আফজাল হোসেন
০১
অনেক বছর আগে টেলিভিশনের এক আলোচনা অনুষ্ঠানে গনতন্ত্র নিয়ে কথা হচ্ছিল। দর্শকেরা এইসব আলোচনা খানিকটা শোনে, অনেকটাই শোনে না।
যে আলোচক দরকারি, ভালো কথা বলতে পারেন, তাঁর কথা কানে যায় এবং কান সে কথাকে মূল্যবান কথা ভেবে মনে চালান করে দেয়। যে কথা মনে একবার ঢুকে গেঁথে যায়, তা কেউ ভোলে না।
মনে আছে, তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, গনতন্ত্র হচ্ছে একজোড়া জুতা। দেখতে সুন্দর, চকচকে ঝকঝকে হোক, তা পেয়ে লাভ নেই। দেখতে হবে সেটা পায়ে পরে আরাম মেলে কি না। পায়ের সঙ্গে জুতার মাপ মিলতে হবে।
আমাদের পা বিভিন্ন মাপের। ছোট পায়ে বড় জুতা কিংবা বড় পায়ে ছোট মাপের জুতা পরে হাঁটা আরামের হয় না। গনতন্ত্র সখ করে চাওয়ার বিষয় নয়। তা বুঝতে হবে, তার উপযুক্ত হয়ে ওঠা জরুরী।
গল্পচ্ছলে তিনি সেদিন সংকট বোঝাতে চেয়েছিলেন উদাহরণ দিয়ে। আমাদের পা অনেক মাপের কিন্তু গনতন্ত্রের মাপ একটাই।
এই গল্পটাকে কি পুরানো বলা যাবে?
০২
কিছু পুরাতন রীতি আছে, পুরাতন কিন্তু সেটাকে নতুন বানানোর চেষ্টা করে না কেউ। পুরাতনেই সন্তুষ্ট থাকে। স্কুলে পড়ার কালে আমরা চাঁদ তারার ছবিঅলা পতাকা তুলে রোজ “পাক সার জমিন” গাইতাম। নিজের দেশ, পতাকা পাওয়ার পর থেকে “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি” গাই।
যখন কোথাও জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় মানুষ উঠে দাঁড়ায়। দেশের বাইরে গিয়ে সিনেমা হলে সে দেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হলেও দর্শকেরা দাঁড়িয়ে পড়ে। কেনো দাঁড়ায়? মানুষ মনে করে কোনো দেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজানো বা গাওয়া হলে উঠে দাঁড়ানো মানে, সে দেশটার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা।
সম্মান প্রদর্শনের এই পুরাতন রীতি পালন করতে ভালো লাগলো না একদল মানুষের। তাঁরা দেশেরই গন্যমান্য মানুষ। সদ্য শুরু হওয়া জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনে জাতি এমন দৃশ্য দেখেছে। সে দৃশ্য এতটাই অবিশ্বাস্য, বহু মানুষ চোখ কচলেছে। মনে করেছে, ভুল দেখছে। যারা উঠে দাঁড়াননি, তাঁদেরকে জনগন ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে সংসদে পাঠিয়েছে।
এই কৃতিগন সংসদে এবং বাইরে জনগনের সামনে দেশপ্রেম নিয়ে মূল্যবান কথা বলে যাবেন এবং জনগনের বাহবাও পাবেন। এমন দেশপ্রেম আরামের হয় না, দেশও আরামবোধ করে না।
০৩
দেশপ্রেমও উপরের গল্পের জুতার মতো। এক সাইজেরই হয়, মানুষের মনের মাপ হয় বিবিধ রকমের।
০৪
আজ সকালে জানলাম ঢাকা থেকে সামান্য দূরে নরসিংদীতে একটা গ্রাম আছে। একেবারেই গ্রাম কিন্তু সে গ্রামটায় বিদেশীরা বাংলাদেশী মানুষের জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা নিতে বেড়াতে আসে। একজন লুঙ্গি পরা সাধারণ মানুষ বেড়াতে আসা বিদেশী পর্যটকদের গাইড হন। তাঁর উদ্যোগেই সে গ্রামটা পর্যটনের, আনন্দ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের বিশেষ স্থান হয়ে উঠেছে।
কয়েকদিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মারফত আর এক ভদ্রলোকের কথা জানলাম। তিনি অনেক বেতনের চাকরি ছেড়ে দিয়ে শহর থেকে গ্রামে গিয়ে থিতু হয়েছেন।
এখন তিনি সেখানে চাষবাস করেন, সাধারণের জীবনযাপন করেন, খালি পায়ে হাঁটেন। তাঁকে বলতে শুনি, পৃথিবীতে কোনো প্রাণীই পায়ে জুতা পরে না, একমাত্র মানুষ ছাড়া। জুতা মাটি, প্রকৃতি থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে।
নিজের হাতে আনন্দে সবকাজ করেন তিনি এবং কেউ যদি গ্রামে গিয়ে কয়েকদিন থেকে একজন কৃষকের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা পেতে চান, তার ব্যবস্থাও তিনি সেখানে করে রেখেছেন।
সে সুযোগ থাকার কারণে বহু শহুরে মানুষ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে সে গ্রামে বেড়াতে যায় এবং জীবন বুঝতে পয়সার বিনিময়ে নানারকম কৃষিকাজে শ্রম দিয়ে থাকে।
০৫
আমরা কি ভেবে দেখি, কেনো মানুষ এইসব করে! কেনো নরসিংদীর সেই গ্রামের লুঙ্গি পরা মানুষটা বিদেশীদের আঁখ কি চেনাচ্ছে, ধানের চারা তুলে আবার কিভাবে রোপন করতে হয় দেখাচ্ছে, মাটির চুলা চেনানো হচ্ছে, বাঙালিদের রান্নার পদ্ধতি বোঝানো হচ্ছে। কেনো?
একজন অতি সাধারণ মানুষ বিদেশীদের সামনে নিজের দেশের যা আছে, সবই গৌরবের, বিস্ময়ের বলে বিশ্বাস করে। সে বিশ্বাসেই অদেখা মানুষদের সামনে আপন গৌরব উপস্থাপন করে তাঁদের চোখে বিস্ময় দেখে আনন্দিত, সুখীবোধ করে।
আর একজন মানুষ মাটির গন্ধ ভালোবেসে সকল আরাম ত্যাগ করে গ্রামে গিয়ে বাস করছে। সে আনন্দ যেনো শুধু নিজের হয়ে না থাকে, যেনো ছড়িয়ে পড়তে পারে তাও ভেবেছেন তিনি। তাঁর সে উদ্যোগের কারণেই শহরের মানুষ গ্রামে গিয়ে আর এক জীবনের স্বাদ গ্রহন করতে পারছে।
সবই প্রেম, সচেতনতা, দায়িত্ববোধ থেকে আসে।
০৬
মানুষ উদাহরণ সৃষ্টি করেই পরিচয় দেয়, কেমন মানুষ সে। ভালো উদাহরণে হয় ভালো আর মন্দ উদাহরণে হয় মন্দ মানুষ।
লেখক: অভিনেতা ও লেখক।
