কবির য়াহমদ
শাহজালাল ও শাহপরানের মাজারের ডেগ আর দানবাক্সকে যদি কেউ স্রেফ টাকাপয়সা কিংবা নানা রূপের সম্পদ জমা নেওয়ার একেকটা কাঠের বা লোহার বাক্স ভাবেন, তবে তিনি বড় ভুল করবেন। ওটা শত শত বছর ধরে চলে আসা এক ঐতিহ্য, যেখানে যুগে যুগে জমা হচ্ছিল ভক্ত-আশেকানসহ নানা শ্রেণি-পেশা, এমনকি নানা ধর্মের মানুষের নিভৃত আকুতি, মানত আর বিন্দু বিন্দু হয়ে ঝরে পড়া চোখের পানি।
এই সিলেটকে আমরা অনেকেই ‘আধ্যাত্মিক রাজধানী’ বলে থাকি। এর একমাত্র কারণ— বাবা শাহজালাল ও শাহপরানের পুণ্যময় উপস্থিতি এবং তাঁদের মাজার। এই সিলেটের আকাশ-বাতাস সুফি-প্রেমের এক অলৌকিক দরবার। এ মাটিতে মিশে আছে শাহজালালের সঙ্গে আসা ৩৬০ আউলিয়ার স্মৃতি। শাহজালাল-শাহপরানের পুণ্যভূমি হিসেবে পরিচিত সেই সিলেটের আধ্যাত্মিক চেতনার ওপর আজ সরকারি প্রশাসনযন্ত্রের হস্তক্ষেপ দেখছি, তার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
সিলেটের ঐতিহ্যবাহী হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের সেই ঐতিহাসিক ডেগ আর দানবাক্সে আজ ঝুলছে জেলা প্রশাসনের তালা। সেখানে বসানো হয়েছে সরকারি দানবাক্স। সিলেটের প্রশাসন এখন থেকে মাজারে মানুষের দেওয়া মানতের টাকার হিসাব কষবে, খতিয়ান মেলাবে এবং এসি রুমে বসে তারা নির্ধারণ করবে কোথায় এই টাকা ব্যয় হবে।
অথচ মাজারের ওই বাক্সগুলো তো স্রেফ টাকা জমানোর কোনো উপকরণ ছিল না; ওগুলো ছিল দূর-দূরান্ত থেকে আসা কোনো মায়ের বুকভাঙা কান্না, কোনো এক অসহায় পিতার সন্তানের রোগমুক্তির আকুল আর্তি, কিংবা কোনো আশেকানের স্বেচ্ছায়, শ্রদ্ধায় সঁপে দেওয়া ভালোবাসার দলিল। এখন থেকে সেই চোখের জল আর বিশ্বাসের হিসাব কষবে মানুষের আবেগ থেকে যোজন যোজন দূরে থাকা সরকার আর প্রশাসন! তাদের ফাইল-কলমে সুফি-আধ্যাত্মিকতা আজ আর কোনো মরমি বিষয় নয়, এটি এখন স্রেফ এক সরকারি ‘টাকার খনি’, নিছক এক শুষ্ক-রাজস্বের খতিয়ান।
কেবল শাহজালালের মাজারই নয়, একই কায়দায় শাহপরানের দরবারেও পড়েছে প্রশাসনের এই নজরদারি। মানুষের আদি ও অকৃত্রিম ভক্তিকে এখন তারা পরিমাপ করবে টাকার অঙ্কে। যে মাজারগুলোকে কেন্দ্র করে শত বছর ধরে সুফি-আশেকানদের মনস্তাত্ত্বিক মেলা বসত, হৃদয়ের লেনদেন হতো, তা এখন বন্দি হবে ফাইলের লাল ফিতায়। ওলিদের দরবারে মানুষের অন্তরের বিশ্বাসের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে সরকারি তহবিলের খতিয়ান। এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে!
