ইব্রাহিম চৌধুরী খোকন
ঔপনিবেশিকতা কখনো পুরোপুরি বিদায় নেয় না। সে শুধু ঠিকানা বদলায়। ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ ছেড়ে গেছে বহু বছর হলো। পতাকা নেমেছে, সাহেব চলে গেছে, রাজদণ্ড অন্য হাতে উঠেছে। কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া সীমানা, আমলাতন্ত্র, শিক্ষাব্যবস্থা, ভাষার শ্রেণিবিন্যাস আর মানসিকতার কিছু ভূত এখনো আমাদের ঘরের ভেতর ঘুরে বেড়ায়। কখনো ইংরেজি মাধ্যম বনাম বাংলা মাধ্যমের তর্কে। কখনো সরকারি দপ্তরের আচরণে, কখনো আবার নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে একটু নিচু চোখে দেখার অদ্ভুত অভ্যাসে।
উপনিবেশ শেষ হয়। উপনিবেশের রেখাপাত শেষ হয় না। সেই রেখাপাতের সবচেয়ে আশ্চর্য এক ফলাফল বোধহয় পূর্ব লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল।
৯ সেপ্টেম্বর, বুধবার, পা রাখলাম হোয়াইটচ্যাপেলে। হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, ইতিহাসের কোনো অধ্যায়ের ভেতর ঢুকে পড়েছি। কেউ হাঁটছে, কথা বলছে, দোকান খুলছে, চা খাচ্ছে, ব্যবসা করছে, রাজনীতি করছে, সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছে। ইতিহাস এখানে অতীত নয়, প্রতিদিনের জীবন।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সময় সিলেটের বহু মানুষ জাহাজে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছিলেন। লস্কর হিসেবে, নাবিক হিসেবে, নানা কঠিন কাজে। সমুদ্র পেরিয়ে তারা এসেছিলেন সেই সাম্রাজ্যের কেন্দ্রভূমিতে। যে সাম্রাজ্য তাদের দেশ শাসন করত। কেউ ফিরেছেন, কেউ ফেরেননি। কেউ দেশে টাকা পাঠিয়েছেন, কেউ একসময় স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে এসেছেন। তারপর ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে বসতি, পরিবার, দোকান, মসজিদ, রেস্টুরেন্ট, সংগঠন—একসময় তৈরি হয়েছে একটি নতুন সামাজিক ভূগোল।
আজ চার প্রজন্ম পরে দাঁড়িয়ে সেই ইতিহাসের দিকে তাকালে ব্যাপারটা বেশ চমৎকার লাগে।
যে সাম্রাজ্য একদিন সিলেটের সহজ-সরল মানুষকে জাহাজের গরম বয়লার রুমে কাজ করিয়েছিল। সেই সাম্রাজ্যের রাজধানীর বুকেই তাদের উত্তরসূরিরা এখন বাড়ি কিনেছে।ব্যবসা করেছে, কাউন্সিলর হয়েছে, এমপি হয়েছে, মেয়র হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে।পড়াচ্ছে।
ইতিহাসের প্রতিশোধ যদি বলে কিছু থাকে, এর চেয়ে সুন্দর প্রতিশোধ আর কী হতে পারে!
হোয়াইটচ্যাপেলের ফুটপাত ধরে হাঁটছিলাম। কোথাও কোথাও মনে হচ্ছিল, সিলেট শহরের কোনো পরিচিত পাড়া দিয়ে যাচ্ছি। শুধু আকাশটা একটু বেশি ধূসর, বাতাসে ঠান্ডা একটু বেশি, আর মানুষের মুখে জীবনের হিসাবটা একটু বেশি স্পষ্ট।
ব্রিক লেনের দোকানপাট, বাংলা সাইনবোর্ড, রেস্টুরেন্টের নাম, পরিচিত উচ্চারণ।
