যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির প্রথম পর্বে থাকছে শুল্ক, শ্রম, মেধাস্বত্ব, পরিবেশ, কেনাকাটাসহ বাংলাদেশের প্রধান বাধ্যবাধকতার বিশ্লেষণ।
শওকত হোসেন
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিতে বাংলাদেশের ওপর একতরফাভাবে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। সে তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রকে তেমন কিছুই করতে হবে না।
কোনো আইনে বা চুক্তিতে ইংরেজি ‘শ্যাল’ কথা থাকা অর্থ হচ্ছে এসব বিষয় পালন করা বাধ্যতামূলক। ‘উইল’ লেখা থাকলে সেটা হবে ইচ্ছাধীন বিষয়। ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে শ্যাল কথাটি আছে মোট ১৭৯ বার, উইল ৩ বার। এর মধ্যে ‘বাংলাদেশ শ্যাল’ এসেছে ১৩১ বার, আর ‘ইউএস শ্যাল’ আছে মাত্র ৬ বার।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) সই হয় গত ৯ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে। পরে ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এই পাল্টা বা পারস্পরিক শুল্ক আরোপ বাতিল করে দেন।
এই চুক্তি নিয়ে দেশে নানা ধরনের সমালোচনা হচ্ছে। জাতীয় সংসদে এই চুক্তি বাতিল চেয়েছেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন থেকেও চুক্তি বাতিলের দাবি উঠেছে। অর্থনীতিবিদেরাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য সমাধানের কথা বলেছেন। চুক্তিটি এখনো কার্যকর হয়নি। তবে এরই মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে নানা পণ্য কেনার চুক্তি করছে। এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কোনো আইনে বা চুক্তিতে ইংরেজি ‘শ্যাল’ কথা থাকা অর্থ হচ্ছে এসব বিষয় পালন করা বাধ্যতামূলক। ‘উইল’ লেখা থাকলে সেটা হবে ইচ্ছাধীন বিষয়। ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে শ্যাল কথাটি আছে মোট ১৭৯ বার, উইল ৩ বার। এর মধ্যে ‘বাংলাদেশ শ্যাল’ এসেছে ১৩১ বার, আর ‘ইউএস শ্যাল’ আছে মাত্র ৬ বার।
মূল চুক্তিতে যা যা আছে
মূল চুক্তিতে ৬টি ধারা রয়েছে। তবে চুক্তিটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তার উল্লেখ রয়েছে পরিশিষ্টে। পরিশিষ্টে দেওয়া সব সংযুক্তি চুক্তিরই অংশ।
চুক্তির প্রথম ধারার বিষয় শুল্ক ও কোটা। এ বিষয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর নির্ধারিত শুল্ক বসাবে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে কোটা দেবে না এবং যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের পণ্যের ওপর নির্ধারিত হারে শুল্ক বসাবে।
অশুল্ক বাধা ও সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ধারায় ১১টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এর মূল কথা হলো মার্কিন পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড়াও এমন কোনো নিয়ম, কাগজপত্র, অনুমতি, পরীক্ষা, মান যাচাই বা লাইসেন্স আরোপের মতো নিয়ম করা যাবে না, যা বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করবে। যেমন বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর আমদানি লাইসেন্স প্রয়োগ করবে না, যুক্তরাষ্ট্রের যেসব পণ্য মার্কিন বা আন্তর্জাতিক মান মেনে চলে, সেসব পণ্য বাংলাদেশে ঢুকতে পারবে এবং সরকারি বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার থেকে সনদ দেওয়া থাকলে বাংলাদেশ অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করবে না।
চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশি বাজারে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা আছে। তবে স্বাস্থ্য বা নিরাপত্তার কারণে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তা বিজ্ঞানভিত্তিক ও ঝুঁকিভিত্তিক হতে হবে, শুধু বাণিজ্য ঠেকানোর জন্য নিয়ম করা যাবে না। বাংলাদেশ এমন কোনো স্বাস্থ্যবিধি বা মানদণ্ড নেবে না, যাতে মার্কিন পণ্য অন্য দেশের তুলনায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। জিআই সুরক্ষা বা স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
চুক্তির পরের অংশে চিজ ও মাংসজাত পণ্যের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, কেবল নাম ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের বাজারে প্রবেশে বাধা দেবে না।
বাংলাদেশ মেধাস্বত্বের শক্ত সুরক্ষা দেবে। মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন ঠেকাতে দেওয়ানি, ফৌজদারি ও সীমান্ত পর্যায়ে ব্যবস্থা নেবে, অনলাইন ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হবে। কপিরাইট ও ট্রেডমার্ক লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।
সেবা খাত নিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন নিয়ম করতে পারবে না, যাতে মার্কিন সেবাপ্রতিষ্ঠান দেশীয় বা অন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কম সুবিধা পায়। বাণিজ্য-সংক্রান্ত নতুন নিয়ম করার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখতে হবে এবং আলোচনা ছাড়া হঠাৎ কোনো বিধি চাপানো যাবে না।
