রাজীব আহমেদ
টকশোতে বারবার না শুনছিলাম ড. ইউনূস নিজের ৬৬৬ কোটি টাকা ট্যাক্স মাফ করে দিছে, তাহলে ফিরল কেমনে? আদালতকে ট্যাক্স চ্যালেঞ্জ করে করা রিট খারিজ করল কেমনে? রিট তো হয়ই হাইকোর্টে। তাহলে আগে মাফ পাইলে, আজ কেমন রিট খারিজ হলো?
ব্যাপারটা খুব জটিল কিছু না। খুবই সিম্পল একটা মামলা। কর ফাঁকির মামলাও না। ট্যাক্স নিয়ে বিরোধ মামলা। ঘটনা হল গ্রামীণের সদস্যদের ইউনূস সাব ১৯৯৩ সালে স্বাস্থ্যকেন্দ্র করেন। স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনা করত গ্রামীণ কল্যাণ নামে একটা প্রতিষ্ঠান। এরপর সদস্যদের বাইরে অন্যদেরও চিকিৎসা শুরু করে এইসব স্বাস্থ্য কেন্দ্র।
২০০৪ সালে গ্রামীণ ফোনে ৫৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এই গ্রামীণ কল্যাণ। শর্ত হল, গ্রামীণ ফোন বছরে যে লাভ করবে, ৫৪ কোটি টাকার ইনভেস্টমেন্টের অনুপাতে লভাংশ দেবে গ্রামীণ কল্যাণকে। মানে ১০ লাখ টাকার একটা দোকানে আপনি ১ লাখ টাকা খাটালেন। বছর শেষে সেই দোকানের ২ লাখ লাভ হলো। আপনি ২০ হাজার টাকা লভ্যাংশ পাইলেন।
তো গ্রামীণ ফোন এবং গ্রামীণ কল্যাণের এই লেনদেন ভালোই চলছিল। ২০১৭ সালে এনবিআর বলে, আগের ৫ বছরে গ্রামীণ কল্যাণ লাভের যে টাকা পেয়েছে তা থেকে ট্যাক্স দেয়নি। গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা দিতে হবে। গ্রামীণ কল্যাণ যুক্তি দেয়, গ্রামীণ ফোন লভ্যাংশ দেওয়ার সময় সরকার ১৫% ট্যাক্স নেয়, তাহলে গ্রামীণ কল্যাণ কেনো আবার ট্যাক্স দেবে? এক ইনকামের ওপর দুইবার ট্যাক্স হতে পারে না।
এই যুক্তিতে এনবিআরের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে রিট মামলা করে গ্রামীণ কল্যাণ। খেয়াল করেন, মামলা এনবিআর করে নাই। করছে গ্রামীণ কল্যাণ। মানে এইখানে ইউনূস আসামি নন, তিনি বাদি। মামলা চলে ৭ বছর। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি এসএম মনিরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ রিট খারিজ করে রায় দেন, গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ টাকা দিতে হবে। এক ইনকামের ওপর দুইবার ট্যাক্স নিতে বাধা নেই।
ঘটনা এতটুকুই। এরপর শুরু হয় নতুন টুইস্ট। ঘটে যায় ৫ আগস্ট। ৮ আগস্ট ইউনূস হয়ে যান দেশের সরকার প্রধান। জুনিয়র বিচারপতি এসএম মনিরুজ্জামান পূর্ণাঙ্গ রায় লিখতে গিয়ে দেখেন, তার সিনিয়র খুরশীদ আলম সরকার বিচারপতি হওয়ার আগে এই মামলাতেই ডেপুটি অ্যাটর্নি হিসেবে রাষ্ট্র পক্ষের ইউনূসের বিরুদ্ধে আইনজীবী ছিলেন।
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, কোনো আইনজীবী কোনো মামলায় যদি বাদি বা বিবাদীর পক্ষে একবার কোর্টের দাঁড়ান, তাহলে পরবর্তীতে বিচারপতি হয়ে সেই মামলা বিচার করতে পারবেন না। কিন্তু শুনানির ছয় মাস ধরে খুরশীদ আলম সরকার এই সত্য গোপন করেন। এই ভদ্রলোক ছিলেন বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদের নেতা। তিনি আওয়ামী লীগের ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বির জামাতা। (এই জালিয়াতি ও একটা ঘুষের ঘটনা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের তদন্তে প্রমালিত হওয়ার পর বিচারপতি খুরশীদের চাকরি গেছে গত বছর।)
এই জালিয়াতি ধরা পড়ার পর হাইকোর্ট ২০২৪ সালের অক্টোবরে আগের নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যাহার (রিকল) করে। ইউনূসের আইনজীবী তখনই বলেছিলেন, ‘রায়টি এখন রিকল হওয়ায় মনে হবে ইউনূস ক্ষমতায় থাকায় এটা হয়েছে।’ হয়েও ছিল তাই।
রায় রিকলের পর এই মামলা আবার পাঠানো হয়, প্রধান বিচারপতির কাছে। বিতর্ক হতে পারে আশঙ্কায়, ইউনূস আমলে এই মামলা কোনো বেঞ্চে দেওয়া হয়নি। শুনানীও করা হয়নি। গত জুলাইয়ে নতুন বেঞ্চ দেওয়ার পর, মামলায় নতুন করে শুনানী শুরু হয়। সেই মামলায় আজ হাইকোর্ট বলেছে, রিট খারিজ। এনবিআরের দাবি ঠিক আছে। টাকা দিতে হবে গ্রামীণ কল্যাণ। তারা এখনই এই ট্যাক্স দিয়ে দেবে নাকি সুপ্রিম কোর্টে আপিল করবে, এটা তাদের ব্যাপার।
আমি ওপরে যা লিখলাম, একটাও গোপন ব্রেকিং তথ্য না। দেশের পত্রপত্রিকায় বারবার ছাপা হয়েছে। কিন্তু টকশোতে যে বিজ্ঞ লোকেরা যান, এরা ফেসবুক ছাড়া কিছুই পড়েন না। ট্যাক্স ডিসপিউট মামলাকে মুরুক্ষসোডার দল বিরাট একটা ষড়যন্ত্র তত্ত্বে পরিণত করেছে। দুই বছর ধরে প্রচার চালাল ইউনূস নিজের ট্যাক্স মাফ করে দিয়েছে, এখন দেখা গেলো ব্যাডা ক্ষমতায় থাকাকালে নিজের মামলার শুনানিই করায়নি বিতর্কের ডরে।
