আসাদুজ্জামান আসাদ
বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক দল তাদের ভুল স্বীকার করে না।অথচ রাজনৈতিক দল – মানুষের সংগঠন। ভুল ছাড়া তো মানুষ, হতে পারে না। তবে তো সে দেবতা হয়ে যায়
যাইহোক– বাকশাল নিয়ে অনেক প্রপাগাণ্ডা।
দেখি বাকশাল কী ছিল? কেনইবা বাকশাল গঠন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু? সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে আমরা কতটুকুই বা জানি? বাকশাল কি বিতর্কিত ছিল? নাকি বিতর্ক তৈরি করার জন্য বাকশাল কে ব্যবহার করা হয়েছে।”
বাকশাল প্রনয়নের প্রেক্ষাপটে
” যারা দালালি করেছে, যারা আমার লোকদের ঘরে ঢুকে হত্যা করেছে,তাদের বিচার হবে শাস্তি হবে।”
১০ জানুয়ারি ১৯৭২ : রেসকোর্স ময়দকন( বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)
স্বাধীন বাংলাদেশ ( পৃষ্ঠা ২৭, ২৮,২৯,৩০, )
স্বাধীন বাংলাদেশ কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে
স্বদেশে ফিরে এলেন বঙ্গবন্ধু। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ তখন মানুষের সংগ্রাম আর পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে এনে দিয়েছে এক নতুন যতিবিন্যাস –যা সাতকোটি মানুষের শোণিতরেখা, অশ্রুকাব্য আর অবিনশ্বর বিজয়চিহ্নে সমুদিত। একদিকে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র বিজয়ী উদ্বেল স্বাধীন জনতা, অন্যদিকে পাকিস্তানের বর্বর সেনাবাহিনীর ধ্বংস করে দেয়া রাষ্ট্রকাঠামো। অর্থ,শস্য, খাদ্য, কলকারখানা, মানুষের বসতবাড়ি, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো — এমনকি সরকারী দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রগুলো আত্মসমর্পণের আগে সমূলে ধ্বংস করে গেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। যুদ্ধোত্তর এমন একটি বিপর্যয় বাংলাদেশের পুনর্গঠনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন বাঙালির জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অনেক রক্তের দাগ মিশে আছে বাংলার মাটিতে, স্বজন হারানো উদভ্রান্ত মানুষ খুঁজে ফিরছে প্রিয়জনের লাশ।
১৯৭১ সালের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধ বাংলার মানুষের ঐতিহাসিক বিজয় এক সুমহান আত্মত্যাগের স্মারক । কেবল নয় মাসের একটি সশস্ত্র যুদ্ধ হিসাবে দেখলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ অবয়বটি কখনো ফুটে উঠবে না — কেননা এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাংলার মানুষের নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস, সাংস্কৃতিক, বৈচিত্র ঐতিহ্যগত প্রতিরোধ সংগ্রামের ইতিহাস। একাত্তরের মুক্তি সংগ্রাম তাই একটি ‘জনযুদ্ধ’,স্বাধীন জাতি হিসেবে বাংলার মানুষের ‘জন্মযুদ্ধ’-দীর্ঘ ব্যাপ্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়। সম্মুখসমরের তত্ত্ব ও কৌশল ছাড়াও এ যুদ্ধে ভৌগলিক রাজনৈতিক, আর্থ সামাজিক সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক গতি প্রবাহ যেমন ছিল ;তেমন ছিল মনস্তাত্ত্বিক একটি দার্শনিক ভিত্তি ।