অথচ সুফিবাদের মূল কথাই তো হলো প্রেম আর মুক্তি, যা কোনো জাগতিক আইনের তোয়াক্কা করে না। সুফি-সাধকেরা রাজ্য ছেড়েছেন, রাজকীয় বৈভব ছেড়েছেন মানুষের হৃদয়ে খোদার প্রেম জাগাতে। কিন্তু যখন জেলা প্রশাসন সেই প্রেমের আঙিনায় নিজেদের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণযন্ত্র বসায়, তখন বুঝতে আর বাকি থাকে না—আধ্যাত্মিকতা ও সুফিবাদের দিন শেষে এখন চলবে কেবলই ক্ষমতা ও আমলাতান্ত্রিকতার নগ্ন চর্চা।
সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) সারওয়ার আলম শাহজালাল ও শাহপরানের মাজারের শত বছরের অক্ষুণ্ণ ঐতিহ্যের মূলে কুঠারাঘাত করেছেন। মানুষের বিশ্বাস আর শ্রদ্ধার এমন পবিত্রতম জায়গায় হাত দেওয়ার এই দুঃসাহসী কাজটি তিনি করে ফেললেন কোনো বাধা ছাড়াই। ফলে আজ দরবার প্রাঙ্গণে ভক্তিভরে জিকির করতে আসা জীর্ণশীর্ণ সাধারণ ভক্তদের চেয়ে বন্দুক আর খাকি পোশাকের সরকারি বাহিনীর আনাগোনা বেশি। ওলিদের যে আঙিনা ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত আশ্রয়ের জায়গা, তা আজ প্রশাসনের কঠোর নিয়ন্ত্রণে এক অবরুদ্ধ দুর্গ।
এই তো কিছুদিন আগেও যখন দেশের নানা প্রান্তে সুফিদের মাজারগুলোতে একের পর এক হামলা হলো, মাজার ভাঙা হলো, আগুন দেওয়া হলো, তখন কিন্তু এই প্রশাসন বা এই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাজার রক্ষায় কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি। তখন অসহায় ভক্ত-মুরিদেরা মার খেয়েছে, ওলিদের আস্তানা ধুলোয় মিশেছে, কবর থেকে লাশ তুলে এনে আগুনে পুড়িয়েছে; আর প্রশাসন দূর থেকে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখেছে। সেই রক্ত ও অশ্রুর প্রথম অধ্যায় পার হয়ে ভক্তদের ভালোবাসায় যে মাজারগুলো এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে এখন এই সরকারি বাহিনী হাজির হয়েছে অন্য রূপে, অন্য পোশাকে—দানবাক্সের দখল নিতে!
শাহজালাল ও শাহপরানের মাজারের মূল দানবাক্স সিলগালা করে, সরকারি বন্দুকের পাহারায় রেখে এখন কি তবে সুফি সংস্কৃতির ওপর ‘দ্বিতীয় পর্যায়ের ধ্বংসযজ্ঞ’ শুরু হলো? মাজারের দানবাক্স কেড়ে নিয়ে সেখানে সুলতানি আমলের জমিদারের মতো সিন্দুক বসিয়ে কি ভক্তদের অন্তরের সেই আকুল ভক্তি পাওয়া যাবে?
ওলিদের দরবার টাকার কাঙাল নয়, হৃদয়ের কাঙাল—এই ধ্রুব সত্যটি এই আমলারা বুঝবে না। তবে তাদের ক্ষমতার দম্ভ এখানেও চলবে। এই শাহজালাল-শাহপরানের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক দানবাক্স ও ডেগের নয়; তাঁদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক সম্পূর্ণ আত্মিক। এই আত্মিক সম্পর্ককে আমলাদের লাল ফিতায় করায়ত্ত করলেও কি শেষ রক্ষা পাওয়া সম্ভব? ইতিহাস বলে— না।
শাহজালাল কেবল কোনো সাধারণ ধর্মীয় প্রচারক হিসেবে এই জনপদে পরিচিতি পাননি। এই মাজারকে কেন্দ্র করে যে আধ্যাত্মিক গীত রচনা ও পরিবেশনার ইতিহাস, তা-ও তো কম দিনের নয়। শাহ আবদুল করিম বলেন, দুর্বিন শাহ বলেন, কিংবা গিয়াসউদ্দিন আহমদের ঐতিহাসিক গান—“সিলেট পরথম আজান ধ্বনি বাবায় দিয়াছে/ তোরা শোন সেই আজান ধ্বনি আইজো হইতাছে/ যেই ধ্বনিতে পাথর গইলা পানি হইয়াছে…” গানগুলোর মধ্যে ছিল এবং এখনও প্রবাহিত হচ্ছে আদি ও অকৃত্রিম আধ্যাত্মিকতা। একে কীভাবে অস্বীকার করবেন মহাশয়?
লোককবি নবীন সিদ্দেক আলীর একটা গান— “লালে লাল, লালে লাল, লালে লাল, লালে লাল/ কুদরতি কামাল তুমি বাবা শাহজালাল…”; বাবা শাহজালালের এই যে ‘কুদরতি কামাল’, আজ কিন্তু প্রশাসনের হাত পড়েছে সেখানেও! কিন্তু প্রশাসন ভুলে যাচ্ছে, ওলিদের দরবারে লোহার তালা মারা গেলেও মানুষের অন্তরের মরমি টানে কোনোদিন তালা মারা যায় না।
মাজারে-মাজারে যারা যায়নি, যায় না, যাবেও না; তারাই আজ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে মাজার কীভাবে চলবে? মাজারে যারা এক-পয়সাও দান করেনি, করে না, করবেও না, তারাই অস্থির মাজারের টাকার হিসাবে।
