ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়া হারারি মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সবচেয়ে বড় প্রভাব হতে পারে মানুষের বিশ্বাসের ওপর। তাঁর মতে, বিশ্বাসই বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এআই মানুষের বিশ্বাসের ধরন বদলে দিয়ে অর্থনীতি, তথ্যব্যবস্থা, রাজনীতি এবং ভবিষ্যৎ সমাজে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
দ্য ইকোনমিস্টের ইনসাইডার অনুষ্ঠানে দেওয়া এক বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে হারারি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে হারারি নিজেকে এমন এক ইতিহাসবিদ হিসেবে বর্ণনা করেন, যিনি শুধু অতীত নয়, পরিবর্তন নিয়েও গবেষণা করেন। তাঁর প্রথম জনপ্রিয় বই সেপিয়েন্সে তিনি মানব ইতিহাসের দীর্ঘ সময়কে এই দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেন। দ্বিতীয় বই হোমো ডিউসে তিনি মানবসভ্যতা গঠনে ধর্মের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর সর্বশেষ বই নেক্সাসে তিনি দেখিয়েছেন, তথ্যের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে ইতিহাসের গতিপথ বদলেছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে।
হারারির মতে, আধুনিক সভ্যতার বড় একটি অংশ এমন সব ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যা মানুষকে প্রাগৈতিহাসিক যুগের তুলনায় অভাবনীয় মাত্রায় একে অপরের ওপর বিশ্বাস করতে দেয়। অর্থব্যবস্থা এর একটি বড় উদাহরণ। তিনি বলেন, টাকা হলো অপরিচিত মানুষের মধ্যে বিশ্বাস তৈরির একটি অত্যন্ত সৃজনশীল ও কল্পনাপ্রসূত উপায়। মানুষ মূল্যবান পণ্য দিয়ে বিনিময়ে শুধু এই প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করে যে অন্য কেউ পরবর্তীতে একইভাবে সেই অর্থ গ্রহণ করবে। তাঁর ভাষায়, ভালো ব্যাংকারদের কাজও মূলত বিশ্বাস তৈরি করা।
হারারি মনে করেন, শক্তিশালী এআইকে আর্থিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার বিষয়টি প্রায় অনিবার্য। খুব শিগগিরই এআই এমন ক্ষমতা অর্জন করতে পারে, যার মাধ্যমে পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিকে কোনো মানুষের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তারিতভাবে বোঝা সম্ভব হবে। ফলে আগামী কয়েক বছরে মানুষকে এআইয়ের ওপর আরও বেশি আস্থা রাখতে হবে।
তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সির উত্থানকে এর একটি উদাহরণ হিসেবে দেখান এবং এগুলোকে ‘এআইয়ের টাকা’ বলে উল্লেখ করেন। অনেক মানুষ ভালো ব্যাংকারদের চেয়েও বিটকয়েনের অ্যালগরিদমের ওপর বেশি বিশ্বাস করেন। একইভাবে, মানুষ যখন সংবাদমাধ্যমের ওপর আস্থা হারাচ্ছে, তখন টিকটক বা ইনস্টাগ্রামের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম দিয়ে বাছাই করা তথ্যের ফিডও তারা সহজে গ্রহণ করছে।
তবে এখানে একটি বড় বৈপরীত্য রয়েছে। ব্যক্তিগত যোগাযোগে মানুষ এআইয়ের ওপর যত বেশি বিশ্বাস করবে, শেষ পর্যন্ত সেই বিশ্বাস প্রযুক্তি-নির্ভর আর্থিক ব্যবস্থার ওপর অবিশ্বাস তৈরি করতে পারে। কারণ, মানুষ বুঝতে পারবে না এআই কীভাবে বা কেন কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। হারারি বলেন, বর্তমান মানব আর্থিক ব্যবস্থা গরু ও মুরগির জীবনও নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু গরু-মুরগির কোনো ধারণাই নেই যে আর্থিক ব্যবস্থা বলে কিছু আছে। তাঁর আশঙ্কা, ১০ বছর পর মানুষের অবস্থাও অনেকটা এমন হতে পারে।
এআইয়ের অস্তিত্বগত ঝুঁকি বাদ দিলেও হারারি মনে করেন, এমন একটি পৃথিবী বিপজ্জনক হবে। ভবিষ্যতের প্রযুক্তি-নির্ভর আর্থিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধস হলে এবং সেই ধসের কারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরে থাকলে, মানবনীতিনির্ধারকদের পক্ষে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে না।
তাঁর আরও বড় উদ্বেগ হলো প্রযুক্তিনির্ভর স্বৈরতন্ত্র। এক সময় জোসেফ স্তালিন রেডিওতে বক্তৃতা দিয়ে সোভিয়েত নাগরিকদের তা শোনাতে বাধ্য করতে পারতেন। কিন্তু জনগণের ওপর সত্যিকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর তাদের বিশ্বাসও প্রয়োজন ছিল। লাখ লাখ ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করা কোনো স্বৈরশাসকের পক্ষেই সম্ভব ছিল না।
হারারির মতে, এআই প্রথমবারের মতো ‘ব্যাপক হারে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা তৈরি’ করার সুযোগ দিচ্ছে। অনেক মানুষ ইতিমধ্যে এআইকে বন্ধু, এমনকি রোমান্টিক সঙ্গী হিসেবেও গ্রহণ করছেন। ভবিষ্যতে লাখ লাখ এআই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হয়ে একটি নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করতে পারে এবং মানুষের সঙ্গে তৈরি করা ঘনিষ্ঠতার শক্তি ব্যবহার করে তাদের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক স্বার্থে প্রভাবিত করতে পারে।
এই সম্ভাব্য ক্ষতি ঠেকাতে হারারি নিয়ন্ত্রণ বা রেগুলেশনের পক্ষে। তিনি এআইকে আইনি ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা চান। এ ক্ষেত্রে তিনি আর্জেন্টিনার এমন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে বটকে কোম্পানি পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে এআইকে এক ধরনের আইনি মর্যাদা দেওয়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া এআইয়ের মানুষের পরিচয় ধারণ বা মানুষের ছদ্মবেশে ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা চান তিনি। এর মধ্যে ডিপফেকও রয়েছে। হারারি জানান, ডিপফেক এতটাই বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে যে সম্প্রতি তাঁর নিজের একটি বক্তৃতার ভুয়া ভিডিও আসল নয় বুঝতে তাঁর ৯০ সেকেন্ড লেগেছিল।
এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির কারণে হারারি মনে করেন, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ এআইয়ের বড় অগ্রগতিগুলো যুক্তরাষ্ট্রেই হচ্ছে এবং দেশটির সরকার এখনো গণতান্ত্রিকভাবে জবাবদিহিমূলক। তাঁর মতে, শুধু নীতিনির্ধারক নয়, ভোটারদেরও এখনই বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। হারারি যদি নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন, তাহলে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রধান বিষয়গুলোর একটি, বরং পুরো নির্বাচনই, এআইকে ঘিরে করতেন।
দ্য ইকোনমিস্ট থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান
