ষোলো দিনে দুই হাজার টাকার বিক্রি। আনন্দলোক প্রকাশনীর এই সংখ্যাটা মাথায় রাখুন। চিলেকোঠায় পুরো একটা দিন একটাও বই বিক্রি হয়নি। বায়ান্ন প্রকাশনীর বিক্রি গত বছরের ছয় ভাগের এক ভাগেও পৌঁছায়নি। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটা একটা সিস্টেমেটিক ধ্বংসের ছবি। এবং যারা মনে করছেন এটা নিছক রোজার কারণে বা সময়সূচির গড়মিলে হয়েছে, তারা হয় ভুল বুঝছেন, নয়তো বুঝেও না বোঝার ভান করছেন।
একুশের বইমেলা বাংলাদেশে কী, সেটা একটু মাথায় রাখা দরকার। এটা শুধু বই কেনাবেচার জায়গা না। ১৯৫২ সালে যারা রাষ্ট্রভাষার দাবিতে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন, তাদের স্মরণে দাঁড়িয়ে আছে এই উৎসব। সেই আন্দোলনের মূলে ছিল একটাই কথা, বাঙালির ভাষা, বাঙালির সংস্কৃতি, বাঙালির পরিচয়কে কেউ মুছে দিতে পারবে না। সেই ইতিহাসের সঙ্গে যারা কখনো সম্পর্ক রাখেনি, বরং যারা একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হয়ে এই ভূমির মানুষ মেরেছে, তারাই আজ এই দেশের সংস্কৃতির ভাগ্য নির্ধারণ করছে। জামায়াতে ইসলামীর কথা বলছি। এবং তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা বিএনপির কথাও বলছি।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে, ব্যাপক বয়কটের মধ্যে, যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তাদের প্রথম কাজগুলোর একটা হলো রোজার মাঝে বইমেলা ঠেলে দেওয়া। প্রকাশকরা আপত্তি জানিয়েছিলেন, পাঠকশূন্যতার শঙ্কার কথা বলেছিলেন। সরকার শুনেছে, স্টল ভাড়া মওকুফ করেছে, তারপর মেলা চালিয়ে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে শুধু প্রশাসনিক অদক্ষতা বললে আসলে এর রাজনৈতিক মাত্রাটা হারিয়ে যায়।
বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সেক্যুলার বাঙালি সংস্কৃতির দ্বন্দ্বটা নতুন নয়। জামায়াত সবসময়ই একুশের চেতনাকে তাদের রাজনৈতিক প্রকল্পের বিপরীতে দেখেছে। বইমেলাকে, পহেলা বৈশাখকে, রবীন্দ্রনাথকে এরা কোনোদিন আপন করেনি, কারণ এগুলো তাদের রাজনৈতিক ইসলামের বয়ানে ফিট করে না। বিএনপি ক্ষমতায় এলে জামায়াত সবসময় সুবিধার জায়গায় থাকে। এটা শুধু জোটের রাজনীতি না, এটা একটা সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের লড়াই।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে মৌলবাদী তৎপরতা যেভাবে বেড়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হেফাজতের প্রভাব, পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তনের দাবি, সংস্কৃতিচর্চায় বাধা, সেই প্রেক্ষাপটে রোজার মধ্যে বইমেলা চালানোর সিদ্ধান্তটাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে চলে না। প্রকাশকরা নিজেরাই বলছেন, আগামী বছর রোজা শুরু হবে ৮ ফেব্রুয়ারি। তখন পুরো ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে রোজা। একুশে বইমেলা কি তখন আদৌ হবে? হলে কী অবস্থায় হবে? সেই প্রশ্নের জবাব এখনই দেওয়া না গেলেও, যে রাজনৈতিক শক্তি এখন ক্ষমতায়, তাদের দিকে তাকালে উত্তরটা খুব আশাব্যঞ্জক মনে হয় না।
ছোট প্রকাশনীগুলোর কথা ভাবুন। এরা সারা বছর অপেক্ষা করে বইমেলার জন্য। তাজিন আহমেদ তামান্না বলছেন, স্টলের ডেকোরেশনের খরচ উঠবে কিনা সেটাই এখন প্রশ্ন। এই মানুষগুলো বাংলাদেশের প্রকাশনা সংস্কৃতির মেরুদণ্ড। এদের যদি মেলায় বসে অপেক্ষা করতে হয় আর একটা পাঠকের মুখ দেখার জন্য, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যে এই ছোট প্রকাশনীগুলো টিকবে না। আর ছোট প্রকাশনীগুলো না থাকলে নতুন লেখকদের প্রথম বই বেরোবে কোথা থেকে? সাহিত্যের ভবিষ্যৎ তৈরি হয় এই জায়গা থেকেই।
একটা রাষ্ট্র তার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে কতটা গুরুত্ব দেয়, সেটা বোঝা যায় সে রাষ্ট্র কারা চালাচ্ছে তা দেখলে। যে রাজনৈতিক জোট একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, যারা ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকারকে কখনো নিজেদের বলে স্বীকার করেনি, তাদের হাতে একুশের বইমেলার ভবিষ্যৎ নিরাপদ, এটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। বরং যা ঘটছে, সেটা দেখে মনে হচ্ছে এই বিপর্যয় পরিকল্পিত না হলেও, এতে কারো বিশেষ আপত্তিও নেই।( আওয়ামী লীগ পেইজ)