প্রবাসী বাঙালি সমাজের ইতিহাসে সিলেটিদের এই যাত্রা নিছক অর্থনৈতিক অভিবাসনের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঔপনিবেশিক অর্থনীতি, সাম্রাজ্যের জাহাজ, সমুদ্রযাত্রা, বর্ণবাদ, শ্রমবাজার, দেশভাগ, পাকিস্তান, বাংলাদেশের জন্ম, পরিবার বিচ্ছেদ এবং শেষ পর্যন্ত নিজের জন্য একটি নতুন পৃথিবী বানিয়ে নেওয়ার অদম্য চেষ্টা।
এই ইতিহাসের কথা ভাবলেই প্রয়াত সাংবাদিক ও লেখক,আমার মামা নূরুল ইসলামের কথা মনে পড়ে।
‘প্রবাসীর কথা’ বইটি নিয়ে আমি বহুবার ভেবেছি। লন্ডনে বসে বাঙালির প্রবাসজীবনের ইতিহাস খুঁজেছেন তিনি। গবেষণা করেছেন, মানুষের কথা শুনেছেন, পুরনো দলিল ঘেঁটেছেন।
প্রবাসেরও একটা ইতিহাস আছে, একটা রাজনীতি আছে, একটা মনস্তত্ত্ব আছে, একটা সংগ্রাম আছে। তাঁর বইকে বাঙালির প্রবাসজীবনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে গবেষণাতেও উদ্ধৃত করা হয়েছে।
সিলেটের নাগরিক আন্দোলনের দিনগুলোতে তাঁর কণ্ঠেই প্রথম প্রবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয়ের দাবির কথা শুনেছিলাম। তখন কথাটা অনেকের কাছেই হয়তো স্বপ্নের মতো শোনাত।
আমরা সেই দাবিতে আন্দোলন করেছি। পরে নিজেও একদিন প্রবাসী হয়েছি। আর বাংলাদেশ সরকার ২০০১ সালের ২০ ডিসেম্বর পৃথক ‘প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠা করেছে। তারও আগে ১৯৭২ সালে শ্রম ও জনশক্তি মন্ত্রণালয় গঠিত হয়েছিল। অর্থাৎ যে দাবি একসময় সিলেটের নাগরিক ও প্রবাসী সমাজের কথায় কথায় উচ্চারিত হতো, রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত তার একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
ইতিহাসের সবচেয়ে মজার ব্যাপার বোধহয় এটাই—আমরা যখন দাবি করি, তখন ভাবি আমরা ইতিহাস তৈরি করছি। বহু বছর পরে দেখা যায়, ইতিহাসও নীরবে আমাদের দাবির হিসাব রাখছিল।
হাঁটছিলাম আর মানুষজন এসে জড়িয়ে ধরছিলেন।
কেউ বলছেন, ‘চা খাইয়া যাউক্কা।’
এই একটি বাক্যের কাছে লন্ডনের সব শীতলতা পরাজিত।
ব্রিটিশরা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে—সময় মেনে চলা, লাইনে দাঁড়ানো, নিয়ম মানা, ব্যক্তিগত পরিসর রক্ষা করা। কিন্তু চা খাওয়ানোর ব্যাপারে সিলেটিরা এখনো ব্রিটিশ হতে পারেনি। বরং হওয়ার চেষ্টাও করেনি।
সিলেটি আতিথেয়তার এই জায়গাটুকু এখনো উপনিবেশমুক্ত।মনে পড়ে গেল সেই পুরনো গান—‘সিলেট পাইলে যেমন তেমন,
লন্ডন পাইলে—ও আমার সিলটি ভাইছাব।’
লন্ডনে এসে সিলেটিরা বদলেছে—এটা সত্যি। পোশাক বদলেছে, ভাষা বদলেছে, বাড়ির নকশা বদলেছে, সন্তানের স্কুল বদলেছে। অনেকের উচ্চারণ বদলেছে। কেউ কেউ নিজের সিলেটি পরিচয়টাকেও একটু পালিশ করে উপস্থাপন করেন।
দেশ ছেড়ে যাওয়া মানুষ নিজের শিকড়কে অনেক সময় একটু বাড়িয়ে বলে। গ্রামের বাড়িটাকে একটু বড় করে, বংশের ইতিহাসটাকে একটু দীর্ঘ করে, নিজের অবস্থানটাকে একটু উজ্জ্বল করে বলতে চায়। কেন?
