উল্লেখ করা হয়।
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারির পরও পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে শনিবার শ্রমিকরা কাজে যোগ দেননি। পাশাপাশি এনসিটি ইজারা ও হাইকোর্টের রায়ের প্রতিবাদে বন্দরের কারশেড ও আশপাশের এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন শ্রমিকরা।
সমাবেশে শ্রমিক নেতারা এনসিটি বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে জাতীয় স্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়ে তা অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানান। তারা বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দর ব্যবস্থাপনায় বিদেশি নিয়ন্ত্রণ গ্রহণযোগ্য নয়।
বন্দর শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ নুরুল্লাহ আহার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘শনিবার সকাল থেকে শ্রমিক-কর্মচারীরা কাজে যোগ দেননি। বন্দরের সব ইকুইপমেন্ট বন্ধ থাকায় কন্টেইনার হ্যান্ডলিং অপারেশন সম্পূর্ণভাবে থেমে আছে।’
তিনি জানান, শ্রমিকরা বন্দরের বিভিন্ন ফটকে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন।
আরেক শ্রমিক নেতা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘ধর্মঘট শতভাগ সফল। শ্রমিকরা কর্তৃপক্ষের অন্যায্য সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে।’
তিনি আরও জানান, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আগামীকাল রবিবারও কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুকের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন জানিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
পরিস্থিতি নিয়ে বন্দর এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে দ্রুত সমঝোতা না হলে বন্দরের কার্যক্রম দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
