রাজিক হাসান
১৯১৪ সালে, আমেরিকা বিশ্বের কাছে ঋণী ছিল। ১৯১৯ সালের মধ্যে, বিশ্ব উল্টো আমেরিকার কাছে ঋণী হয়ে গেল।
কোনো আক্রমণ নয়, কোনো অভ্যুত্থান নয়, কোনো জাহাজের ওপর কোন চুক্তি স্বাক্ষরও নয়। মাত্র চার বছরের ব্যবধান। এটি এমন এক যুদ্ধ, যার সঙ্গে মানুষ সাধারণত অর্থের কোনো সম্পর্কই খুঁজে পায় না। এটিই সেই যুদ্ধ, যা আমেরিকাকে একজন ঋণগ্রহীতা থেকে পুরো পৃথিবীর ব্যাংকারে পরিণত করেছিল।
কিভাবে তা সম্ভব হল?
১৯১৪ সাল। যদি কেউ পৃথিবীর যেকোনো মানুষকে জিজ্ঞেস করতেন যে বৈশ্বিক অর্থায়ন কারা নিয়ন্ত্রণ করে, তবে তারা একটাই উত্তর দিত: লন্ডন। ব্রিটিশ পাউন্ড ছিল বিশ্বের রিজার্ভ কারেন্সি। প্রতিটি বড় ব্যবসা, প্রতিটি ঋণ, প্রতিটি ঔপনিবেশিক লেনদেন সবকিছুই লন্ডনের মাধ্যমে সম্পন্ন হতো।
নিউ ইয়র্ক? নিউ ইয়র্ক ছিল কেবল একটি আঞ্চলিক খেলোয়াড়। বড় খেলোয়াড় অবশ্যই, কিন্তু যখন আমেরিকান কোম্পানিগুলোর বড় অঙ্কের পুঁজির প্রয়োজন হতো, তখন তারা টুপি হাতে ইউরোপীয় ব্যাংকারদের কাছেই যেত।
১৯১৪ সালে আমেরিকা ছিল একটি ঋণগ্রস্ত দেশ। আমেরিকান রেলপথ, আমেরিকান কারখানা এবং আমেরিকান জমিতে বিনিয়োগ করা মূলত ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় অর্থ মিলিয়ে, সে সময় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেনা ছিল প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার।
এরপর, ১৯১৪ সালের গ্রীষ্মকালে ইউরোপ নিজের গায়ে নিজেই আগুন লাগিয়ে দিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো, আর এখানে একটা বিষয় বোঝা দরকার: এটি কেবল সৈন্য ও পরিখার যুদ্ধ ছিল না। এটি এমন এক যুদ্ধ ছিল যার জন্য অর্থ জোগাতে হতো। আর যে দেশগুলো এই যুদ্ধে লড়ছিল ব্রিটেন, ফ্রান্স, ভারত, রাশিয়া।
তারা তখন মানব ইতিহাসের যেকোনো যুদ্ধের চেয়েও দ্রুত গতিতে নগদ অর্থ শেষ করে ফেলছিল। তাহলে তারা কার দিকে হাত বাড়াল? একে অপরের দিকে নয়। তারা আটলান্টিকের ওপারে এমন একটি বড় অর্থনীতির দিকে তাকাল যা তখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রক্তাক্ত হয়ে পড়েনি। আমেরিকা এখানেই বিষয়টি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
আর এখানেই এই গল্পের বেশিরভাগ প্রচলিত বর্ণনা ভুল করে থাকে। বেশিরভাগ মানুষ মনে করে আমেরিকা কেবল সহানুভূতি বা বন্ধুত্বের খাতিরে মিত্রপক্ষকে সাহায্য করেছিল। বাস্তবতা ছিল অনেক বেশি রূঢ় এবং অনেক বেশি চতুর। কিন্তু এখানেই ঘটনাটি একটি বড় মোড় নেয়: জে.পি. মরগ্যান অ্যান্ড কোম্পানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ ও ফরাসি সরকারের অফিশিয়াল ক্রয় এজেন্ট হিসেবে নিযুক্ত হয়। বিষয়টি একটু গভীরভাবে ভেবে দেখুন। একটি ব্যক্তিগত আমেরিকান ব্যাংক দুটি সাম্রাজ্যের যুদ্ধ-ক্রয়ের বাজেট পরিচালনা করছিল।
