কবির য়াহমদ
ইতালিতে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর পানি ছুঁড়ে হেনস্তা করার ঘটনাটি বস্তুত মব কালচার বা মব ভায়োলেন্সকে চর্চার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার এক বিপজ্জনক ধারাবাহিকতা।
ঘটনার পর জনপরিসরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আমাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের দ্বিচারিতাকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। তবে এ ঘটনায় ইতিবাচক দিকটি হলো— আক্রমণ এবং মব জাস্টিস যে নিন্দনীয় ও অপসংস্কৃতি, তা এতদিন ধরে মবকে প্রশ্রয় দেওয়া লোকজন অন্তত এ ঘটনার সুবাদে বুঝতে পারছেন।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, অতীতে নীরব থাকা বা মবকে সমর্থন করা ব্যক্তিরা আজ বাঁধনের ওপর হামলার প্রতিবাদ করতে পারবেন না। মতাদর্শ যা-ই হোক, যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার সবার রয়েছে। কিন্তু মূল প্রশ্ন নীতিবোধের ধারাবাহিকতা নিয়ে। প্রশ্ন– এই নীতিবোধ সর্বজনীন,নাকি বিভাজনকেন্দ্রিক।
নীতিবোধ যদি দলীয় কিংবা রাজনৈতিক বিভাজনকেন্দ্রিক হয়, তবে তা আর নৈতিকতা থাকে না; তা হয়ে দাঁড়ায় স্রেফ রাজনৈতিক সুযোগসন্ধান। নিজের রাজনৈতিক বা আদর্শিক পক্ষ মবের শিকার হলে সরব হওয়া, আর বিরোধীপক্ষ আক্রান্ত হলে উল্লাস করা বা চুপ থাকার এই দ্বিমুখী অবস্থান বন্ধ করাই হচ্ছে সর্বজনীন নৈতিকতা চর্চা। কিন্তু বাস্তবতা হলো এ চর্চা আজ দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনুপস্থিত।
পানি-হামলার শিকার হওয়ার পর বাঁধনের সংক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখে যারা আজ নিজেদের সাধু, নীতিনিষ্ঠ ও সভ্য প্রমাণের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন, তাদের অধিকাংশের পেছনের ইতিহাস কিন্তু একেবারেই ভিন্ন। গত দুই বছরে মেহের আফরোজ শাওন কিংবা রোকেয়া প্রাচীর মতো শত শত নারী ও শিল্পী যখন দেশে ভিন্ন ভিন্ন মবের শিকার হয়েছেন, হেনস্তা ও আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছেন, তখন আজকের এই নীতিবাগীশদের বড় একটি অংশ নীরব থেকেছেন, কিংবা সুবিধাজনকভাবে সেই মবগুলোকে ‘জায়েজ’ করার চেষ্টা করেছেন।
এখানে আমি বলছি না যে, অতীতে মবকে সমর্থন করা বা মবের পক্ষে থাকা মানুষেরা আজ নিজেদের বিপক্ষের মবের প্রতিবাদ করতে পারবেন না। মতাদর্শ যা-ই হোক, যেকোনো হামলার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অধিকার সবার রয়েছে; এমনকি একপাক্ষিক প্রতিবাদ করারও অধিকার রয়েছে।
আপনি যদি সত্যিই মব কালচারের বিরুদ্ধে নীতিবোধ দ্বারা চালিত হন, তবে সব ঘটনাকে এক-চোখা নীতিতে নয়, এক চোখে ও একই মাপকাঠিতে দেখতে হবে। আর নীতিবোধ যদি হয় কেবলই দলীয় বিভাজনকেন্দ্রিক, তবে প্রতিবাদ করার অধিকার যেমন আপনার রয়েছে, তেমনি নীরব থাকার বা না করার অধিকারও আপনার রয়েছে।
তবে আপনার নীতিবোধ যদি হয় সর্বজনীন, তবে সকল অন্যায়েরই সমভাবে প্রতিবাদ করা উচিত। এখানে নিজের রাজনৈতিক বা আদর্শিক পক্ষ মবের শিকার হলে সরব হওয়া, আর বিপক্ষ মবের শিকার হলে নীরব থাকা কিংবা তালি বাজানো— এ দ্বিচারিতা বন্ধ না হলে মব জাস্টিসের সংস্কৃতি কোনোদিনই থামবে না।
