অনন্দ্রিতা বাখরা
আপাতত দৃষ্টিতে দেকতে গেলে মনে হইবো বিএনপি ক্ষমতায় বইসা আছে, কিন্তু প্রশাসনের প্রত্যেকটা কাঠামো, আইন-আদালত, অর্থনীতি আর ব্যবসা-বাণিজ্য—সবকিছুই এহন জামাতের দখলে।
যারা পক্ত বিএনপি করে, তারা এইগুলা উদ্ধার করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু পরপর তিনবার ভয়ংকরভাবে পরাজিত হইয়া পুরা ব্লান্ডার কইরা ফালাইছে।
আসুন বিষয়টা আরও ডিটেইলসে দেকি।
প্রথমে আসি ইসলামী ব্যাংকের প্রসঙ্গে। ইউনুস ক্ষমতা দখলের পর পরই জামাত ইসলামী ব্যাংক আর তার যত অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আছে, সব দখল কইরা নেয়। প্রায় ১৫টা ব্যাংক, যেগুলো এস আলমের আন্ডারে ছিল—সব তাদের কবজায়।
বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার দুই মাসের মাথায় সেটা দখল করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু সঠিক রাজনৈতিক পদক্ষেপ না নিয়া জোর কইরা দখল করার চেষ্টা চালায়।
এইজন্য জামাতের যত লোক ছিল, সবগুলারে পরিচালনা পর্ষদ থেইকা সরাইয়া সেখানে বিএনপির লোক বসায়।
এইখানেই বাঁধে বিপত্তি! জামাত যেভাবে স্মার্টলি ব্যাংকটা দখল করছিল, বিএনপি সেভাবে পারে নাই। জামাত গত দুই বছরে ইউনুসের আমলে আর আওয়ামী লীগের আমলে নিয়োগ পাওয়া ২৫ হাজারের অধিক কর্মচারীদের সরাইয়া নিজেদের লোক বসাইয়া রাখছিল।
শুধুমাত্র ইসলামী ব্যাংকেই এই সংখ্যা ১১ হাজার, বাকি অন্যান্য ব্যাংক মিলাইলে তো আরও কত! বিএনপি সেই লোকগুলারে না সরাইয়া শুধু পরিচালনা পর্ষদ দখল করছিল। হয়তো পরবর্তীতে সরানোর ইচ্ছা ছিল, কিন্তু জামাত তা বুঝতে পইড়া ভয়ংকর আন্দোলন গড়ে তোলে।
যেমন, জামাত মাইন্ডের যেসব গ্রাহক আছে, তাদের সাথে জামাত-ই-ইসলামীর সাংগঠনিক কানেকশন আছে, যেটা বিএনপির নাই। জামাত সেইসব গ্রাহকদের নির্দেশ দেয় ইসলামী ব্যাংক থেইকা টাকা তুইলা ফেলতে। তাদের এক কথাতেই জামাত মাইন্ডের গ্রাহকরা প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে ৪ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন কইরা ফালায়। এরপরই শুরু হয় ব্যাংকে তারল্য সংকট।
একবার ভাবুন, বিএনপি যদি তার সমর্থক গ্রাহকদের বলত টাকা তুইলা ফেলতে, তারা কি শুনত? জীবনেও শুনত না! এইখানেই জামাতের সাথে অন্য দলের পার্থক্য।
যাই হোক, এই তারল্য সংকট শুরু হওয়ার সাথে সাথে বিএনপি এক ধরনের ভয়ের মধ্যে পইড়া যায়। তখন তারা বাংলাদেশ ব্যাংক আর অন্যান্য ব্যাংক থেইকা লোন নিয়া ব্যাংক সচল রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু পরের দিনই আরও ৪ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়।
এভাবে চলতাছিল, আর পাশাপাশি আন্দোলনও চলতাছিল। এমনকি আন্দোলনে ভুয়া গ্রাহক সাজাইয়া যাদের আনা হইছিল, সেই বিষয়টাও বিএনপি সঠিকভাবে রুখে দিতে পারে নাই, এক্সপোজও করতে পারে নাই। সোশ্যাল মিডিয়ায় যতটুকু এক্সপোজ দেখছেন, তার অধিকাংশ করছে আওয়ামী লীগের লোকজন। বিএনপির এমন কোনো ইনফ্লুয়েন্সার নাই যারা এই ভুয়া গ্রাহকদের বিরুদ্ধে কোনো ন্যারেটিভ দাঁড় করাইতে পারছে।
রাজনীতি এখন পুরাই ন্যারেটিভ আর স্লোগানের ওপর খাড়া হইয়া আছে! বিএনপির বহু পিছনে দাঁড়িয়ে।
জামাত-ই-ইসলামী যেমন একদিনের ঘোষণায় সারা বাংলাদেশ থেইকা কর্মী-সমর্থকদের হাজির করতে পারে, বিএনপি তা পারে না। জামাতের একটা ভালো দিক হইলো, তারা তাদের সমর্থকদের যেকোনো জায়গায় আন্দোলনের জন্য জড়ো করতে পারে আর দেখাতে পারে যে সবাই তাদের সাথে আছে।
