ইমতিয়াজ মাহমুদ
সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি কেবল পশ্চাৎপদ নয়, এরা ফ্যাসিস্ট। আপনি যদি এমন কিছু করেন জেটা ওদের পছন্দ হয়- হোক সেটা ব্যক্তিগত পরিসরে বা সামাজিক পরিসরে- ওরা আপনাকে আক্রমণ করবে নানা উপায়ে। শারীরিক আক্রমণ, বাচনিক আক্রমণ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আক্রমণ- সবকিছু। এরা গণতন্ত্র শব্দটিকে ঘৃণা করে। ফ্যাসিস্ট শব্দটি আপনি যেভাবেই সংজ্ঞায়িত করেন- যত সঙ্কির্ন ভাবে বা যত ব্যাপকভাবে- সব সংজ্ঞাতেই এইসব সাম্প্রদায়িক শক্তি ফ্যাসিস্ট হয়। আমাদের দেশে গত বছরের জুলাই আগস্টে ওদের শক্তি বেড়েছে।
সম্প্রতি শিক্ষক বিউটি রানী পালের বিরুদ্ধে নিতান্ত একটি নির্দোষ রীল তৈরির কারণে যে আক্রমণটি হয়েছে, সেটা এইরকম একটি ফ্যাসিস্ট আক্রমণেরই অংশ মাত্র। নারীর প্রতি এই ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি আপনি জানেন। ওদের চোখে নারী হচ্ছে পুরুষের অধীন একটি প্রাণী, নারীকে এরা ঠিক পুর্নাঙ্গ মানুষ বিবেচনা করে না, বিবেচনা করে কেবল ভোগের বস্তু হিসাবে। ওদের দৃষ্টিতে নারী গানের সাথে ভিডিও করবে বা নাচবে গাইবে এটা পাপের কাজ, চরম ঘৃণ্য। একজন শিক্ষক লোকপ্রিয় একটি গানের সাথে একটি ক্যাজুয়াল ভিডিও করে প্রকাশ করবে, এটা তো ওদের চোখে বিরাট অপরাধ।
(২)
এই অপশক্তিটি সবসময়ই ছিল আমাদের দেশে। কিন্তু এর আগে এরা খানিকটা চাপের মধ্যে থাকতো কেননা সরকার ওদের বৈরি ছিল, প্রশাসন ওদের বৈরি ছিল, এবং জনগণের মধ্যে উদার ও আধুনিক অংশটি সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ছিল। চব্বিশের পর এরা যেন নৈরাজ্যের লাইসেন্স পেয়ে গেছে। চারুকলা সঙ্গীত নৃত্য অভিনয় সব শাখার শিল্পীদের প্রতি আক্রমন পরিচালনা করার পাশাপাশি এর আক্রমণ করেছে লোকজ বিশ্বাস, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বাউল, পীর ফকির সবার উপর। ফ্যাসিস্টরা যা করে- সবাইকে ওদের মত অনুযায়ী চলতে হবে, নাইলে হত্যা।
রাজনৈতিকভাবে যারা ক্ষমতা দখল করেছে ওরা এইসব ফ্যাসিবাদী শক্তিকে তো প্রশ্রয় দিয়েছেই, সেই সাথে আমাদের দেশে যাদেরকে আমরা উদার, গণতন্ত্রী বলে চিনতাম ওদেরও একটা অংশ দাঁড়িয়েছে ওদের পাশে। না বলে পারছি না- বামপন্থীদের একটা অংশও কি এক অদৃশ্য কারণে এইসব সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রতি নমনীয়ে দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে। কার্যত রাষ্ট্রের সকল শক্তি- মুখে মুখে যাইই বলুক, কার্যত সাম্প্রদায়িক জঙ্গিদের বান্ধব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে, যেসব ইসলামপন্থে জঙ্গি প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটে আগুন লাগানোর মামলায় গ্রেফতার হয়েছিল ওরা সবাই এখন জামিনে মুক্ত।
(৩)
বিউটি রানী পালের এই ঘটনায় একটা দিক আমাদের সামনে এসেছে। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশ এইসব অন্ধকারের শক্তির কাছে চট করে মাথা নত করতে রাজি নয়। ওরা গানের সাথে রীল বানানোয় বিউটি পালের প্রতি আক্রমণ করেছে, এর বিপরীতে অসংখ্য নারী, ওদের অনেকেই শিক্ষক, ওরা একই গানের সাথে নানারকম ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেছে। ভাবখানা হচ্ছে, দেখ ব্যাটারা, আমরা সবাই বিউটি পালের সাথে আছি, তোরা কয়জনকে দমন করবি। এইটা আমাকে আশাবাদী করেছে। না, আমরা ছেড়ে দিইনি।
শোনেন, বাংলাদেশের মানুষ চেতনার দিক থেকে বাঙালী সংস্কৃতি ধারণ করে। এমাদের রক্ত পরীক্ষা করলে দেখবেন সেখানে জাতীয় পরিচয় লেখা আছে ‘বাঙালী’। আমরা গুণ্ডামি করিনা, মববাজি করিনা (ওদের এক বুদ্ধিজীবী ভালোবেসে আবার গুণ্ডামি ও মববাজিকে নাম দিয়েছে দঙ্গল, তামাশা কাকে বলে!) কিন্তু আপনারা আমদের পরিচয় ধরে টান দিবেন তো আমরা জ্বলে উঠবো। ভুলে যাবেন না, রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ করেছিল বলে আমরা আমাদের জন্যে একটা আলাদা দেশই বানিয়ে ফেলেছি। ছায়ানট কি জিনিস জানেন না? একটা ছায়ানটকে আক্রমণ করবেন তো আমরা গোটা পৃথিবী কাঁপিয়ে দিতে পারি।
(৪)
আমাদের শান্ত স্বভাব আমাদের শক্তি। ছায়ানটের দিকে তাকান- আপনারা বোমা মারেন, ভবন জ্বলিয়ে দেন, হত্যার হুমকি দেন, বিপরীতে ছায়ানট কি করে? বটতলায় নির্ভীক দাঁড়িয়ে গান ধরে, ‘আপনা মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে কর জয়’। গেল পহেলা বৈশাখে ছায়ানটের বাচ্চা বাচ্চা শিল্পীদের গাইতে শোনেননি? ওদের কণ্ঠে একটা ফোঁটা ভয়ের কাঁপন শুনেছেন? না। একাত্তর স্মরণ করুন- ঐটাই আমরা, ঐটাই বাঙালী।
