বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে—এই সংখ্যাটি নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর–এর তথ্যমতে, মাত্র দুই মাসেরও কম সময়ে ৫১ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী, ৭ হাজারের বেশি নিশ্চিত সংক্রমণ, আর ৪২৫টি মৃত্যু—যার অধিকাংশই শিশু। এই চিত্র কোনো সাধারণ স্বাস্থ্য সংকট নয়; এটি এক ভয়াবহ প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নীতিগত অদূরদর্শিতা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতার ফল।
গত আড়াই দশকের ইতিহাস বলছে—এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশ আগে দেখেনি। অথচ মাত্র এক বছর আগেও হামের রোগী ছিল হাতে গোনা। প্রশ্ন জাগে—তাহলে এই বিস্ফোরণ কেন? উত্তরটা অস্বস্তিকর হলেও স্পষ্ট।
প্রথমত, অবৈধ ইউনুস সরকারের সময় টিকাদান কার্যক্রমে যে মারাত্মক শৈথিল্য দেখা গেছে, সেটিই আজকের এই বিপর্যয়ের বীজ বপন করেছে। টিকাদান একটি ধারাবাহিক ও উচ্চ-নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া—এখানে সামান্য ব্যত্যয়ও ভয়াবহ ফল ডেকে আনতে পারে। কিন্তু সেই সময় প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব, মাঠপর্যায়ে নজরদারির দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সংকট মিলিয়ে টিকাদান কার্যক্রম কার্যত ভেঙে পড়ে। ফলে হাজার হাজার শিশু সুরক্ষার বাইরে থেকে যায়—যা আজ মৃত্যুর মিছিলে রূপ নিয়েছে।
বর্তমান প্রহসনের নির্বাচনে গঠিত জনরায়বিহীন সরকারও এই সংকট মোকাবিলায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। সংক্রমণ বাড়তে থাকলেও সময়মতো জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়নি, জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত গাইডলাইন দেওয়া হয়নি, চিকিৎসা ব্যবস্থাকে দ্রুত সম্প্রসারণ করা হয়নি। এমনকি পরিস্থিতি “মহামারি” হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও অযথা দ্বিধা—যা শুধু সময় নষ্ট করেছে, জীবন কেড়ে নিয়েছে।
যেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত, বিকেন্দ্রীকৃত চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং জরুরি জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল, সেখানে দেখা গেছে ধীরগতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। ফলাফল—প্রতিদিন নতুন মৃত্যু, নতুন সংক্রমণ, আর অসহায় পরিবারগুলোর দীর্ঘশ্বাস।
এই ব্যর্থতার বিপরীতে যদি আমরা তাকাই আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের দিকে, তাহলে একেবারে ভিন্ন চিত্র দেখতে পাই। দীর্ঘ এক দশক ধরে বাংলাদেশ টিকাদান কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। Expanded Programme on Immunization (EPI) কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও শিশুদের টিকার আওতায় আনা হয়েছিল। হামের মতো রোগ প্রায় নির্মূলের পথে চলে গিয়েছিল। ধারাবাহিক মনিটরিং, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সক্রিয়তা, এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা—এই তিনের সমন্বয়েই সেই সাফল্য সম্ভব হয়েছিল।
অর্থাৎ, এটি প্রমাণিত—বাংলাদেশ চাইলে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এখন কেন পারছে না?