টানা ছয় দিনের আন্দোলনে বিএনপি দিশেহারা হইয়া যায়। তখনই তাদের পরাজয় অলরেডি হইয়া গেছিল। যদি পরাজয় মেনে না নিত, তাহলে আরও বিপদে পড়ত। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক থেইকা আবার লোন নিতে হতো, আর টাকা উত্তোলন চলতেই থাকত।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক বিএনপির নিয়োগ দেওয়া পরিচালনা পর্ষদের সবাইকে লাথি মাইরা বিদায় করে দেয়। আর জামাতের পছন্দের লোকজন সেখানে বসানো হয়। এটা ছিল বিএনপির প্রথম বড় ব্লান্ডার।
এখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক এবার আগুন বাংলাদেশ ব্যাংকে যাদেরকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তারা কোন মাইন্ডেড। যদি ওখানে গভর্নরকে জোর করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে কিন্তু বাকি সিদ্ধান্ত নেওয়ার লোকজন সবাই জামাত সমর্থক। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়ে জামাত আর কোন মাথা ব্যাথা করে নাই কারণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার লোক জামাতের।
এবার আসি আদ-দ্বীন হাসপাতালের প্রসঙ্গে। এখানে কার্বন ডাই-অক্সাইড আর অক্সিজেন সাপ্লাই না থাকার কারণে শিশু মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
বিএনপি এই ইস্যু নিয়া অনেক বড় স্ট্যান্ড নেয়। ইসলামী ব্যাংকের পরাজয়ের রেশও ছিল তখন। যখন কেউ পরাজিত হয়, তখন সামান্য সুযোগ পাইলেই বড় কিছু করতে চায়।
তড়িঘড়ি কইরা লাইসেন্স বাতিল কইরা ফেলে।
কিন্তু জামাতের আন্দোলনকারী আর সোশ্যাল মিডিয়া টিম আগে থেইকাই রেডি ছিল। তাদের ইনফ্লুয়েন্সারগুলারে ট্যাকেল দেওয়ার মতো বিএনপিতে একজনও নাই।
বিএনপির লোকজন বাইরে চাঁদাবাজি আর মাটি বিক্রি নিয়া ব্যস্ত। সোশ্যাল মিডিয়ায় যেসব বিষয় এক্সপোজ হইছে, ভালো কইরা দেকুন—অধিকাংশই করছে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা। কারণ জামাত আর আওয়ামী লীগের কমন শত্রু এক।
যাই হোক, এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তের পর আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলন দেইখা স্বাস্থ্যমন্ত্রী আবার বলে, “তারা টাকা নিয়া আমার পেছনে ঘুরতাছিল যাতে আমি লাইসেন্স বাতিল না করি।”
এটা মিথ্যা বয়ান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলনে কয়, “আমি আপনাকে ১ হাজার কোটি টাকা দিতে চেয়েছিলাম—তার স্বপক্ষে প্রমাণ হাজির করেন!”
স্বাস্থ্যমন্ত্রী কিন্তু এর কোনো পাল্টা জবাব দিতে পারে নাই। উলটা সুর নরম কইরা বলে, “আমরা সব ব্রাঞ্চ বাতিল করি নাই, শুধু ওই ব্রাঞ্চটা বাতিল করেছি।”
আরে মিয়া, লাইসেন্স বাতিল করলে তো সব ব্রাঞ্চও বাতিল হইয়া যায়! এটা কি জানেন না।
কি মূর্খের মতো কথা! এই মূর্খতা জামাত সহজেই কাজে লাগায় আর বিএনপি নাস্তানাবুদ হইয়া যায়।
এখানেও বিএনপি একটা বড় রকম ব্লান্ডার করছে।
আরেকটা বিষয় বলি, যেটা শুরুতে বলছিলাম—আপাতত দৃষ্টিতে মনে হয় বিএনপি ক্ষমতা চালাচ্ছে, কিন্তু প্রশাসনের প্রত্যেকটা কাঠামোতে জামাতের লোক।
জামাত যেখানে কোনো কথা কয় না, বুঝবেন সেখানে সিদ্ধান্ত নেয় জামাতের লোকজনই। যেমন আইন বিভাগ আর বিচার বিভাগ। এখানকার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ জামাতের হাতে।
একইভাবে পুলিশ প্রশাসনেও ৯০ শতাংশ জামাতপন্থী। কাউকে বদলি করলে যদি জামাত প্রতিবাদ করে, বুঝবেন ঝামেলা শুরু হইছে। আর যেখানে চুপ থাকে, বুঝবেন সেখানে জামাতের লোকজনই আসল সিদ্ধান্ত নেয়।
একইভাবে সেনাবাহিনীতেও প্রতিদিনের কর্মকাণ্ডে বোঝা যায়, নীতি-নির্ধারণের জায়গায় জামাত মতাদর্শের লোকজনই প্রভাবশালী। বিএনপির লোকজন থাকতে পারে, কিন্তু তাদের সমর্থনে কিছু যায় আসে না।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে—এত কিছু দখলে থাকলে তারা ক্ষমতায় আসতে পারল না কেন?
