বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ও বিমানঘাঁটি মার্কিন সামরিক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করার সম্ভাব্য পরিকল্পনা ঘিরে নতুন ভূ-রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। ইউক্রেনভিত্তিক সামরিক সংবাদমাধ্যম militarnyi.com-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সমঝোতা দেশটিকে ধীরে ধীরে ওয়াশিংটনের কৌশলগত বলয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, “Agreement on Reciprocal Trade (ART)” নামে একটি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের বন্দর ও বিমানঘাঁটি মার্কিন সামরিক লজিস্টিক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করার আলোচনা চলছে। পাশাপাশি “General Security of Military Information Agreement (GSOMIA)” এবং “Acquisition and Cross-Servicing Agreement (ACSA)” নামের দুটি প্রতিরক্ষা চুক্তির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
যদিও এসব বিষয়ে বাংলাদেশ বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা হয়নি, তবু সম্ভাব্য এমন ব্যবস্থার ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা বাড়ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা এবং চীন-ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে সামনে আনা হচ্ছে।
কৌশলগত স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ছোট ও মধ্যম শক্তির রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সম্পদ হলো ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। কিন্তু নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও সামরিক সহযোগিতায় একটি বৃহৎ শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হলে সেই ভারসাম্য দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে মার্কিন প্রযুক্তি, জ্বালানি ও ডিজিটাল কোম্পানিগুলোর জন্য বিশেষ সুবিধা দিতে হবে। একই সঙ্গে চীন বা রাশিয়ার মতো “অবাজার অর্থনীতি” হিসেবে বিবেচিত দেশের সঙ্গে ভবিষ্যৎ চুক্তি নিয়েও সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের শর্ত কার্যকর হলে বাংলাদেশের স্বাধীন কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্র সংকুচিত হতে পারে।
ঢাকার এক সাবেক কূটনীতিক বলেন, “বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নীতি অনুসরণ করেছে। কিন্তু যদি দেশটি দৃশ্যমানভাবে কোনো একটি শক্তির নিরাপত্তা বলয়ের অংশ হয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা কঠিন হতে পারে।”
চীনের কৌশলগত উদ্বেগ
চীন গত এক দশকে বাংলাদেশে অবকাঠামো, জ্বালানি, বন্দর ও সামরিক খাতে বড় বিনিয়োগ করেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী বন্দরকে তারা বঙ্গোপসাগরে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবেশপথ হিসেবে বিবেচনা করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিয়ানমার হয়ে চীনের “China-Myanmar Economic Corridor (CMEC)” প্রকল্প এবং মালাক্কা প্রণালীর বিকল্প জ্বালানি ও বাণিজ্য রুটের নিরাপত্তায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বা লজিস্টিক প্রবেশাধিকার বাড়লে বেইজিং সেটিকে তাদের আঞ্চলিক কৌশলের জন্য সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখতে পারে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, “চীন বাংলাদেশকে শুধু বাজার হিসেবে দেখে না। বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরীয় প্রবেশপথের অংশ হিসেবেও দেখে। ফলে মার্কিন সামরিক প্রবেশাধিকার বাড়লে চীনের উদ্বেগ বাড়বে।”
তার মতে, এতে ভবিষ্যতে চীনা বিনিয়োগ, ঋণ, অবকাঠামো সহযোগিতা কিংবা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহেও প্রভাব পড়তে পারে।
ভারতের নিরাপত্তা হিসাবেও পরিবর্তন
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের নিরাপত্তা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর, উত্তর-পূর্ব ভারতের করিডোর এবং আন্দামান অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্যের সঙ্গে বাংলাদেশ সরাসরি যুক্ত।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দিল্লি ঢাকার রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় আগের রাজনৈতিক প্রভাব হারিয়েছে বলে ওয়াশিংটন মনে করছে। যদিও এ দাবির স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি, তবু বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সম্পৃক্ততা বাড়লে ভারত বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর একটি এবং প্রযুক্তি ও জ্বালানি বিনিয়োগের সম্ভাব্য উৎস। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় ঋণদাতা, অবকাঠামো অংশীদার ও অস্ত্র সরবরাহকারী। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর ভৌগোলিক ও নিরাপত্তাগত আন্তঃনির্ভরতা রয়েছে।
তাদের মতে, বাংলাদেশ যদি প্রকাশ্যে কোনো একক শক্তির নিরাপত্তা বলয়ের অংশ হিসেবে প্রতীয়মান হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার চাপ সরাসরি দেশের ভেতরে এসে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে বহুমুখী সম্পর্ক বজায় রাখা এবং এমন অবস্থান এড়িয়ে চলা, যাতে দেশটি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার সামনের সারির ক্ষেত্র হয়ে না ওঠে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক আমিনুল হক বলেন, “ভারত এখন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় অতিরিক্ত বহিরাগত সামরিক উপস্থিতি নিয়ে দিল্লির ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতা আছে।”
তার মতে, চট্টগ্রাম, মাতারবাড়ী বা বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন কার্যক্রম স্থায়ী চরিত্র পেলে ভারত সেটিকে নিজেদের নিরাপত্তা হিসাবের অংশ হিসেবে বিবেচনা করবে।