বস্তুত এ কারণে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ কথাটি বলতে আমরা একটি সামগ্রিক প্রেক্ষাপটকে বুঝি -যার উৎস আমাদের মুক্তি সংগ্রামের দর্শন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তাই আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সার্বিক জীবন কাঠামোর ভূমিকাপত্র।
পাকিস্তান হিংস্র সেনাবাহিনী বাংলার মানুষকে কেবল হত্যা ও বিভৎস নিপীড়ন করে ক্ষান্ত হয়নি,তারা বাঙালির নৃতত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বকি কাঠামোকে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল। এই জন্য দেশীয় যুদ্ধ অপরাধীদের সহযোগিতায় তারা বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করেছিল। নারীর প্রতি নিশংস নির্যাতনকে ব্যবহার করেছিল যুদ্ধের একটি কৌশল হিসেবে এবং এ ধারণা থেকে তারা যুদ্ধ শিশুর জন্ম দিয়েছিল।
এ কারণেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিষয়ে আমাদের উপলব্ধি যদি সার্বভৌম একটি ভূখণ্ড, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীতের মধ্যে আবর্তিত হয়, তবে স্বাধীনতার সম্পূর্ণ সংজ্ঞায়নটি কখনই সম্ভব নয়। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির পরিপূর্ণ অর্থ খুঁজতে হলে একটি স্বনির্ভর স্বদেশী অর্থনৈতিক কাঠামো মুক্তি সংগ্রামের, দর্শনের নিরিখে নির্মিত জনমানসের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের উদ্যোগ আদর্শিক -গণমুখী স্বভূমিজাত রাজনীতি তত্ত্ব ও রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যসূত্র নৃতাত্ত্বিক- সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং সামাজিক সমাজব্যবস্থামূলক জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার শুলুক সন্ধান জরুরি। এই জরুরী কাজটি করা হয় না বলেই স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ খুঁজতে গেলে আমরা খাবি খাই এবং প্রত্যাশ ও প্রাপ্তির সমীকরণ মেলাতে না পেরে প্রায়শই বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের সেই অনন্য ভাষণের একটি পঙতি উল্লেখ করে থাকি
‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ‘
এ অসামান্য পঙতি উচ্চারণের পর আমরা সরল বিশ্বাসে একটি রাজনৈতিক পূর্ণচ্ছেদ স্থাপিত হয়;কার্যত আমাদের অক্ষমতা গুলো এ মর্মে রায় ঘোষণা করে যে -স্বাধীনতা পেলেও আমাদের মুক্তি আজও অধরা। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যতগুলো শুভঙ্করের ফাঁকি আছে, আমার মতে, আমাদের এ সিদ্ধান্ত তার মধ্যে একটি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিক কাঠামো অনুসরণ করলে স্বাধীনতার শব্দটি খুব সহজেই সংজ্ঞায়ন করা যায়,কিন্তু বঙ্গবন্ধুর উচ্চারিত মুক্তি শব্দটি উচ্চারণের সংজ্ঞায়িত করতে আমাদের তারই ভাষণ -বিবৃতি -বক্তব্য- গ্রন্থ বা তার রাজনৈতিক পরিধির ব্যাস- ব্যাসার্ধের দ্বারস্থ হতে হবে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে কতগুলো প্রশ্ন অনিবার্যভাবে উত্থাপিত হওয়া প্রয়োজন। বাংলার মানুষকে আদৌ মুক্তি লাভ করেননি? নিদেন পক্ষে তারা মুক্তির দার অব্দিও পৌঁছাননি? আর্থ সামাজিক প্রশাসনিক সরকারকাঠাম রাজনৈতিক ব্যবস্থা জনগণের কাঙ্ক্ষিত মুক্তি কে একবারের জন্য আলোর মুখ দেখেনি? স্বাধীন বাংলাদেশের আমরা কি কখনোই সাংস্কৃতিক দিশা পাইনি? কিন্তু রাজনৈতিক তত্ত্বের দেশের রূপান্তরের আমরা কি চিরকাল জড়ভরত থেকে গেলাম?
