ওসমান হাবিব
৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। গোটা সুনামগঞ্জের মানুষ এদিন যখন হানাদার মুক্ত হওয়ার আনন্দে উদ্বেল, যুদ্ধে বিজয়ের আনন্দে উচ্ছ্বাসিত, ঠিক তখনই সুনামগঞ্জ শহর থেকে ৫৪ কিলোমিটার দূরের হাওর অঞ্চলের দিরাই উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম ‘পেরুয়া’য় চলছিল এক নৃশংস গণহত্যা।
.
স্থানীয় রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা মুকিত মনির ও তার ভাই জোবায়ের মনির ও আব্দুল খালেকের নেতৃত্বে এই গণহত্যাটি চলেছিল একটি সুনির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মানুষের উপর। তারা হলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী।
.
সেদিন সকাল থেকেই রাজাকারেরা বিভিন্ন গ্রাম থেকে হিন্দুদের ধরে এনে পেরুয়া গ্রামের পার্শ্ববর্তী সুরমা নদীর পাড়ে জড়ো করেছিল রাজাকারেরা। এরপর প্রথমে তারা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জোরপূর্বক ধর্মান্তর করে ।
.
কিন্তু ধর্মান্তরিত হয়েও তাঁদের মুক্তি মিলেনি। মুকিত মনিররা হয়তো ভেবেছিল যুদ্ধ শেষ হলে তারা আবার তাঁদের ধর্মে ফিরে যাবে। আর তাই সুরমা নদীর পাড়ে হাঁটু জড়ো করে তাদের ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। এরপর লাশ ভাসিয়ে দিয়েছিল সুরমা নদীতে। নদীর স্রোতের টানে কোথায় তাদের লাশ চলে গেল কেউ জানেনা।
.
এই গণহত্যাকারী মুকিত মুনীরের ছেলেকে চিনেন তো? তার নাম শিশির মনির। জামায়াতে ইসলামীর সুনামগঞ্জ-২ আসনের প্রার্থী ছিল সে এবার। ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি এই শিশির মনির যে কি ভয়ঙ্কর তার বিগত কর্মকাণ্ডেই বোঝা যায়।
.
সাবেক এই শিবির নেতা এবারের নির্বাচনে একদিকে জামায়াতের প্রার্থী ছিল ঠিক তেমনই অন্যদিকে আবরার ফাহাদের হত্যাকারীদের আইনজীবীও ছিল। কি করেনি এই লোক।
.
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এদেশের আইনাঙ্গনের অন্যতম মাফিয়া হয়ে উঠেছিলো সে। তার কথার বাইরে যেন গোটা আদালত থমকে যেত। বিচারক বদলি থেকে এমন কোন কাজ নেই যা সে করেনি। মামলা বাণিজ্য থেকে, বিরোধীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে বাড়িছাড়া করা।
.
অন্যদিকে বলে রাখি, মুক্তিযুদ্ধে তার বাবা যুদ্ধাপরাধী মুকিত মনির ও চাচা জোবায়ের মনির ও আব্দুল খালেকের অপরাধের ফিরিস্তি কেবল পেরুয়া গণহত্যাই নয়। যুদ্ধের সময় তারা ৩০০ জন রাজাকারকে নিয়ে গড়ে তুলেছিলো এক রাজাকার বাহিনী।
.
সুনামগঞ্জের দিরাই ও শাল্লায় বেশীরভাগ গণহত্যা, লুটপাট, ধর্ষণ এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরের মতো পৈশাচিকতায় জড়িত ছিল এই বাহিনীটি। ধর্ষণের শিকার তেমনই দুজন বীরাঙ্গনা ছিলেন জমিলা খাতুন ও সাক্ষী কুলসুম বেগম। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁরা তাঁদের উপর চলা পৈশাচিক নির্যাতন ও বর্বরতার বিবরণ দিয়েছিলেন। সেটা পড়তে পারেন।
.
স্বাধীনতার পর মামলা হলেও কয়েক বছরের ব্যবধানে ছাড়া পেয়ে যায় মুকিত মনির, জোবায়ের মনির ও আব্দুল খালেক। শেষমেশ ২০১৮ সালে পেরুয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা রজনী দাস তাদের বিরুদ্ধে মামলা করলে পুলিশ জোবায়ের মনির সহ মোট ৬ জনকে গ্রেপ্তার করে।
.
অভিযোগ দায়েরের পরই আমেরিকায় পালিয়ে যায় মুকিত মনির। একপর্যায়ে অসুস্থতার কারণে জোবায়ের মনিরকে শর্তসাপেক্ষে জামিন দিয়েছিলো আদালত। জামিন পেয়েই সে এলাকায় গিয়ে প্রথমেই সাক্ষীদের এলাকা ছাড়া করে।
.
আর হাসিনার পতনের পর তো শিশির মনির হয়ে উঠেছিলো দিরাই ও শাল্লার যম। তার বাবার বিরুদ্ধে দেয়া সাক্ষীদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছিলো মব। শিবিরের ছেলেরা তাদের বাড়িঘরে হামলাও চালিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের কি পরিমাণ যে হয়রানি করেছিল তারা তা অবর্ণনীয়। গণহত্যার শিকার পরিবারের সদস্যরা পালিয়ে বেড়াচ্ছিলো। গত বছর পেরুয়া ও শ্যামারচর গণহত্যার উপর কাজ করবো ভেবেছিলাম। শহীদ পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে দেখি কেউই মুখ খুলতে রাজি নয়।
.
তারা বলেছিলেন, দেখেন ভাই এখন সম্ভব না। শিশির মনিরের লোকজন তুলে নিয়ে স্রেফ মেরে ফেলবে। আস্ত রাখবে না। বলেছিলাম নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দিবো, তাও বলতে পারেন। কিন্তু তাদের এক কথা। সবাই তাদের মার্কে রয়েছে। ঠিকই বুঝে নিবে কে তার বাবার বিরুদ্ধে বলবে।
.
তবে সবকিছুরই ইতি আছে। এই আসনটিতে শিশির মনির গতকাল হারলো। জিতলেন মুক্তিযোদ্ধা প্রবীণ বিএনপি নেতা মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন চৌধুরী। এবার অন্তত এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধাপরাধীর সন্তানের দাপট কমবে।
শহীদ পরিবারগুলোর ঘরে একটু হলেও প্রশান্তির বাতাস বইবে।
