আফজাল হোসেন
সামাজিক পরিচয় রয়েছে এমন দুজন মানুষের পুরানো একটা ছবি আচমকা মুখবইয়ের পাতায় ঝুলিয়ে দিয়ে কেউ একজন লিখলো, “যখন তারা স্বামী স্ত্রী ছিল”।
এ অকাজের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেয়া হয়, পৃথিবীতে অসভ্যতা করার, অশান্তি তৈরি, অসুন্দর রচনা করার মানুষ অনেক আছে। তারা অন্যের বেদনায় নিজের আনন্দ খুঁজে পাওয়া মানুষ।
কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই দুজন মানুষের অতীতের একটা ছবি মানুষ্য বাজারে ঝুলিয়ে দেয়াকে অনেক মানুষ বুদ্ধিমত্তা ভাবে। ভাবে এটা একটা ভালো টোপ। মুখবইয়ে প্রকাশ করা এমন ছবির নিচে হুহু করে লাইক পড়বে, শেয়ার বাড়বে আর আজেবাজে মন্তব্য করতে কোমর বেঁধে নেমে পড়বে বহু জ্ঞাতি ভাইয়েরা।
খুবই অবাক করা বিষয় হচ্ছে, যারা অতি আগ্রহ নিয়ে যাদের নিয়ে বাজে মন্তব্য করতে নেমে পড়ে, তাদের সাথে কোনদিন ছবির দম্পতির পরিচয়ই ঘটেনি।
চেনা বা অচেনা কোন মানুষ সম্পর্কে মন্দ কথা বলা, মন্দ ভাবা সুস্থতা নয়। দুজন মানুষ, যারা একদা দম্পতি ছিল, কোন এক অজানা কারণে কুড়ি বছর আগে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে। যা একান্তই তাদের নিজস্ব ব্যাপার, যে সম্পর্ক চটকানোর অধিকার তৃতীয় কোনো মানুষের নেই, তবু সে কম্ম করে আনন্দ পাওয়ার স্বভাব অনেকের থাকে।
কারো সম্পর্ক ভেঙেছে, এটা মোটেও আনন্দদায়ক ঘটনা নয়। কারো জীবনের দুঃখের ঘটনায় যেসব মন আনন্দের সূত্র পায়, তারা হুবহু মানুষের মতো দেখতে কিন্তু তাদের হৃদয়ে অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে। তারা চোখ থাকা সত্বেও অন্ধ।
এ সমাজে বাস করা পুরুষজাতির বড়ো এক অংশের রোগই হচ্ছে বিয়ে না টিকলে নারীর দোষ ধরা। একটা সম্পর্ক যদি ভাঙে, দুজনের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্বাস ইত্যাদির বৈপরীত্যের কারণেই ভাঙে। দুজন মানুষের সম্পর্ক টেকেনি, তা ঐ দুজন মানুষের একান্ত নিজস্ব ব্যাপার।
কুড়ি বছর আগে এক দম্পতির নিজেদের গড়া সম্পর্ক ভেঙেছে। ভেঙে আবার নতুন করে জীবন গড়েছে তারা। পিছনের ঘটনা পিছনে ফেলে জীবন এগিয়ে নেওয়াই নিয়ম। সে নিয়মে বর্তমানকে তারা সফল, সুন্দর ও মধুর করে তুলতে চেয়েছে এবং পেরেছেও।
কারো সুখময় বর্তমানকে অতীতের একখানা ছবি দিয়ে আঘাত করতে চাওয়া মোটেও শোভন নয়। তা সভ্যতাকে বুডো আঙুল দেখানো, ঠাট্টা করা। তবু অন্ধকারাচ্ছন্ন মানুষ সুখ পেতে এমন অন্যায় করে। করে আনন্দ পায়।
এমন বহু অন্যায়, বিকৃতিতে মানুষের জীবন ও পৃথিবী অসম্মানিত হয়, হচ্ছে রোজই। মানুষ, জীবন ও সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারি না অথচ আমরা মানুষ পরিচয় নিয়ে গৌরববোধ করে থাকি।
০২
কে কিরকম মন নিয়ে জগতে এসেছি, জগতবাস করি তার আরো একটা উদাহরণ মনে পড়েছে।
এক ভদ্রলোকের বয়স ষাটের কোঠায়। তাঁর স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে বছর তিনেক আগে। ছেলে মেয়ে দুজনেই থাকে বিদেশে। একবার দেশে এসে তারা বাবার প্রতিদিনের জীবন খুঁটিয়ে দেখে এবং নিসঙ্গতার কষ্ট অনুভব করতে পারে।
বাবার একজন সঙ্গী দরকার মনে করে তারা এবং বাবাকে সেকথা বলেও ফেলে। বাবা বিয়ের কথা শুনে হাসেন,
– আমি আনন্দিত তোমরা আমার অসুবিধার কথা ভেবেছ কিন্তু যে ভদ্রমহিলাকে এ বাড়িতে আনা হবে, তাঁর কষ্টের কথা ভেবে দেখনি। মানুষটা এ বাড়িতে এসে নিজেকে অতিরিক্ত মানুষ হিসাবে দেখবেন, দেখবেন চারদিকে তোমাদের মা আর আমার, আমাদের সাথে তোমাদের ছবি বাঁধাই করে রাখা। ভদ্রমহিলা আমার দ্বিতীয় স্ত্রী এই কথাটা প্রতি মূহুর্তে মনে করিয়ে দেয়া যে জীবন তিনি পাবেন, তা হবে খুবই অস্বস্তিকর, অসুন্দর।
ছেলে মেয়েরা বোঝায়, বাবা এগুলো অতিরিক্ত, অদরকারি ভাবনা। তুমি বাস্তব দিকটা ভেবে দেখো। বাবা কথা কেড়ে নিয়ে বলেন,
– হ্যাঁ একজন সঙ্গী মিললে ভালোই হয় কিন্তু আমারও তো দায়িত্ব, সঙ্গীকে স্বস্তি, সুখ, নিরাপত্তা দেয়া। কেউ অস্বস্তিতে পূর্ণ একটা জীবন কাটাবে আর আমার দিন ভালো কাটবে- এ হয় না।