নির্দিষ্ট মনে এই প্রশ্নের উত্তরগুলো খুঁজতে গেলে খানিকটা দোটানায় পড়তে হয় বৈকি! প্রশ্নের ডালিটাকে মনের কোনায় বাইরে রেখে ভাবতে বসলে আরো কতগুলো ভাষাহারা সংশয় যেন প্রকাশের সাধনায় একযোগে পাখা মেলে দেয়। তখন মনে হয় -সামাজিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক জীবনে মুক্তির বারতা আমাদের ঠিকই এসেছিল ; কিন্তু সদ্য স্বাধীন জনতার কাঙ্খিত মুক্তির পথ রচনার কাজটি শুরু হয়েছিল -কিন্তু আমরা নিজেরাই নস্যাৎ করেছি আমাদের জাতিগত মুদ্রাদোষে ; অথবা এমনও হতে পারে অভিধানের বাইরে মুক্তির ব্যবহারিক অর্থটি আসলে যে কী- আমরা তা বুঝতে পারিনি। আমাদের বিভ্রান্ত মগজ তাই মুক্তির নাচদোয়ার ছেড়ে দাসত্বের খিরক আগলে পড়ে থেকেছে বহুকাল।
তবে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুসন্ধান করে পাশাপাশি রাখলে একটি ধারনা পাওয়া যায় ; যাতে স্পষ্ট হয় -গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আমাদের কাঙ্ক্ষিত মুক্তির পথ থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গেছে। তার মানে কোন একদিন ছিল, নিশ্চয়ই ছিল -যেদিন ছিল যেদিন আমাদের অর্জিত স্বাধীনতা আর কাঙ্ক্ষিত মুক্তি পরস্পরের সামান্তরাল পথে হাঁটতে শুরু করেছিল।আদর্শহীনতার গোলকধাঁধায় আমাদের সেদিন ভেসে গেছে সে পথ থেকেও আজও আমরা বিচ্যুত –কেবল বিচ্যুতই হয়নি , দীর্ঘ সময় বেমালুম ভুল পথে চলে,বিভ্রান্তিকর আদর্শকে সম্বল করে আজ এতদূর পথ চলে এসেছি।
এখানে আমাদের সংবিধান আছে কিন্ত তাতে আদর্শের স্পষ্টোক্তি নেই,রাজনীতি আছে বটে, কিন্তু গণ- মানুষের তাতে কোন অংশ গ্রহণ নেই।আমাদের অর্থনীতিজুড়ে আত্মকরুনার প্রশ্রয়। মূঢ় শতাব্দবলীতে চাপা পড়ে গেছে বাংলার মানুষের মুক্তির ইশতেহার। মুক্তিসংগ্রাম প্রসুত দর্শনের অনেক কিছু আজ আমাদের বক্তৃতা বিবৃতিতে আছে ; কিন্তু জীবনবোধে বা রাজনৈতিক চর্চায় নেই। ক্ষমতার পৌরাণিক্ত ইতিবৃত্তে জর্জরিত আমাদের সামরিক বেসামরিক আমলাতন্ত্র। আর আমরা তথাকথিত শিক্ষিত শ্রেণি অতিকথার দিক বিস্তার ঘটিয়ে রাজনীতির নামে আকাশকুসুমচয়নে ব্যস্ত।
তাহলে প্রশ্ন জাগে সঠিক পথটি কি ছিল?
এটা স্পষ্ট সহজ উত্তর হলো — মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস – অনুসৃত একটি রাজনৈতিক ধারা আমাদের ছিল ; যাতে চট করেই হয়তো মুক্তি চলে আসতো না –যেমন আসেনা কোন কালেই পৃথিবীর কোন দেশে – মুক্তির লক্ষ্যে আমাদের যাত্রাপথটি হতো অব্যর্থ আর সুপরিকল্পিত। যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য -স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের অবকাঠামো নির্মান,ভূমি ব্যবস্থাপনা সরকার গঠন বা অর্থনৈতিক সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান যতটা সহজ ; স্বাধীনতার বীজমন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে গণ-মানুষের রাষ্ট্রের কল্যাণ নিয়োজিত করা তুলনামূলকভাবে ঠিক ততটাই কঠিন বলে আমি মনে করি। কারণ, দ্বিতীয় কাজটি সুসম্পন্ন করতে হলে একটি আদর্শিক পদ্ধতি প্রণয়ন জরুরি, যাকে কেন্দ্র করে প্রয়াসটি গড়ে উঠবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন পাঠ করলে বোঝা যায়, তিনি আমৃত্যু নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনের উপরে আস্থা রেখেছিলেন এবং জনতা ব্যতীত কোন রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার বিষয়ে তিনি কোন উৎসাহী ছিলেন না। তার দীর্ঘ- দার্ঢ্য- দ্ব্যর্থহীন রাজনৈতিক অভিযাত্রার জনগণ ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বলা ভালো -প্রধানতম অংশ। এ কারণেই পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি যখন স্বাধীন আর রক্তস্নাত স্বরদেশের মাটিতে পা রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু,তখন তিনি তার জনগণকে সঙ্গে নিয়েই যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের প্রত্যয়ে ব্যক্ত করেছিলেন।
আর এ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যেই পরবর্তী সময়ে প্রণীত বাকশালব্যবস্থার সার্বক প্রেক্ষাপট খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