মরগ্যানের ফার্ম আর্টিলারি শেল, গম, ইস্পাত, ঘোড়া মিত্রপক্ষের যা কিছু প্রয়োজন ছিল তার অর্ডার দিত। সেই সাথে আমেরিকান বাজারে ছাড়া বিশাল ঋণের মাধ্যমে এই সমস্ত কিছুর অর্থায়ন করত। ১৯১৭ সালের মধ্যে, মরগ্যান মিত্রপক্ষীয় শক্তিগুলোর জন্য ৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের ঋণ ও ক্রয়ের ব্যবস্থা করে ফেলেছিল।
এখন, শুরুতে আমেরিকা আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ ছিল। উড্রো উইলসন বারবার বলছিলেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো পক্ষ নেবে না। কিন্তু অর্থ কখনো নিরপেক্ষ থাকে না। আমেরিকা ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে যে প্রতিটি ডলার ধার দিয়েছিল, তা ছিল তাদের বিজয়ের পক্ষে বাজি ধরার মতো। জার্মানি জিতে গেলে সেই টাকা চিরতরে হারিয়ে যেত। সুতরাং, কাগজে-কলমে নিরপেক্ষতা থাকলেও, ভেতরে ভেতরে ছিল গভীর আর্থিক স্বার্থ। পাঠ্যবইগুলো এই অংশটিই এড়িয়ে যায়।
এটি কোনো দাতব্য কাজ ছিল না। এটি ছিল আমেরিকান ইতিহাসের সেরা ব্যবসা।
আসলে কী ঘটছিল ?
ভেবে দেখুন। ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের সোনার রিজার্ভ বিক্রি করে দিচ্ছিল, আমেরিকায় তাদের বিনিয়োগগুলো তুলে নিচ্ছিল এবং কেবল তাদের যুদ্ধের যন্ত্রপাতি সচল রাখার জন্য সুদে ঋণ নিচ্ছিল। এই ধরনের প্রতিটি লেনদেন সম্পদ ও ক্ষমতাকে আটলান্টিক পার করে পশ্চিমের দিকে নিয়ে আসছিল।
১৯১৫ সালের মধ্যে, আমেরিকান কারখানাগুলো তাদের পূর্ণ ক্ষমতায় চলছিল, যে যুদ্ধে তারা নিজেরা অংশও নেয়নি, তার রসদ জোগাতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছিল। বেথলেহেম স্টিল, ডুপন্ট, ফোর্ড এই কোম্পানিগুলো বিপুল ভাগ্য গড়ছিল। কৃষকেরা গমের রেকর্ড দাম পাচ্ছিল কারণ ইউরোপ নিজের খাবার নিজে উৎপাদন করতে পারছিল না। আমেরিকান অর্থনীতি, যা মাত্র কয়েক বছর আগেও নড়বড়ে ছিল, তা এখন পুরোপুরি চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল, যার পুরো অর্থায়ন আসছিল অন্য মানুষের যুদ্ধ থেকে।
এরপর, ১৯১৭ সালে, আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে প্রবেশ করে। আর এখানেই আর্থিক প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি গতি পায়। মার্কিন সরকারের নগদ অর্থের প্রয়োজন ছিল। তাও দ্রুত এবং বিপুল পরিমাণে। তাই তারা এমন একটি কাজ করল যা সাধারণ আমেরিকানদের সঙ্গে তাদের সরকারের সম্পর্ক চিরতরে বদলে দিল: তারা সরাসরি জনগণের কাছে ওয়ার বন্ড বা যুদ্ধ বন্ড বিক্রি করতে শুরু করল। লিবার্টি বন্ড। সব জায়গায় পোস্টার, চলচ্চিত্র তারকাদের প্রচারণা, এমনকি স্কুলের ছেলেমেয়েরাও তাদের পকেট খরচ দিয়ে এগুলো কিনছিল। এটি দেশপ্রেম ছিল বটেই, তবে এটি ছিল দেশের ইতিহাসে চালানো সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ ঋণ নেওয়ার অভিযান।