কারণ এখানে শুধু স্বাস্থ্যনীতি নয়, রাজনীতিও জড়িত।
অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের অদক্ষতা এবং বর্তমান প্রহসনের নির্বাচনে গঠিত জনরায়বিহীন সরকারের ধীর প্রতিক্রিয়া—দুটিই মিলে একটি ভয়াবহ শূন্যতা তৈরি করেছে। সেই শূন্যতায়ই জায়গা করে নিয়েছে এই মহামারি।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই সংকটের মাঝেও দায় এড়ানোর প্রবণতা। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে দোষারোপ করছে, কিন্তু বাস্তবে মারা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের সন্তানরা। রাষ্ট্রের এই দায়িত্বহীনতা ক্ষমার অযোগ্য।
কিন্তু এই গল্পের আরেকটি অন্ধকার দিক আছে—আর তা হলো আমাদের সমাজের নীরবতা।
আজ যখন শত শত শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে, তখন কোথায় সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ? কোথায় সেই সোচ্চার নাগরিক সমাজ? কোথায় সেলিব্রেটিদের বিবেকের আওয়াজ? যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুচ্ছ বিষয়েও সরব হন, তারা আজ কেন নিশ্চুপ? কেন এই মৃত্যুর মিছিল তাদের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে না?
বিভিন্ন সক্রিয় রাজনৈতিক সংগঠন, যারা প্রতিদিন নানা ইস্যুতে রাজপথ গরম রাখে—তারা আজ কোথায়? শিশুদের জীবন কি তাদের রাজনীতির এজেন্ডায় পড়ে না? নাকি এই মৃত্যু তাদের কাছে পরিসংখ্যান মাত্র?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা কি এক অসচেতন, অনুভূতিহীন সমাজে পরিণত হচ্ছি? যেখানে শিশুর মৃত্যু আর প্রতিবাদের কারণ নয়, বরং কয়েক দিনের আলোচনার পর বিস্মৃত হয়ে যায়?
এই নীরবতা শুধু দুঃখজনক নয়—এটি বিপজ্জনক। কারণ যখন সমাজ চুপ থাকে, তখন ব্যর্থতা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে, দায়হীনতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
এবার যদি আমরা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তাকাই, তাহলে এই সংকটের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ভারত–এ ২০২৩ সালে হামের রোগী ৬৫ হাজার ছাড়ালেও, সেখানে দ্রুত জরুরি টিকাদান ক্যাম্পেইন, নজরদারি এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার সম্প্রসারণের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ইউক্রেন–এ ২০১৮-১৯ সালে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও, তারা জাতীয় পর্যায়ে জরুরি স্বাস্থ্য প্রতিক্রিয়া চালু করে সংক্রমণ কমাতে সক্ষম হয়।
মাদাগাস্কার–এ ২০১৯ সালে ২ লাখের বেশি সংক্রমণ হয়েছিল—কিন্তু তারা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়। আর কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র–এর মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশেও, যেখানে অর্ধেক জনগণ টিকার বাইরে, সেখানে সংক্রমণের উচ্চ হার কিছুটা ব্যাখ্যা করা যায়।
কিন্তু বাংলাদেশ? এখানে যুদ্ধ নেই, অবকাঠামো ধ্বংস হয়নি, আন্তর্জাতিক সহায়তার পথও খোলা—তারপরও কেন এই বিপর্যয়?
এই তুলনা আমাদের সামনে একটি কঠিন সত্য তুলে ধরে—বাংলাদেশের এই সংকট প্রাকৃতিক নয়, এটি মানবসৃষ্ট। এটি অবহেলা, অদক্ষতা এবং নীতিগত ব্যর্থতার ফল।
আজ প্রয়োজন শুধু সরকারের জবাবদিহি নয়, সমাজের জাগরণও। প্রয়োজন সম্মিলিত কণ্ঠ, মানবিক দায়বদ্ধতা, এবং সত্যিকারের সচেতনতা। কারণ রাষ্ট্র একা কখনোই সংকট মোকাবিলা করতে পারে না—যদি নাগরিকরা ঘুমিয়ে থাকে।
শেষ কথা একটাই—হাম আজ শুধু একটি রোগ নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতীক, আর আমাদের সামাজিক নীরবতারও নির্মম প্রতিফলন। আর এই ব্যর্থতা ও নীরবতার যৌথ মূল্য দিচ্ছে নিরপরাধ শিশুরা।(আওয়ামীলীগ পেইজ থেকে)
