কাবেরী গায়েন
চব্বিশে চরম বিভ্রান্তিকর আচরণ; ভীষণ বিরক্ত হয়েছি শিবিরের কোলে মাথা রেখে ঘুমানো বাম ঘরানার ছেলেটির দিকে তাকিয়ে। তবুও কেন যেনো মন চাইছে জানতে; মেঘ বাঁচবেতো—
“দুঃখের সাথে বলছি। বলছি বিনয়ের সাথে।
বাংলাদেশ ছাত্রইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির প্রাক্তন নেতা মেঘমল্লার বসু দ্বিতীয়বারের মত আত্মহত্যার উদ্যোগ নিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত জানা মতে লাইফ সাপোর্টে আছেন। তার আত্মহত্যামূলক নোটে তিনি জীবনকে মিলাতে না পারার সংকটের কথা লিখেছেন। তিনি জনপ্রিয় ছাত্রনেতা ছিলেন। প্রায় পাঁচ হাজারের মত ভোট পেয়েছিলেন গত ডাকসু নির্বাচনে। সাধারণ সম্পাদক পদে। তার প্রাক্তন যে সম্পর্কের কথা লিখেছেন, তিনিও, সামাজিক মাধ্যমে পাওয়া তথ্যমতে, আত্মহত্যার উদ্যোগ নিয়েছেন গতরাতে। এই তথ্য যাচাই করার সুযোগ ঘটেনি। সত্য হলে খুবই দুঃখজনক। এর আগেও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের এই অংশের এক নেতা, যিনি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় অংশে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তিনিও কয়েক বছর আগে আত্মহত্যা করেন নিজের বাসায়। এই আত্মহত্যা এবং উদ্যোগগুলো খুব স্বাভাবিক নয় বলেই লিখছি। যেহেতু জনপরিসরে এসব নিয়ে খোলাখুলি লেখা প্রায় অসম্ভব, তাই সবটা লিখেও প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকছি। খুবই সংক্ষেপে কিছু কথা বলেই শেষ করবো।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন অফিসিয়ালি ভেংগে গেছে দুই ভাগে। লুকানোর কিছু নেই। ২০১৯ সালের কেন্দ্রীয় সম্মেলনের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে যে অংশটি ভোটে হেরে যায়, সেই অংশটি সংগঠন থেকে বেরিয়ে একই নামে ছাত্র ইউনিয়নের আরেকটি অংশ গঠন করেন। বাইরে থেকে এটুকুই দেখা যায়। তারা বলেছেন এটা যতো না নেতৃত্বগত দ্বন্দ্ব তারচেয়ে বেশি আদর্শিক। সিপিবির নামীদামী নেতাদের দেখা যায় এই অংশকে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা দিতে। এমনকি যে ”ছাত্র ইউনিয়নের নীল পতাকা নীল আকাশে উড়িয়ে দাও” স্লোগান রপ্ত করে বড় হয়েছি, সেই পতাকা লাল বানিয়ে বিদেশি শরীর এবং অবয়বের পতাকাবাহী পোস্টার সমৃদ্ধ সম্মেলনে সেইসব নেতারা সার্বক্ষণিক বসে থেকে সিপিবির পৃষ্ঠপোষকতা ঘোষনা করেছেন। বলা হয়েছে এই অংশটি স্মার্ট। এই কথায় সত্য-মিথ্যা দুই-ই আছে।
সত্য হলো এই অংশের নেতারা বিভিন্ন পাব্লিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তুখোড় বক্তা, কারো কারো পারিবারিক ঐতিহ্য আছে বাম রাজনীতির। কাজেই তারা স্মার্ট বলা চলে বাইরের দিক থেকে। তাহলে তারা আন-স্মার্ট এটাও সত্য কীভাবে? এই চলে যাওয়াটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত নেতাদের নেতৃত্ব মানতে না পারার আনস্মার্টনেস। একটা ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে মোকাবেলা না করতে পেরে ছেড়ে দেবার সহজ পথ বেছে নেবার আনস্মার্টনেস। বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনে এই ক্ষতির পরিমাণ পরিমাপযোগ্য নয়। ভবিষ্যতেও শুধু অনুভব করতে হবে। অথচ দুই পক্ষই কিন্তু ঐক্য, শিক্ষা, শান্তি, প্রগতির স্লোগানকে ধারণ করেন।
এটাও মেনে নেয়া যেত যদি দেখতাম তারা ২০২৪-এর ছাত্র-আন্দোলনে নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রেখে নেতৃত্ব দিতে পারতেন। কিন্তু সেটা হয়নি। বরং একদল উজ্জ্বল ছাত্র-ইউনিয়ন নেতাকে দেখা গেছে জামাত-শিবিরের সাথে সখ্য করে আন্দোলন করতে। সিপিবির বর্তমান সময়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাকে দেখা গেছে এই আন্দোলনে জামাতের অংশিদারি আছে বলে জামাতের নেতাদের সাথে হাত মিলিয়ে খুশি হতে, এবং পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে ব্যাখ্যা দিতে। কী ভীষণ আনস্মার্ট মুভ!