লিবার্টি বন্ড এবং ভিক্টরি বন্ড মিলিয়ে ২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল। এখানে বেশিরভাগ মানুষ যা খেয়াল করে না তা হলো, এটিই সেই মুহূর্ত যখন সাধারণ আমেরিকানরা তাদের নিজস্ব সরকারের পাওনাদার বা ঋণদাতায় পরিণত হয়েছিল এবং এটি আরও বড় কিছুর ভিত্তি তৈরি করেছিল। এমন এক আর্থিক সংস্কৃতি যেখানে সাধারণ মানুষের ভাগ্য ওয়াল স্ট্রিটের ভাগ্যের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধের পর এই অভ্যাস চলে যায়নি; এটি স্থায়ী রূপ নিয়েছিল।
এদিকে, সমুদ্রের ওপারে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স ঋণে ডুবে যাচ্ছিল এবং এর বেশিরভাগই ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দেনা। ১৯১৮ সালের নভেম্বরে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সময়, সংখ্যাগুলো বিশ্বাস করাই কঠিন ছিল। মিত্রপক্ষীয় শক্তিগুলো যুদ্ধ ঋণ হিসেবে মার্কিন সরকারের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ঋণী ছিল। মরগ্যানের মতো ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে নেওয়া ব্যক্তিগত ঋণগুলো যোগ করলে, আপনি সম্পদের এমন এক স্থানান্তর দেখতে পাবেন যা পুরো বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দিয়েছিল।
যুদ্ধের আগে, বিশ্বের কাছে আমেরিকার দেনা ছিল প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। যুদ্ধের পর, বিশ্ব আমেরিকার কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ঋণী হয়ে পড়ে। এবং আমেরিকা তখন পৃথিবীর মোট স্বর্ণ মজুতের প্রায় ৪০ শতাংশের ওপর বসে ছিল।
এটি আরও একবার লক্ষ্য করুন: ৪০ শতাংশ, একটি দেশ, একটি যুদ্ধ, চার বছর।
লন্ডন রাতারাতি তার সাম্রাজ্য হারায়নি, তবে তারা এমন কিছু হারিয়েছিল যা সমান গুরুত্বপূর্ণ: তাদের আর্থিক ভরকেন্দ্র। ব্রিটিশ ব্যাংকারদের ধীরে ধীরে, যন্ত্রণার সঙ্গে মেনে নিতে হয়েছিল যে তারা আর একাকী বৈশ্বিক অর্থনীতির শর্ত নির্ধারণ করতে পারবে না। পাউন্ড তখনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তবে ডলার আর কোনো ছোট অংশীদার ছিল না। এটি প্রধান অংশীদারে পরিণত হচ্ছিল।
কিন্তু এখান থেকেই গল্পটি আরও একটি অন্ধকার মোড় নেয়, কারণ অর্থ জেতার মানে এই ছিল না যে সবাই তাদের টাকা ফেরত পেয়েছিল। যুদ্ধের পর, মিত্রপক্ষ আশা করেছিল জার্মানি ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে তাদের ঋণ শোধ করবে। ১৯১৯ সালে ভার্সাই চুক্তিতে এই সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছিল।
জার্মানি শাস্তিস্বরূপ কঠিন ক্ষতিপূরণ দেবে, মিত্রপক্ষ সেই অর্থ ব্যবহার করে তাদের আমেরিকান ঋণ শোধ করবে, সবাই সবার পাওনা চুকিয়ে দেবে। কিন্তু জার্মানি তা পরিশোধ করতে পারছিল না। আসলে পারার মতো ছিল না। যে অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়েছিল তা এত বিশাল ছিল যে তা মেটাতে গিয়ে জার্মানির অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। চরম মুদ্রাস্ফীতি, মূল্যহীন মুদ্রায় ভরা ঠেলাগাড়ি এমন এক ক্ষত যা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রয়ে গিয়েছিল এবং অস্ট্রিয়ান বংশোদ্ভূত এক কর্পোরালের উত্থানে সাহায্য করেছিল, যার নাম আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন।
