অনিন্দ্য জয়
“ইসলামী সংস্কৃতি”, “হিন্দু সংস্কৃতি”, “খ্রিষ্টান সংস্কৃতি”, “বৌদ্ধ সংস্কৃতি” বলে আলাদা কোনো স্বতন্ত্র সংস্কৃতি বাস্তবে নেই। যা বাস্তব ও ঐতিহাসিকভাবে বিদ্যমান, তা হলো– আরবীয় সংস্কৃতি, পারসিক সংস্কৃতি, ভারতীয় সংস্কৃতি, চীনা সংস্কৃতি, ইউরোপীয় সংস্কৃতি, বাঙালি সংস্কৃতি– যেগুলো ভৌগোলিক, ভাষাগত ও জাতিগত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে।
ধর্ম হলো ব্যক্তিগত জীবন ও আচরণের বিধি-নিষেধ। ব্যক্তি কীভাবে স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করবে, কীভাবে ব্যক্তিগত জীবন পরিচালনা করবে– এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয় ধর্ম। কিন্তু ধর্ম নিজে কোনো জাতির খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, ভাষা, সংগীত, লোকাচার বা উৎসব তৈরি করে না।
আজ “ইসলামী সংস্কৃতি” প্রচলনের নামে যেটা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, সেটা আরবীয় সংস্কৃতি– পোশাক, নামকরণ, সামাজিক রীতি, এমনকি শোক-উৎসবের ভঙ্গি পর্যন্ত। অথচ ইসলাম নিজেই বিভিন্ন ভূখণ্ডে গিয়ে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করেছে। ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, ইরান, সেনেগাল বা বাংলাদেশ– সবখানে ইসলাম আছে, কিন্তু সংস্কৃতি এক নয়। কারণ সংস্কৃতি ধর্ম দিয়ে নয়; মাটি, মানুষ ও ইতিহাস দিয়ে গড়ে ওঠে।
একইভাবে “হিন্দু সংস্কৃতি” বললেও বাস্তবে তা মূলত ভারতীয় উপমহাদেশীয় সংস্কৃতি। দুর্গাপূজা, বসন্ত উৎসব, লোকসংগীত, আঞ্চলিক নৃত্য কিংবা সামাজিক রীতিনীতি– এসব আচার-অনুষ্ঠানে ধর্মীয় উপাদান রয়েছে, কিন্তু এগুলোর প্রকাশভঙ্গি অঞ্চলভেদে ভিন্ন। পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, ওড়িশা, তামিলনাড়ু বা নেপালে একই ধর্ম অনুসরণ করলেও উৎসব, পোশাক, ভাষা ও সামাজিক আচরণ এক নয়। কারণ এসব পার্থক্য তৈরি করেছে স্থানীয় সংস্কৃতি, ধর্ম নয়।
বাঙালি সংস্কৃতি ও ভারতীয় সংস্কৃতির সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ। ঐতিহাসিকভাবে বাংলা অঞ্চল বহু শতাব্দী ধরে বৃহত্তর ভারতীয় উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরের অংশ ছিলো। সংস্কৃত ভাষা থেকে বাংলার বিকাশ– এটাও ভারতীয় সভ্যতার ধারার অংশ। এছাড়াও বাঙালি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে হাজার বছরের নদী, কৃষি, ভাষা, লোককথা, বৈষ্ণব-সুফি ভাবধারা, বৌদ্ধ-হিন্দু-মুসলমানের সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে। লালন, হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম– এরা কেউ “আরবীয় সংস্কৃতি” চর্চা করেননি, আবার ধর্মবিমুখও ছিলেন না। তারা ছিলেন মাটির মানুষ, মাটির ধর্মচিন্তার প্রতিনিধি। লালন শাহ’র দর্শন ভারতীয় মূলধারার হিন্দু সংস্কৃতির সরাসরি ধারাবাহিকতা নয়, এটা গ্রামীণ বাংলা ও সুফি-ভক্তি মিশ্র এক অনন্য ধারা। আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতীয় রেনেসাঁর অংশ হলেও তাঁর সৃষ্টিশীলতা গভীরভাবে বাংলা অভিজ্ঞতায় প্রোথিত।
সংস্কৃতি কখনোই ফরমান দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সামাজিক ভয় বা ধর্মীয় দোহাই দিয়ে যা চাপানো হয়, তা সংস্কৃতি নয়– তা হলো সাংস্কৃতিক দখলদারিত্ব। ইতিহাসে দেখা গেছে– জোর করে চাপানো সংস্কৃতি টেকে না; বরং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জীবনাচরণই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।
ধর্ম কে মানবে, কে মানবে না– এটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু নিজের মাটি, ভাষা, ইতিহাস আর লোকজ জীবনবোধ অস্বীকার করে নয়। ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গা, আর সংস্কৃতি একটি জাতির সমষ্টিগত আত্মপরিচয়। একটাকে টিকিয়ে রাখতে গিয়ে আরেকটাকে ধ্বংস করা কোনো সভ্য সমাজের কাজ হতে পারে না। সংস্কৃতি গড়ে ওঠে ভালোবাসা থেকে, ভয় থেকে নয়।
