বাংলাদেশের রাজনীতি ব্যাখ্যা করতে গেলেই স্বাভাবিকভাবে দুইটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আলাপ আসে।এবং এই দুই দলের প্রধান দুই নেত্রীকে এক পাল্লায় ধরে নিয়ে আমাদের আলাপচারিতা এগোতে থাকে।
আমাদের এই পদ্ধতি আলাপের কি সঠিক?
আওয়ামী লীগের উৎপত্তি বাঙালী জাতীয়তাবাদকে ভিত্তি করে।ধর্মের ভিত্তিতে যে দ্বিজাতিতত্ত্বের উপর দাঁড়িয়ে ছিল এই ভারতীয় উপমহাদেশের বিভাজন,সেই দ্বিজাতিতত্ত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আওয়ামী লীগ নিয়ে আসে মাটির সাথে মিশে থাকা বয়ান-বাংলার হিন্দু,বাংলার বৌদ্ধ,বাংলার খ্রিশ্চান,বাংলার মুসলমান/আমরা সবাই বাঙালী।আর এই ন্যারেটিভের মূলে থাকে ভাষা।
অন্যদিকে ব্যারাকে জন্ম নেয়া একটা তথাকথিত রাজনৈতিক দল হচ্ছে বিএনপি-যাদের রাজনৈতিক বয়ান হচ্ছে আওয়ামী বিরোধীতা,বাঙালী জাতীয়তাবাদের জায়গায় বাংলাদেশী পরিচয় প্রতিস্থাপন ই যাদের মূল লক্ষ্য এবং যাদের নাড়ি পোঁতা পাকিস্তানের মিলিটারি শাসনের বুকে;একমাত্র বয়ান ভারতবিরোধীতা,সাথে রয়েছে প্যান ইসলামিক ভাবধারা।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারকে সরিয়ে অবৈধ দখলদার বাহিনী আসে মোটামুটি সবাই জানে।এই ৫ আগস্টের সাথে দেশীয় আর্মি,জঙ্গী,সিভিল সোসাইটি,পেশাজীবীসহ বিদেশী শক্তি যেমন পাকিস্তান,আমেরিকা,ইউরোপীয় ইউনিয়ন,তুরস্ক,কাতার,সৌদী আরব,চীন বিভিন্নভাবে জড়িত ছিল,এখনো আছে।এই যে সরকার সরানোর প্রক্রিয়া এটা কি একদিনে হঠাৎ করে ঘটেছে?
মোটেই না।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে ১৯৭১ সালে পাক-আমেরিকার যে পরাজয় মুক্তিযুদ্ধে তার প্রতিশোধ নেয় আমেরিকার মতো পরাশক্তি।যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই এ হত্যাকান্ড ঘটায় পাক-আমেরিকার যে ধারণা ছিল যে দেশের মানুষ বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রবর্তক বঙ্গবন্ধুকে ভুলে ধর্মের আফিম খেয়ে পাকিস্তানের মতো মোল্লা-মিলিটারি এলায়েন্সে চলবে,সেই স্বপ্ন পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হয় না।আর্মির শাসনের ভেতরও মানুষ অনবরত গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে থাকে।আর এ লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেয় কে?ঐ যে ১৯৭৫ সালে নিহত বঙ্গবন্ধু,তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা।
দেশী বিদেশী শক্তি প্রতিনিয়ত বাংলাদেশকে পরিণত করতে চেয়েছে একটা মডারেট মুসলিম কান্ট্রিতে।সেই পথে বাঁধা কে?এই যে বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রবর্তক বঙ্গবন্ধু ও তাঁর অনুসারীরা।
এ কারণেই আওয়ামী লীগকে মাইনাস করার জন্য ই এত আয়োজন।এই আয়োজনে কোন মাইনাস টু ফর্মুলা নেই,আছে শেখ পরিবারকে মাইনাস করার ফর্মুলা।
