কবির য়াহমদ
আপনাদের কি মনে আছে, গত কোরবানির ঈদের জামাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঠিক পাশে কারা দাঁড়ানো ছিলেন? যাদের মনে নেই, তাঁদের একটু স্মরণ করিয়ে দিই— একদিকে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং ডানে দাঁড়ানো ব্যক্তিটির নাম মীর শাহে আলম। তাঁদের কারণে সেদিন খোদ রাষ্ট্রপতির পক্ষেও প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করা সম্ভব হয়নি। উল্টো প্রতিমন্ত্রী-মন্ত্রীরা সেদিন ইশারায় রাষ্ট্রপতিকে অন্য কোথাও নামাজে দাঁড়ানোর অনুরোধ করছিলেন। সে দৃশ্য আমরা দেখেছি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
গত কয়েক দিনে আপনারা একজন মীর শাহে আলমকে চিনে গেছেন। তিনি বর্তমান সরকারের এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী। এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কিন্তু সরকারের এই মাত্র চার মাসেই প্রতিমন্ত্রীর দাপটে মন্ত্রী যেন অনেকটাই কোণঠাসা। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর এমন ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা আমরা এর আগে খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে দেখেছিলাম। তখন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের দাপটে তৎকালীন মন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক ছিলেন অনেকটাই অসহায় এবং আলোচনার বাইরে। মির্জা ফখরুল যেন এখন সেই ওসমান ফারুকেরই দিন যাপন করছেন। অথচ মির্জা ফখরুল সরকারি দল বিএনপির মহাসচিব!
মীর শাহে আলম হচ্ছেন সেই প্রতাপশালী প্রতিমন্ত্রী, যিনি কিছুদিন আগে সংসদকে বুক ফুলিয়ে জানিয়েছিলেন— ইউনূস নাকি ‘জুলাইয়ের ট্রফি’ লন্ডনে গিয়ে তারেক রহমানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন! আর গত কয়েক দিনে নানা মাধ্যমে যে খবর বেরিয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সুবাদে তিনি নিজের সন্তানদের নামে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নামকরণ করছেন, নিজের বংশের পদবি দিয়ে বদলে দিচ্ছেন এলাকার নাম। একটি গণমাধ্যমে দেখলাম, এই প্রতিমন্ত্রী তাঁর ভাতিজির নামের অংশ দিয়েও একটি এলাকার নাম বদলে দিয়েছেন।
সবচেয়ে কৌতুকপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিমন্ত্রী নিজে এসব কাণ্ডকে বলছেন ‘মিরাকল’। অথচ এসব নামকরণের পেছনে খোদ প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া ‘ডিও লেটার’ (আধা-সরকারি সুপারিশপত্র) ছিল বলে অনেকগুলো গণমাধ্যম জানিয়েছে। নিজে সুপারিশ করার পর সংসদে তা নিয়ে আলোচনা শুরু হতেই তিনি অবলীলায় বলছেন— সব নাকি ‘মিরাক্যালি’ ঘটে গেছে!
গতকাল ‘নেত্র নিউজ’-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মীর শাহে আলমের চার মাসের আসল রূপ বেরিয়ে এসেছে। প্রতিবেদন বলছে, মীর শাহে আলম তাঁর নির্বাচনী এলাকায় যে পরিমাণ বরাদ্দ নিয়েছেন, তা খোদ প্রধানমন্ত্রীর নিজের উপজেলাও পায়নি; দেশের অন্য এলাকার কথা তো বাদই দিলাম। নিজের মন্ত্রণালয় থেকে টাকা বরাদ্দ নিতে নিজে করছেন সুপারিশ, আবার চেয়ারে বসে নিজেই নিচ্ছেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। আর এই প্রকল্পগুলোর সিংহভাগেরই কাজ হচ্ছে তাঁর পুত্রের নামে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও বিএনপি নেতাদের মাধ্যমে। অর্থাৎ, ক্ষমতার পুরোটাই একটা পারিবারিক সিন্ডিকেট। আর এই সিন্ডিকেটের সামনে মন্ত্রণালয়ের ‘ওভাররেটেড মন্ত্রী’ কার্যত অসহায়।