২০২৪-এর পরে এই উজ্জ্বল নেতারা, যারা অন্যদের কম বিপ্লবী বলতেন, শেকড়চ্যূত হয়ে পড়লেন। প্রথমে ছেড়ে দিলেন সিপিবি। চলে গেলেন এনসিপিতে। সেখানেও ঠ্যালা খেয়ে গড়েছেন নতুন দল এনপিএ। কিন্তু মেঘের সুইসাইড নোটকে বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, তিনি শূন্যতায় ফিরে গেছেন বার বার। জীবনের এক বাঁও মেলে না, দো বাঁও মেলে এ এ না-র মত। সিপিবির যেসব নেতারা এই অংশকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন, তাদের এই দলচ্যূতিকে পার্টির সেইসব নেতারা কীভাবে মূল্যায়ণ করেন, জানতে ইচ্ছে করে।
মেঘকে সেই ছোটবেলায় অরুণদার হাত ধরে একবার বই মেলায় দেখেছিলাম। সেজন্য তার প্রতি এক সহজাত মমতা আছে যেটা মেঘ কখনো জানেন নি। তার সাথে কথা খুব একটা হয়নি কখনোই। তিনি হয়ত চৌকষ, কিন্তু মেধাবী কি না জানি না। মেধাবী হলে হয়তো ২০২৪-এর আন্দোলনে কারো সাথে বিলীন না হয়ে নিজেদের স্পষ্ট অবস্থান ধরে রাখতে পারতেন। তাহলে হয়তো রাজনৈতিকভাবে এতোটা খাবি খেতে হত না। কী কারনে কী হয়েছিল, কীভাবে তারা অন্যের গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন (যদি হয়ে থাকেন) ইতিহাস এতো কথা মনে রাখবে না, ইতিহাস মনে রাখবে তারা কার হয়ে কী বলেছিলেন। যেমন মেঘমল্লার বলেছিলেন ২০২৪ পরবর্তী বাংলাদেশে হিন্দু বলে কেউ সন্ত্রাসের শিকার হয়নি।
অধ্যাপক যতীন সরকার বলেছিলেন, বাংলাদেশের বামপন্থীরা সমাজ বিশ্লেষণে ব্যস্ত থাকতে গিয়ে সমাজমনস্তত্বের দিকে মন দিতে পারেনি। খোঁজ নেয়নি ব্যক্তিমনের। এটা এক ঐতিহাসিক ব্যর্থতা। তাই হয়তো মেঘদের মনের খবরের তল কেউ রাখেননি। ছোটবেলায় বাবা মারা গেলে একা মা-কে নিয়ে তার জীবন কীভাবে চলেছে, আমরা ক’জনেই বা জানি!
আরো কত ক্ষত আছে জীবনের পরতে পরতে, দলগুলো সেইসব খোঁজ রাখে কি আসলে?
মেঘ সুস্থ হয়ে উঠুক। মেঘের কাছের মানুষ আপনজন যারা, তারা তাকে শারীরীক-মানসিকভাবে সুস্থ করে তুলবেন নিশ্চয়ই। মেঘদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া বাইরের মানুষদের কাছে কিছু চাওয়া নেই, তবে ঘরের (রাজনৈতিক ঘরের) মানুষজন একটু আন্তরিকভাবে ভাবুন, কোথায় ভুল ছিল। তাদের শেকড়চ্যূত রাজনীতির দিকে ঠেলে দেয়ায়, তাদের বিপন্ন করে দেয়ায় দলের নেতৃত্বগত দিক থেকে তাদের কোন দায় ছিল কি না। আছে কি না। এখনো তাদের শুশ্রূষা দেয়া যায় কি না।
মেঘের জন্য শুভকামনা। দ্রুততম পূর্ণ সুস্থতা কামনা করি। সকল মেঘের জন্য শুভকামনা। শরীর-মনে সুস্থ হয়ে উঠুন তারা। রাজনীতি তাদের জন্য খানিকটা সময় নিশ্চয়ই অপেক্ষা করবে।”
(লেখক: কাবেরী গায়েন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
