ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ আমেরিকা ও চীনের দ্বিমুখী আধিপত্য রোধ এবং মাঝারি শক্তির দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি নতুন “স্বাধীনতা জোট” (Coalition of Independence) গড়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি যে “Strategic Autonomy” বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের কথা বলছেন, তা মূলত মার্কিন নেতৃত্বাধীন ব্লক (NATO/West) এবং চীনা প্রভাববলয়ের বাইরে একটি তৃতীয় শক্তি গড়ে তোলার ধারণা।
দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রদত্ত এই ভাষণে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ আমেরিকাকে “অনিশ্চিত” (policy volatility) এবং চীনকে “আধিপত্যবাদী” (assertive expansion) পরাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি ভারত, ব্রাজিল, জাপান, ইউরোপ এবং অন্যান্য মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রগুলোকে কোনো পরাশক্তির আজ্ঞাবহ না হয়ে — কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে একটি “তৃতীয় পথ” বা “স্বতন্ত্র শক্তি” হিসেবে আত্মপ্রকাশের আহ্বান জানান।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ফ্রান্সই একমাত্র দেশ যার নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ (Veto Power) আছে। এছাড়াও আফ্রিকা ও Indo-Pacific-এ ফ্রান্সের military presence রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ দীর্ঘকাল ধরে যে “Strategic Autonomy”-র কথা বলে আসছেন, তা মূলত একটি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করবে।
প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ মনে করেন, ইউরোপের প্রতিরক্ষা এবং প্রযুক্তিতে কারও মুখাপেক্ষী হওয়া উচিত নয়—যা ‘ম্যাক্রোঁ ভিশন’ নামে পরিচিত। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু দেশ, যেমন পোল্যান্ড বা বাল্টিক রাষ্ট্রসমূহ, এখনো মনে করে যে রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় আমেরিকার নিরাপত্তা ছাতার (US security umbrella) কোনো বিকল্প নেই।
ফ্রান্স ভারতকে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা করে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো এখনো চীনের আধিপত্য মোকাবিলায় আমেরিকার মুখাপেক্ষী। কানাডার অর্থনীতি মূলত আমেরিকায় রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল, আর অস্ট্রেলিয়ার রপ্তানি তথা অর্থনৈতিক ভাগ্য অনেকটাই চীনকেন্দ্রিক। অন্যদিকে ব্রাজিল উভয় পরাশক্তির সঙ্গেই ভারসাম্য রক্ষা করে চলে।
তাছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখনো মার্কিন সিলিকন ভ্যালি (Silicon Valley) বা চীনের ম্যানুফ্যাকচারিং হাবের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পুরোপুরি আত্মনির্ভর (Self-sufficient) হয়ে উঠতে পারেনি।
সুতরাং, ২০২৬ সালের বাস্তবতায় ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর এই প্রস্তাব একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক বা রাজনৈতিক জোট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সম্ভাবনা কম। তবে ফ্রান্স, ভারত, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে; এবং বিশ্ব রাজনীতিতে গড়ে উঠতে পারে একটি নতুন প্রভাবশালী অক্ষবলয়।
