সুষুপ্ত পাঠক
তুরাগ নদীতে আওয়ামী লীগ কর্মীদের উপর একটা ‘গণহত্যা’, রাতের আঁধারে শহরে কলেমার পতাকায় ছেঁয়ে যাওয়া এবং সলিমুল্লাহ খানকে নিয়ে বিতর্ক- এই তিনটি ঘটনা আলাদা আলাদা প্রসঙ্গ হলেও একটা জায়গায় খুব মিল। কলেমার পতাকা ও সলিমুল্লাহ খানকে নিয়ে ডানপন্থী মহলে দ্বিমত থাকলেও আওয়ামী লীগ কর্মীদের গণহত্যার বিষয়ে তারা সবাই নিশ্চুপ!
আওয়ামী লীগ আমলে চরম ডানপন্থী বুয়েটের আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে মেরে ফেললে আওয়ামী লীগ ও লিবারেলরা সবাই দলমতের উর্ধে উঠে এই ঘটনার প্রতিবাদ করে। টকশোতে এই ঘরনার আলোচকরা, এমনকি সাবেক ছাত্রলীগ লীগ নেতারা পর্যন্ত নিন্দা করেন। বিশ্বজিত হত্যার সময়ও একই ঘটনা ঘটে। দুটি ঘটনার বিচার আওয়ামী লীগ সরকার করেছিল। দোষীদের রায় কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু তুরাগ নদীতে ৭ জন আওয়ামী লীগ কর্মীকে মিছিল করার ‘অপরাধে’ বিএনপির নেতার নেতৃত্বে হত্যা করে নদীতে লাশ গুম করার অভিযোগ নিয়ে সমস্ত বাংলাদেশের মিডিয়ার মুখ বন্ধ। ২৪ এর জুলাই হচ্ছে ডানপন্থীদের বিজয়। ফলে তারা নিজেরা বিভিন্ন রাজনীতিতে আলাদা হলেও ডানপন্থী প্লাটফর্মে ঐক্যে অটল। আওয়ামী লীগ আমলে ডান ও বাম সকলেই কথা বলত। এখন আওয়ামী লীগ ও লিবারেলরা নিষিদ্ধ। তুরাগে ৭ জন আওয়ামী লীগ কর্মীর লাশ ভেসে এলেও ডানদের বিবেক ভেসে উঠবে না। কারণ তারা তাদের আদর্শে আপোষহীন।
সাধারণভাবে ডানপন্থী বললে লোকজন দাড়ি টুপিওয়ালা ইসলামী দলগুলোকে বুঝে। বিষয়টা তা নয়। ডানপন্থী নাস্তিকরাও হয়। যেমন মুসলিম জাতীয়তাবাদ একটা ডানপন্থা। বাংলাদেশের বহু নাস্তিক ও বামপন্থী মুসলিম জাতীয়তাবাদী ছিলেন। আহমদ ছফা একজন ডানপন্থী ছিলেন। তার জাতীয়তাবাদ ছিল ‘বাঙালি মুসলমান জাতীয়তাবাদ’। সলিমুল্লাহ খানকে কেউ কোনদিন নামাজ পড়তে দেখেছে? ডক্টর ইনুস, বদিউল আলম মজুমদার বা ফটো শহিদুলকে দেখেছেন প্যাক্টিসিং মুসলমানের জীবন কাটাতে? এরা সবাই ডানপন্থী। সলিমুল্লাহ রাইসু এরা সবাই ডানপন্থী। শহীদুল জহিরকে নিয়ে ডানপন্থীরাও দ্বিধা বিভক্ত। কারণ শহীদুল জহিরের ডানপন্থী ভক্ত ছিল। তার কারণ শহীদুল জহিরের সাহিত্য ভাষা প্রমিত ছিল না। এটাকে তারা কোলকাতার ‘দাদাদের’ থেকে বেরিয়ে আসার বা ভারতীয় আধিপত্যের ভাষা, বা কোলকাতার হিন্দু লেখকদের ভাষা থেকে বাঙালি মুসলমানের ভাষা- এই রকম নানা তড়িকায় তারা দেখে। ডানপন্থীদেরও সলিমুল্লাহ এ্যালার্জি আছে। ২৪ এর ডানপন্থী ছোটদের ছাপড়ি বুদ্ধিজীবী রেজাউল করিম রনি সলিমুল্লাহ খানকে জেলে থাকার কথা বলেছেন কারণ শাহবাগের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় নাকি সেই আন্দোলনের পক্ষে সলিমুল্লাহ ছিল। তবে ডানপন্থীদের ৯৯ ভাগ সলিমুল্লাহ খানকে সমর্থন করেছে। যেমন কলেমার পতাকা ইস্যুতে ৯৯ ভাগ ডানপন্থী ঘটনাটিকে ভারত-ইসরায়েলের চক্রান্ত বলে জাস্টিফাই করলেও এক পার্সেন্ট ঘটনার সমালোচনা করে দেশকে জঙ্গিদের হাতে তুলে দেয়ার আশংকা করছে। এদের জঙ্গি বিরোধীতা আর লিবারেল সেক্যুলারদের জঙ্গি বিরোধীতা এক না। ডানপন্থীদের এক অংশ ব্যক্তিগত জীবনে সেক্যুলার জীবন কাটায়। যেমন প্রেম করা থেকে লিভ টুগেদার, মদ্য পান থেকে ইসলামের চোখে হারাম সব কিছুতে তাদের বাসনা আর লালসা চরম। সেক্যুলারিজমের প্রধান দাবী হচ্ছে ব্যক্তির স্বাধীনতা। তারা ৭২ এর সংবিধানের বিরোধীতা করে সেটা সেক্যুলারপন্থী ছিল বলে কিন্তু নিজেরাই কাটায় সেক্যুলার জীবন। এই শ্রেণীর ডানপন্থীরা কিছুতে দেশটা মোল্লাদের হাতে চলে যাক চায় না। তারা বাঙালি সংস্কৃতির বিরোধীতা করে, সেটাকে ভারতীয় হেজিমিনি বললেও তাদের বান্ধবীরা বৈশাখে শাড়ি পরে চুলে ফুল দিলে তাদের ডেটিং করতে ভালো লাগে। ফলে মোল্লার শাসনে তাদেরও সমস্যা। তারা মুসলমান আধিপত্য চায়, হিন্দুদের ঘৃণা করে যা ভারতকে ঘৃণা করার পোশাকী একটা রাজনীতি দেখায় গোপন করতে। এরা কখনো কখনো এনায়েত আব্বাসীদের মত মৌলবাদীদের কাছে ‘কাফের’ ফতোয়াও পায়। এরকম ফতোয়া পেলে তারা শ্লাঘা অনুভব করে। নিজেকে গোপনে সালমান রুশদী কল্পনা করে। যদিও সালমন রুশদীকে তারা পছন্দ করে না।
ব্যক্তিগত ধর্ম বিশ্বাসে মৌলবাদী আর রাজনৈতিক ডানপন্থী বেশ আলাদা। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ডানপন্থী হিসেবে কিছু হিন্দুকে পাবেন যারা রাজনৈতিকভাবে ‘মুসলিম ডানপন্থী’। এরা ধর্মত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেনি। করবেও না। এদের রাজনীতি ও সংস্কৃতি মুসলিম ডানপন্থা। সাধারণত বামপন্থা ও মুসলিম লীগের মিলনে যে শংকর জাতের জন্ম নেয় এটা সেটাই। মানে বাড়িতে বামপন্থা ছিল এবং কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, কালচারাল সোসাইটিতে, পাঠচক্রে মুসলিম বন্ধুদের সহজাত মুসলিম লীগ আইডলজির সংস্পর্শে এই শংকর জাতের রাজনৈতিক মানসিকতা তৈরি হয়। ২৪ পরবর্তী বেশ কিছু হিন্দু জেনজিকে আপনারা দেখেছেন।
মনে রাখবেন, বৃহত সংকটে ডানপন্থীরা সবাই এক হয়ে যাবে। তুরাগ ঘটনাতেই দেখতে পাচ্ছেন। এটা বৃহত ঘটনা নয়। তাতেই তারা সবাই মুখ বন্ধ করে রেখেছে। কিন্তু আপনারা লিবারেল সেক্যুলাররা কখনোই এক হবেন না। কারণ নৈতিকতা। সেক্যুলার হতে গেলে নৈতিক ও মানবিক হতেই হয়। কিন্তু একটা কথা তো মাথায় রাখতে হবে। অন্তত রাজনৈতিকভাবে সেক্যুলার ও মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে আপনারা এক হতেই পারেন। সেই ঐক্যটা তো দেখার আশা করতেই পারি।