তাই, আমেরিকান ব্যাংকগুলো আবার এগিয়ে এল, এবার ১৯২৪ সালে ‘ডস প্ল্যান’ (Dawes Plan) নামের একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে। জার্মানিকে আমেরিকান ঋণ দেওয়া হলো, যাতে জার্মানি ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে ক্ষতিপূরণ দিতে পারে, আর ব্রিটেন ও ফ্রান্স আমেরিকার যুদ্ধ ঋণ শোধ করতে পারে।
বিষয়টি এক মুহূর্তের জন্য ভেবে দেখুন। আমেরিকান অর্থ জার্মানি, ব্রিটেন ও ফ্রান্স ঘুরে আবার আমেরিকার কাছেই ফিরে আসছিল। একটি আর্থিক গোলকধাঁধা যার প্রতিটি আবর্তনের কেন্দ্রে বসে ছিল নিউ ইয়র্ক।
এটিই সেই মুহূর্ত যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি আঞ্চলিক অর্থনীতি থেকে এমন কিছুতে পরিণত হলো যা বিশ্ব আগে কখনো দেখেনি। এমন একটি দেশ যার ব্যাংক, যার বন্ড, যার মুদ্রা পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি বড় অর্থনীতিকে স্পর্শ করেছিল। আর এটাই ছিল আমাদের চেনা ওয়াল স্ট্রিটের প্রকৃত জন্ম। তারও এক দশক আগে, নিঃশব্দে, যুদ্ধ ঋণ এবং পুনর্গঠন ঋণের মাধ্যমে নিউ ইয়র্ক এমন এক ঠিকানায় পরিণত হয়েছিল, যেখানে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হলে সবাইকে যোগাযোগ করতে হতো।
এর অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে এক অমোঘ ও রূঢ় সত্য। বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার এই আর্থিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার নেপথ্যে কোনো সুরম্য সভাকক্ষের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল না। এটি কোনো একক কুশলী বা প্রজ্ঞাময় নীতির সুফলও ছিল না। বরং, এর পেছনে মূল অনুঘটক ছিল এক মহাদুর্যোগ, বাকি বিশ্ব যখন আত্মঘাতী যুদ্ধে নিজেকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছিল, তখন ভৌগোলিক দূরত্ব, শিল্পসমৃদ্ধি আর প্রবল আর্থিক অনুকূলতার এক মহাসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিল আমেরিকা। তারা কেবল সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝে আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছিল এবং মুক্তহস্তে ঋণ বিলিয়েছিল।
ইতিহাসের পাতায় প্রতিটি সাম্রাজ্যই ধুলো থেকে ওঠার সময় বিশ্বাস করেছে, তাদের এই উত্থান অনিবার্য, চিরন্তন এবং সম্পূর্ণ ন্যায্য। কিন্তু আমেরিকার এই বৈশ্বিক আর্থিক সাম্রাজ্য গড়ে ওঠার ইতিকথা আজ আমাদের এক সুগভীর ও জটিল প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করে, কী ঘটবে তখন, যখন ভবিষ্যতের কোনো এক নতুন শক্তি নিজেকে ঠিক তেমনি এক মহাসন্ধিক্ষণে আবিষ্কার করবে, যেখানে ১৯১৪ সালে দাঁড়িয়ে ছিল আমেরিকা সম্পূর্ণ অক্ষত, ঋণমুক্ত এবং নীরবে এক নতুন ভোরের অপেক্ষায়?