তাদের আসলে এবার ক্ষমতায় আসার ইচ্ছা ছিল না। এখন আসলে সহজেই পইড়া যেত। জামাত এখন তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতাছে, যেটা ভবিষ্যতে তাদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতায় নিয়ে আসবে। ৩০০ আসনের মধ্যে তারা ২৮০-২৮৫ আসন পাবে যদি আওয়ামী লীগ মাঠের বাইরে থাকে।
কিন্তু আওয়ামী লীগ আবার মাঠে ফিরলে জামাত একুল-ওকুল সব হারাইবে। এই কারণেই তারা এখন ধৈর্য ধইরা আছে।
আরেকটা বিষয়, বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মীর বাসার বউ পর্যন্ত জামাত সমর্থন করে! আপনি টার্গেট কইরা কোনো নেতার ফেসবুক প্রোফাইল, ছেলে-মেয়েদের আইডি নজরদারি করেন—আমার কথা হান্ড্রেড পার্সেন্ট মিলে যাবে।
ইউনিভার্সিটি আর কলেজগুলাও জামাত-শিবিরের দখলে। আপনি কোনো কলেজে ৫০ জন ছাত্রদল কর্মী খুঁজে বের করলে, তার মধ্যে ২০ জনই পাবেন শিবিরের লোক। তারা ক্ষমতার ছায়ায় থাকার জন্য ছাত্রদলের সাথে আছে, কিন্তু শিবিরের প্রোগ্রামে সবার আগে দৌড়ায়!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচন দেখলেই বুঝবেন, ছাত্রদলের থেকে বাম দলও বেশি ভোট পাইছিল। কারণ ছাত্রদলের সভা-মিছিলে লোক আসে টাকা দিয়ে, কিন্তু জামাত-শিবিরের লোকজন ডেডিকেটেড।
সবশেষে বলি, জামাত-বিএনপির বিরোধ এখন সাজানো। জামাত বিএনপিকে কতটুকু গালি দেবে, সেটা বিএনপি আগে থেকেই জানে। নাহিদ ইসলাম কি বলবে, পাটোয়ারি কি বলবে—সবই বিএনপির লোক আগে থেইকা জানে!
এবং এই সাজানো বিরোধে লাভবান হচ্ছে জামাত এবং বিএনপি ধীরে ধীরে যখন কিছুটা বুঝতে পারতেছে কোন বিষয়ে কথা বললেই সাথে সাথে এতদিন পরে সেটা তাদের পরাজয় নিয়ে আসছে। জামাতের বিরুদ্ধে একটাই স্ট্যান্ড নিয়েও তারা জিততে পারবে না দুইদিন পরে পরাজিত হবে।
বিষয়টা এখন আপনার কাছে অবাক লাগলেও এটা ধীরে ধীরে দেখতে পারবেন বিএনপির জ্বালানি থাকুক তারা ধীরে ধীরে কিভাবে জামাতে মিশে যায় দেখবেন। জামাতের কাছে শক্তিশালী অস্ত্র হচ্ছে সেনাবাহিনী পুলিশ বিচার বিভাগ এবং অর্থ বিভাগ। কিন্তু তাদের বয়স বেশি দিন হয়নি দুই তিন বছর হয়েছে তো এখনো পাকাপোক্তভাবে শক্ত করে দাঁড়াতে পারে নাই যখন দাঁড়িয়ে যাবে তখন দেখবেন অবস্থা।
জামাতের একটা নেত্রী বলছিলেন না যে তারা চাইলে ১৫ দিনের ভিতরে বিএনপিকে ক্ষমতা থেকে ঘটিয়ে দিতে পারে আপনারা বিষয়টা নিয়ে হাসাহাসি করেছেন আমি কিন্তু হাসাহাসি করি নাই আমি উনাকে সমর্থন করেছি উনাদের এই শক্তি আছে। জামাতের কাছে বিএনপি কোন কিছুই না। বিএনপি নেতাকর্মীরা জানেই না তাদের বাসার বউ জামাত করে। (ফেইসবুক থেকে)