নেত্র নিউজের সেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্যগুলো চোখ কপালে তোলার মতো: “বিএনপি সরকারের প্রথম চার মাসে দেশের সর্বোচ্চ সড়ক-সেতু বরাদ্দ পেয়েছে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের শিবগঞ্জ — কাজের বড় অংশ বাটোয়ারা হয়েছে তাঁর ছেলে ও বিএনপি-ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের মধ্যে। জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে বগুড়া — যা দ্বিতীয় স্থানে থাকা গাজীপুরের চেয়ে ৯০ শতাংশ বেশি। গড়ে ছয়টি জেলার সমান প্রকল্প সাবাড় করেছে বগুড়া একাই। আবার বগুড়ার মোট বরাদ্দের অর্ধেকেরও বেশি — ৭৪ কোটি টাকার প্রকল্প — গেছে একটি মাত্র উপজেলায়: প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নির্বাচনী এলাকা শিবগঞ্জে। প্রধানমন্ত্রীর নিজের উপজেলা গাবতলীর চেয়েও প্রতিমন্ত্রীর শিবগঞ্জ পেয়েছে সাড়ে তিন গুণেরও বেশি বরাদ্দ। বগুড়ার বাকি ১০ উপজেলার ভাগ্যে জেলার মোট বরাদ্দের ৩০ শতাংশও মেলেনি। অর্থাৎ, শিবগঞ্জ একাই পেয়েছে বাকি দশ উপজেলার সম্মিলিত বরাদ্দের প্রায় দ্বিগুণ। গড়ে দেশের প্রায় ২০টি উপজেলার বরাদ্দ একাই গিলেছে প্রতিমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা।”
মীর শাহে আলম রাতারাতি এত ক্ষমতাধর কীভাবে হলেন? বগুড়া থেকে নির্বাচিত বলে? নাকি প্রধানমন্ত্রীর অতি ঘনিষ্ঠ মানুষ বলে? উত্তর সম্ভবত “হ্যাঁ”। তা না হলে ঈদের নামাজে প্রধানমন্ত্রীর ঠিক পাশে সাবেক এক ইউপি চেয়ারম্যান, আর বর্তমানে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা মীর শাহে আলম দাঁড়ান কীভাবে? তিনি কি তবে নতুন রূপে সাজানো “Prime Minister’s men”? মাত্র চার মাসে মীর শাহে আলম ক্ষমতার যে শিখরে পৌঁছেছেন, সেখান থেকে তাঁকে কি “প্রাইম মিনিস্টার’স ম্যান” বলা যায়?
যা দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে প্রকাশিত তথ্যের বাইরে এই মীর শাহে আলমের সাম্রাজ্য আরও বিশাল। ক্ষমতার জাল হয়তো আরও গভীরে। প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সুবাদে তাঁর বড় ছেলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক পদও বাগিয়ে নিয়েছিলেন, যদিও পরে তিনি পদত্যাগ করেছেন বলে শোনা যায়। এছাড়া তাঁর পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় বিএনপির নানা গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে রেখেছেন। অর্থাৎ, কেবল ব্যবসা-বাণিজ্য বা ঠিকাদারিই নয়, রাজনীতিতেও তিনি একটি নিশ্ছিদ্র পারিবারিক সিন্ডিকেট বজায় রাখছেন।
না, ক্ষমতার এই দম্ভ এখানেই শেষ নয়। কিছুদিন আগে বগুড়ার কিছু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন এক সাংবাদিক। আর সেই মামলার মূল কারণ ছিল— মীর শাহে আলমকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা।
আওয়ামী লীগের দুর্বলতা গোপালগঞ্জ, বিএনপির বগুড়া আর জাতীয় পার্টির রংপুর। সাবেক এক ইউপি চেয়ারম্যান বর্তমানে যিনি প্রতিমন্ত্রী, সেই এক মীর শাহে আলম একা যা দেখাচ্ছেন, তাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বগুড়া এবং এর আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে দেশবাসীকে নতুন করে ভাবতে হবে।
বগুড়ার দই বিখ্যাত— আগে সবাই বলত; এখন কি বলবে দইয়ের পাশাপাশি মীর শাহে আলমের জন্যেও বগুড়া বিখ্যাত? মাত্র চার মাসে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রীর ক্ষমতা কী জিনিস! শিবগঞ্জবাসী নিশ্চয়ই তাঁকে নিয়ে গর্বিত! প্রধানমন্ত্রীও নিশ্চয়ই গর্ব বোধ করছেন ‘তাঁর লোক’ মীর শাহে আলমের জন্য!
মাত্র চার মাসের সরকারে আর কত “Prime Minister’s men” আছে দেশে?