এর পরের অনুচ্ছেদ শ্রম নিয়ে। এখানে বলা হয়েছে যে জোরপূর্বক বানানো কোনো পণ্য আমদানি করা যাবে না। এর মধ্যে রয়েছে শিশুশ্রম, চুক্তিবদ্ধ বাধ্যতামূলক বা জোরপূর্বক শ্রম। পরিবেশ সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ ও বজায় রাখার কথা আছে এরপরেই। পরের অনুচ্ছেদটি সীমান্তব্যবস্থা ও কর বিষয়ে। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেদের শ্রমিক ও ব্যবসা রক্ষায় সীমান্তে কোনো নিয়ম নেয়, বাংলাদেশ সেই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিল রেখে কাজ করবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের রপ্তানিকারকদের কর ছাড় দেয় বা কর ফেরত দেয়, বাংলাদেশ তার বিরোধিতা করবে না, এমনকি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থাতেও নয়। বাংলাদেশ এমন ভ্যাট বসাবে না, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির প্রতি বৈষম্য হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সীমান্তে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যছাড়ের প্রক্রিয়া ডিজিটাল করবে।
ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি
চুক্তির এই ধারায় অনুচ্ছেদ রয়েছে চারটি। এতে প্রথমেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন কোনো ডিজিটাল সেবার ওপর কর আরোপ করবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে বৈষম্য সৃষ্টি করে। এ ছাড়া বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্য সহজ করবে। মার্কিন ডিজিটাল পণ্যের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক কোনো নীতি নেবে না। ব্যবসার প্রয়োজনে নিরাপদে সীমান্ত পেরোনো ডেটা আদান-প্রদান নিশ্চিত করবে এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করবে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেদের শ্রমিক ও ব্যবসা রক্ষায় সীমান্তে কোনো নিয়ম নেয়, বাংলাদেশ সেই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিল রেখে কাজ করবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের রপ্তানিকারকদের কর ছাড় দেয় বা কর ফেরত দেয়, বাংলাদেশ তার বিরোধিতা করবে না, এমনকি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থাতেও নয়।
বাংলাদেশ যদি অন্য কোনো দেশের সঙ্গে নতুন ডিজিটাল বাণিজ্যচুক্তি করে এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাহলে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করবে। এরপরও যদি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ দূর না হয়, তাহলে তারা বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের এই চুক্তি বাতিল করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিলের নির্বাহী আদেশ ১৪২৫৭ অনুযায়ী আগের পারস্পরিক শুল্কহার আবার চালু করতে পারবে।
বাংলাদেশ ইলেকট্রনিকভাবে পাঠানো কনটেন্ট বা তথ্যের ওপর শুল্ক বসাবে না। অনলাইন লেনদেনে স্থায়ীভাবে শুল্ক না রাখার ডব্লিউটিও প্রস্তাবও সমর্থন করবে।
পরের অনুচ্ছেদের বিষয় বাজারে প্রবেশের শর্ত। এখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ব্যবসার শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে প্রযুক্তি, উৎপাদন পদ্ধতি, সোর্স কোড বা গোপন ব্যবসায়িক তথ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না। নির্দিষ্ট প্রযুক্তি কিনতে বা ব্যবহার করতেও বাধ্য করা যাবে না। তবে সরকারি কেনাকাটা, দুই পক্ষের বাণিজ্যিক চুক্তি, তদন্ত, আইন প্রয়োগ বা আদালতের প্রয়োজনে সোর্স কোড বা অ্যালগরিদম চাওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে তথ্যের গোপনীয়তা রাখতে হবে।
অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা
চুক্তির ৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তার কারণে কোনো বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নিলে বাংলাদেশকে জানাবে। আলোচনার পর বাংলাদেশ নিজের আইন মেনে একই ধরনের সহায়ক ব্যবস্থা নেবে। তৃতীয় দেশের মালিকানাধীন কোনো কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে খুব কম দামে পণ্য রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ক্ষতিগ্রস্ত করলে বাংলাদেশ ব্যবস্থা নেবে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে তথ্য দেবে।
পরের অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও পণ্যের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করবে। এ জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নিয়ম মানবে, নিজের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্য করবে এবং কোনো কোম্পানি যেন এসব নিয়ম ফাঁকি দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করবে।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ নিজের আইনের সীমার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন ভঙ্গ করতে পারে—এমন লেনদেন ঠেকানো যায়। আবার বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগের তথ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করবে, যাতে অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে স্বচ্ছতা বাড়ে। বাংলাদেশের এই সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্র তার রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ যাচাই-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে বিবেচনা করবে।