কারণ প্রবাসে মানুষ শুধু নতুন জীবন তৈরি করে না। নিজের পুরনো জীবনটাকেও সঙ্গে নিয়ে হাঁটে।নিজের পরিচয়কে বারবার প্রমাণ করতে হয়।
হয়তো সেই কারণেই প্রবাসী সিলেটি কখনো কখনো নিজের সিলেটকে বাস্তব সিলেটের চেয়েও একটু বেশি সুন্দর করে আঁকে।এটা আত্মম্ভরিতা নয় শুধু।এর মধ্যে দেশ হারানোর ভয়ও আছে।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হলো—সিলেট শহরের আশি-নব্বই দশকের কত পরিচিত মুখ যেন এই শহরেই এসে জড়ো হয়েছে! যাদের সঙ্গে একসময় রাজপথে হাঁটতাম, মিছিলে স্লোগান দিতাম,মঞ্চ ভাগ করে নিতাম, চায়ের দোকানে বসে পৃথিবীর রাজনীতি উদ্ধার করতাম, রাত বাড়লে দেশ নিয়ে তর্ক করতাম—তাদের অনেকেই এখন এই লন্ডনের ফুটপাতে হাঁটেন।কেউ দোকানের মালিক, কেউ রেস্টুরেন্টের ব্যবসায়ী, কেউ ট্যাক্সি চালিয়েছেন, কেউ কাউন্সিলের রাজনীতি করছেন, কেউ সন্তানকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার- ব্যারিস্টার বানিয়েছেন। কেউ আবার সারাজীবন পরিশ্রম করে শেষে নিজের জন্য একটা বাড়ি কিনেছেন।জীবনের নোংগর এখানেই ফেলেছেন।কেউ জীবনের নানা পথ মাড়িয়ে “বেহেশতে” যাওয়ার আকুল বন্ধনায় দিন কাটাচ্ছেন।
সিলেটে আমরা যে স্বপ্নগুলো দেখতাম, তার কিছু বাস্তব হয়েছে এখানে।আবার কিছু স্বপ্ন হয়তো এখানেও হারিয়ে গেছে।
রাজপথের স্লোগান বদলে গেছে দোকানের হিসাবের খাতায়। মিছিলের সঙ্গী এখন ব্যবসার অংশীদার। যে বন্ধু একসময় বিপ্লবের তত্ত্ব বোঝাত, সে এখন বলে—‘ভাই, আগে চা খান।’
সময় মানুষকে কতভাবে বদলে দেয়!তবু আশ্চর্য, মানুষ পুরোপুরি বদলায় না।সেই হাসি, সেই পুরনো ডাক—হঠাৎ ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগের সিলেটকে সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়।মনে হয়, মানুষ আসলে কোথাও যায় না।শুধু তার ঠিকানা বদলায়।
হোয়াইটচ্যাপেল লন্ডন প্রবাসীদের দীর্ঘ যাত্রার জীবন্ত দলিল। সাম্রাজ্য থেকে প্রবাসে, জাহাজের ডেক থেকে ব্রিক লেনের দোকানে, লস্করের ঘাম থেকে পরবর্তী প্রজন্মের আত্মবিশ্বাসে।একটি জনগোষ্ঠীর কয়েক প্রজন্মের ইতিহাস এখানে পাশাপাশি হাঁটে।এখানে দাঁড়িয়ে ঔপনিবেশিকতার কথাও নতুন করে মনে হয়।
ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ ছেড়ে গেছে, কিন্তু তাদের তৈরি পৃথিবী থেকে আমরা পুরোপুরি বেরিয়ে আসিনি। বরং সেই পৃথিবীর পথ ধরেই সিলেটের মানুষ লন্ডনে এসে নিজেদের আরেকটি পৃথিবী বানিয়েছে।
এ এক অদ্ভুত ইতিহাস।যারা একদিন সাম্রাজ্যের শ্রমিক হয়ে এসেছিল, তাদের সন্তানরা আজ সেই সাম্রাজ্যের নাগরিক। যারা একদিন জাহাজের নিচতলায় কাজ করত, তাদের উত্তরসূরিরা আজ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে কথা বলে। যারা একদিন পরবাসী ছিল, তাদের ঘর আজ এই শহরেরই অংশ।
সিলেট থেকে লন্ডন—দূরত্বটা মানচিত্রে অনেক।স্মৃতিতে নয়।
সিলেট আর হোয়াইটচ্যাপেলকে আলাদা করতে গেলে হয়তো সমুদ্রের দূরত্ব মাপতে হবে। কিন্তু মানুষের মনে দুটোর মাঝখানে কোনো সীমান্ত নেই।একদিকে সুরমা, অন্যদিকে টেমস।একদিকে চৌহাট্টা, অন্যদিকে ব্রিক লেন।
একদিকে ‘চা খাইয়া যাউক্কা’, অন্যদিকে ‘Come in, have a cup of tea।’
ভাষা আলাদা, শহর আলাদা, ইতিহাসের অধ্যায় আলাদা।
কিন্তু মানুষ?
সে একই।
আর সেই মানুষটির পায়ের চিহ্ন অনুসরণ করেই হয়তো একদিন ইতিহাস লিখবে—সাম্রাজ্য ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সিলেটিরা সাম্রাজ্যের রাজধানীতে গিয়ে নিজেদের একটি সিলেট রেখে এসেছিল।সেই সিলেটের নাম—হোয়াইটচ্যাপেল,না হয় ব্রিকলেন,না হয় বাংলা টাউন।
