আ ন ম আরিফুল ইসলাম
শেখ সেলিম নাকি দলীয় গঠনতন্ত্র? সন্মানীত সাংবাদিক ভাইদের ভুল উপস্থাপনে তৃণমূলে শুরু হয়েছে গুঞ্জন। চলুন জেনে নিই, জননেত্রী শেখ হাসিনা কি বলেছেন এবং দলীয় গঠনতন্ত্র কি বলছে!!
নেত্রী বলেছেন ‘আমি যদি (পাঠক, মনে রাখবেন তিনি ‘যদি’ শব্দটা উচ্চারণ করেছেন) কারাবরণ করি তাহলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দল পরিচালিত হবে। সাংবাদিক সাহেব প্রতিউত্তরে শেখ সেলিমের নাম বলেছেন, নেত্রী বলেননি।
নেত্রী বলেছেন সিনিয়র হিসাবে সেও আসতে পারেন (পাঠক, ‘আসতে পারেন’ বলেছেন; ‘আসবে’ বলেননি। এখন চলুন দেখি গঠনতন্ত্র কি বলছে!!
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের ২৫(১)(ক) ধারা এ বিষয়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
সেখানে বলা হয়েছে, সভাপতি অনুপস্থিত থাকলে তিনি সভাপতিমণ্ডলীর যেকোনো একজন সদস্যকে সভাপতির কার্য সম্পাদনের দায়িত্ব দিতে পারবেন।
অর্থাৎ সভাপতি কোনো কারণে কারাবন্দি, অসুস্থ বা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব পালনে অনুপস্থিত হলে গঠনতন্ত্রের ভাষ্য অনুযায়ী সভাপতির দায়িত্ব সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্যকে সভাপতির কার্য সম্পাদনের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। আওয়ামী লীগের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত গঠনতন্ত্রেও এই কাঠামো রয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। ‘সভাপতির পদ শূন্য হয়ে যাওয়া’ এবং ‘সভাপতির অনুপস্থিতিতে সভাপতির কার্য সম্পাদন করা’ দুটি এক বিষয় নয়। গঠনতন্ত্রের ভাষা মূলত দ্বিতীয় বিষয়টি নিয়ে।
অর্থাৎ সভাপতি অনুপস্থিত থাকলে একজন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সভাপতির কার্য সম্পাদন করবেন; এর অর্থ এই নয় যে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দলের স্থায়ী সভাপতি হয়ে যাবেন। অর্থাৎ সভাপতি মন্ডলীর সদস্যদের মধ্য থেকে যেকোন একজন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হবেন।
এক্ষেত্রে বয়সে বড় এবং প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিকে সাধারণত দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো; সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কারা?
২০২২ সালের ২২তম জাতীয় কাউন্সিলে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে নির্বাচিতদের তালিকায় ছিলেন
মতিয়া চৌধুরী,
শেখ ফজলুল করিম সেলিম,
কাজী জাফরউল্লাহ,
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন,
পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য,
নুরুল ইসলাম নাহিদ,
ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক,
মুহাম্মদ ফারুক খান,
শাজাহান খান,
জাহাঙ্গীর কবির নানক,
আবদুর রহমান,
এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম,
সিমিন হোসেন রিমি ও
ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন।
পরবর্তী সময়ে এই তালিকার কয়েকজন ইন্তেকাল করেছেন। মতিয়া চৌধুরী আপা ১৬ অক্টোবর ২০২৪ সালে ৮২ বছর বয়সে,
পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য দাদা ৬ নভেম্বর ২০২৫ সালে ৮৫ বছর বয়সে এবং ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ভাই ১৩ মে ২০২৬ সালে ৮৩ বছর বয়সে মারা যান।
ফলে ২০২৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বরের হিসাবে তাদেরকে ‘বর্তমানে জীবিত সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য’ হিসেবে ধরা যায় না। যদি কোথাও ভুল লিখে থাকি তাহলে ধরিয়ে দিবেন দয়া করে।
বর্তমানে জীবিত সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম (প্রায় ৭৯ বছর),
কাজী জাফরউল্লাহ (প্রায় ৭৭ বছর),
নুরুল ইসলাম নাহিদ (৮১ বছর),
ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক (প্রায় ৭৬ বছর),
মুহাম্মদ ফারুক খান (৭৪ বছর),
শাজাহান খান (৭৪ বছর),
জাহাঙ্গীর কবির নানক (৭২ বছর), আবদুর রহমান,
এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন (৬৭ বছর),
মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া (৭৮ বছর),
অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম (৭৬ বছর),
সিমিন হোসেন রিমি (৬৫ বছর) এবং
ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন।
অর্থাৎ গঠনতন্ত্রের দৃষ্টিতে বিষয়টি ব্যক্তির বয়স বা রাজনৈতিক প্রভাবের উপর নির্ভর করে না।
সভাপতি অনুপস্থিত হলে সভাপতিমণ্ডলীর যেকোনো একজন সদস্যকে সভাপতির কার্য সম্পাদনের দায়িত্ব দেওয়ার সাংগঠনিক সুযোগ রয়েছে। কে সেই দায়িত্ব পাবেন? এটি গঠনতন্ত্রে নির্দিষ্ট করে কোনো একজনের নাম স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি।
সুতরাং, এটাও বলা ঠিক হবে না যে সভাপতিমণ্ডলীর কোনো নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হয়ে যাবেন।
গঠনতন্ত্রের কাঠামো হলো; সভাপতির অনুপস্থিতিতে সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্যকে সভাপতির কার্য সম্পাদনের দায়িত্ব দেওয়া, যা মূলত হাউজে নির্ধারণ হয়ে থাকে।
অর্থাৎ শেষ কথা হলো; সভাপতির পদ এক জিনিস, সভাপতির অনুপস্থিতিতে সভাপতির কার্য সম্পাদন করা আরেক জিনিস। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র এই দুটির মধ্যে পার্থক্য রেখেছে।
তাই, সতর্ক হন এবং নেগেটিভ ন্যারেটিভ তৈরীতে যারা কাজ করছে তাদেরকে এড়িয়ে চলুন।