সেই আলামত আমরা বহুবার দেখেছি শেখ হাসিনার উপর প্রাণনাশী হামলার মাধ্যমে।বহু নেতাকর্মী বুলেট বোমার সামনে মানবঢাল হয়ে শেখ হাসিনাকে বাঁচিয়েছে বারবার।চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের ব্রাশফায়ার বলি,২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা বলি,ওয়ান ইলেভেনের সময় কারাগারে থাকা শেখ হাসিনার কথা বলি,আর বিডিআর বিদ্রোহের কথা বলি সব সময়ের চেষ্টা শুধু শেখ হাসিনাকে,শেখ পরিবারকে বাংলাদেশকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার।
২০২৪ সালেও সেই একই কায়দা।প্রতিবার শেখ হাসিনা চেয়েছেন রক্তক্ষয় এড়াতে-এ কারণে ঘনবসতির ঢাকা শহরে ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহের সময় (ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দুই মাস তখন,ওয়ান ইলেভেনের পরে) তিনি ট্যাংক নামিয়ে রক্ত ঝরাননি।ঐ কাজ করলে ৫৭ জন সেনা অফিসারের জায়গায় ৭ লাখ মানু্ষ মরতো,গৃহযুদ্ধ হতো,দেশ যেত জঙ্গীদের হাতে।তিনি ২০২৪শেও সেজন্যই রক্ত না ঝরিয়ে সরে গিয়েছেন।
বাংলাদেশের শেখ পরিবারের মতো হতভাগ্য রাজনৈতিক পরিবার সম্ভবত বিশ্বে কমই আছে।নিজের দেশের মানুষকে স্বাধীন করতে,তাদের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে এই পরিবার যা করেছে তার প্রতিদান দিয়েছে মানুষ অসম্মান করে,হত্যা করে।
☞✔কেন বাংলাদেশের শহুরে মধ্যবিত্ত মাইনাস আওয়ামী লীগ ফর্মুলায় বিশ্বাসী?
শহুরে এলিট শ্রেণী বাংলাদেশের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। তারা বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের যে ইতিহাস তা অস্বীকার করে কারণ তার পূর্বপুরুষ ছিল মুসলিম লীগ। বাঙালী জাতীয়তাবাদকে ধারণ করলে বাংলাদেশী মুসলমানের যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্যান আরবের অংশ হওয়া সেই চাহিদা থেকে যায় অপূর্ণ।
রূপান্তরিত মুসলমান হওয়ায় সে সারাক্ষণই হীনমন্যতায় ভোগে।তাই সে ভয়ানকভাবে মুসলমান হয়ে উঠতে চায়,সে মনে করে ইসলাম একটা সংস্কৃতি।এই যে দ্বন্দ্ব নিজের ভেতর তা থেকে সে বের হতে পারে না-সহীহ মুসলমান হতে গিয়ে সে তার ভাষাকে ঘেন্না করে,নিজের মানচিত্র-জাতীয় সঙ্গীত-মা সবকিছুর প্রতি সে বিতৃষ্ণা লালন করে।
এভাবে সে শেকড়চ্যুত হয় এবং এই যে শূন্যতা তার ভেতর তৈরী হয় সেই শূন্যতাকে সে ধর্ম দিয়ে পূরণ করতে গিয়ে আশ্রয় নেয় মুসলিম লীগের বিকল্প জামায়াত ইসলামীর কোলে।
বাঙালী মুসলমানের মন এক অদ্ভূত ঢেউহীন ডোবা যেখানে কোন হাওয়া বাতাস খেলা করে না।সে সেকুলারিজমকে মাপে নাস্তিকতার স্কেলে,সে বাংলাদেশের ইসলামকে জামায়াত ইসলামের সমান্তরালে চিন্তা করে। সে মদ গাঁজা খাবে,বেশ্যাগমন করবে কিন্তু দিনশেষে সে মুসলিম লীগ,তার চোখে বাঙালী জাতীয়তাবাদ সংস্কৃতি ভাষা পোশাক সব সবকিছু হিন্দুয়ানি।
সে চায় তার সীমানা বদলে ভারত দখল করে পাকিস্তানের সাথে একীভূত হয়ে যেতে।কারণ তার ভেতরে জন্ম জন্মান্তরের ট্রমাবন্ডিং-যে পাকিস্তান তাকে শাসন শোষণ অত্যাচার হ/ত্যা নির্যাতন ধ/র্ষণ সব করেছে একই ধর্মের হওয়াতে সে মনে করে সেই পাকিস্তানই তার আসল গন্তব্য।
