ইব্রাহিম চৌধুরী
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে বুধবার অনুষ্ঠিত মৌখিক শুনানিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার প্রচেষ্টাকে ঘিরে বিচারপতিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংশয় প্রকাশ পায়। আদালতের প্রশ্নোত্তর পর্বে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই গুরুত্বপূর্ণ অভিবাসন নীতির সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে বিচারপতিরা সন্তুষ্ট নন।
১ এপ্রিল বুধবার এই শুনানির বিশেষ দিক ছিল ট্রাম্পের নিজ উপস্থিতি। তিনি আদালতের গ্যালারিতে বসে নিজের প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির পক্ষে উপস্থাপিত যুক্তি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা, যেখানে কোনো দায়িত্বে থাকা প্রেসিডেন্ট নিজের নীতিকে ঘিরে সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে উপস্থিত থেকে বিচারপতিদের প্রশ্ন শুনেছেন।
শুনানির সময় ট্রাম্পকে সংযত ও নিরাবেগ দেখা যায়। তিনি চুপচাপ বসে আইনজীবীদের যুক্তি শোনেন এবং কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেননি। নিম্ন আদালতে তার পূর্ববর্তী উপস্থিতির তুলনায় এটি ছিল ভিন্ন চিত্র, যেখানে তিনি প্রায়ই আইনজীবীদের সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলতেন বা প্রতিক্রিয়া দিতেন। সুপ্রিম কোর্টের গম্ভীর পরিবেশে তিনি পুরো সময় স্থির ও নীরব থাকেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল ডি. জন সাওয়ার যুক্তি উপস্থাপন করেন। তবে বিচারপতিদের প্রশ্নে বারবার উঠে আসে সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর নাগরিকত্ব ধারার ব্যাখ্যা। এই ধারায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী এবং এখানকার অধিক্ষেত্রের আওতাভুক্ত সকল ব্যক্তি নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবেন। দীর্ঘদিন ধরে এর ব্যাখ্যায় কেবলমাত্র কিছু ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে, যেমন বিদেশি কূটনীতিকদের সন্তান।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তি দেয়, অবৈধ অভিবাসীদের সন্তানদেরও এই নাগরিকত্বের বাইরে রাখা উচিত। বিচারপতিরা এই ব্যাখ্যা নিয়ে তীব্র সন্দেহ প্রকাশ করেন। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস মন্তব্য করেন, প্রশাসনের উদাহরণগুলো খুবই সীমিত এবং তা দিয়ে বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীকে নাগরিকত্ব থেকে বাদ দেওয়ার যুক্তি দাঁড় করানো কঠিন। বিচারপতি এলেনা কেগানও বলেন, সংবিধানের ভাষা প্রশাসনের যুক্তিকে সমর্থন করে না এবং এটি একটি জটিল ও অপ্রচলিত ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করছে।
এমনকি রক্ষণশীল বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটোও কিছু মানবিক উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অনেক অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন এবং তাদের পরিবার গড়ে উঠেছে, ফলে এই বিষয়টি একটি মানবিক সমস্যারও সৃষ্টি করে।
শুনানিতে বিচারপতিরা ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন, যদিও তারা স্পষ্ট করেন যে নীতিগত দিক আদালতের আইনি সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে না। “বার্থ ট্যুরিজম” বা জন্মদানের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও বিচারপতিরা একমত হন যে, এটি আইনি বিশ্লেষণের মূল বিষয় নয়।
আলোচনায় বারবার উঠে আসে ১৮৯৮ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়, যেখানে চীনা অভিবাসী পিতামাতার সন্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। এই রায় বর্তমান মামলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের আইনজীবী এই রায় বাতিল করার দাবি না তুললেও, বিচারপতিরা ইঙ্গিত দেন যে এই নজির বহাল থাকলে ট্রাম্পের নীতি টিকবে না।
সবশেষে বিচারপতি কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসন বাস্তব প্রয়োগের বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানতে চান, একটি শিশুর জন্মের সময় কীভাবে নাগরিকত্ব নির্ধারণ করা হবে এবং এর জন্য কী ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এতে জটিলতা ও প্রশাসনিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। জবাবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রয়োজনে পরবর্তীতে আপিলের সুযোগ থাকবে, তবে এই উত্তরেও বিচারপতিরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট হননি। এই শুনানি থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে ট্রাম্পের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার উদ্যোগ সুপ্রিম কোর্টে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এবং বিচারপতিদের প্রশ্নই সেই সংশয়ের প্রতিফলন।