মিডিয়ার কল্যাণে বাঁধন দেশের একটা উল্লেখযোগ্য চরিত্র। আওয়ামী লীগের আমলে তিনি অনেকটাই দলটির ‘ফুট-সোলজার’ ছিলেন; সরাসরি নির্বাচনি প্রচারণায়ও অংশ নিয়েছেন। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সময়ে তিনি বদলেছেন। টাকার বিনিময়ে নাকি আদর্শিক টানে তার এই রূপান্তর তা জানি না। কেউ যখন দ্রুততার সঙ্গে চরিত্র বদলায়, তবে এটা নিশ্চিত ভাবেই ধারণা করা যায়, প্রয়োজনে ভবিষ্যতেও কেবলা বদল করার সম্ভাবনাও থেকে যায়। এখানে তবু আমি বাঁধনের কেবলা-বদলের সমালোচনা করব না, কারণ পক্ষে যাওয়া ছিল যেমন তার অধিকার, তেমনি বিপক্ষে যাওয়াও তার অধিকারের পর্যায়ে পড়ে। তবে এগুলোকে আমরা কেবল উল্লেখ করি বৃহত্তর বিশ্লেষণের স্বার্থে।
বাঁধনের এই ঘটনাকে ব্যক্তির ওপর হামলাও মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে এটা জুলাইয়ের ওপর হামলা। এই দেশে যেমন এক শ্রেণির মানুষ জুলাইকে ধারণ করেন, অন্য এক শ্রেণি জুলাইকে প্রত্যাখ্যান করেন। জুলাই দেশে বিজয়ী-পক্ষ আর পরাজিত-পক্ষ হিসেবে বিভাজন সৃষ্টি করেছে। এটা জুলাই-পক্ষীয়রা লালন করে চলছেন এবং রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সকল দিক থেকে দেশের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন বলে এ বিভাজন চলতেই থাকবে। গত নির্বাচনে জুলাই নিয়ে প্রাথমিক একটা নিষ্পত্তি হয়েছে। এটাকে যদি গণভোটের দিক থেকে বিশ্লেষণ করেন, তবে দেখা যাবে দেশের মোট ১২.৭৩ ভোটারের মধ্যে গণভোটে বা জুলাই সনদের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ বলেছেন মাত্র ৪.৭ কোটি ভোটার; শতাংশের হিসেবে এটা মাত্র ৩৭.১ পারসেন্ট। যদিও প্রদত্ত ভোটের হিসাবে (৬১.৬৪) ওটা ভিন্ন। এখানে উল্লেখ করা জরুরি যে, নির্বাচনি জয়-পরাজয়ের হিসাবে প্রদত্ত ভোটের প্রসঙ্গ আসলেও, সামগ্রিক হিসাবে অবশ্যাম্ভাবী রূপে আসবে মোট ভোটারের সংখ্যা। নীরব অথবা প্রত্যাখ্যান করা প্রায় ৮ কোটি ভোটারকে (মানুষের সংখ্যা এর অনেক বেশি) আপনি কীভাবে অস্বীকার করবেন?
অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন প্রখর নীতিবোধসম্পন্ন মানুষ কি না এই প্রশ্ন উঠেছে। অভিনেতা সাইমন সাদিকের একটি ভিডিওতে বলতে দেখলাম, চব্বিশের ৫ আগস্টের পর ৬৫ বছর বয়সী এক নারী যখন গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন, তখন ওই অভিনেতা সহায়তার প্রত্যাশায় বাঁধনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু বাঁধন তা প্রত্যাখ্যান করেন। মানুষ হিসেবে এই ধরনের আচরণ তার নীচপ্রবৃত্তিরই প্রমাণক।
এই ‘ভেনিস-গেট’ ঘটনা আমাকে আলাদা করে আলোড়িত করছে না। মবের অন্য সকল ঘটনার মতো এটাও স্রেফ একটা দুঃখজনক ঘটনা। আমি এখান থেকে কেবল শিক্ষা নেওয়ার উপকরণ খুঁজছি। বিপক্ষে গেলে নিন্দা আর পক্ষে এলে সাধুবাদ— এ সুবিধাবাদী রীতি থেকে এরপর আমরা যদি বেরিয়ে আসার তাগাদা অনুভব করি, তবে সেটাই হবে আমাদের অর্জনের জায়গা।
