গৌতম কে শুভ
১২ সেপ্টেম্বর ভাটি বাংলার এই বাউলের মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৯ সালে ৯৩ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হন।
রেডিওর চেক ভাঙাতে ব্যাংকে গিয়েছিলেন শাহ আবদুল করিম। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি মানুষ হিসেবে সেখানে গেছেন, নাকি পশু হিসেবে! সেটাই যেন বুঝতে পারছেন না। পোশাকই কি তাঁর নাগরিক পরিচয়কে ছোট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট?
এই ছবিতে যে কোট দেখছেন, এটা এই ঘটনারই। ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে ‘খোয়াব’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই দিনের কথা বলতে গিয়ে তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন।
এমন সব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই তৈরি হয়েছিল শাহ আবদুল করিমের গান। তিনি তাই গানে গানে বারবার প্রশ্ন করেছেন মানুষে মানুষে এত ভেদাভেদ কেন। ধর্মের নামে বিভাজন ও বিদ্বেষ তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাঁর ভাবনায় দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো, মানুষের উপকার করা ছিল ধর্মের প্রকাশ। আচার নিয়ে তাঁর মতামতের জায়গাটিও ছিল এখানেই, মানুষের জন্য কিছু না করে শুধু ধর্মীয় পরিচয় বা আচার দিয়ে কী লাভ?
মানুষের এই জায়গাটি করিমের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল নিজের জীবন থেকেই। ভাটি অঞ্চলের দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েছেন তিনি। পড়াশোনার সুযোগ হয়নি ঠিকমতো। বেঁচে থাকার জন্য মোড়লের বাড়িতে গরু রাখালের কাজ করতে হয়েছে। আর সেই গরু চরানোর মাঠেই গান তাঁর সঙ্গী হয়ে ওঠে।
গান শুনতেন, নিজে গাইতেন, রাখাল বন্ধুরা তাঁকে ঘিরে বসে শুনত। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না, জীবন তাঁকে অনেক বেশি শিখিয়েছে। তাঁর গানের স্কুল ছিল মাঠ, হাওর আর মানুষের জীবন।
এই জীবন-অভিজ্ঞতাই তাঁর গানকে অন্যরকম করেছে। হাওরের মানুষ, প্রকৃতি, নদী, নৌকা, বর্ষা ও জীবিকার টানাপোড়েন যেমন তাঁর গানে এসেছে, তেমনি এসেছে দারিদ্র্য, বৈষম্য, কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে প্রশ্ন। পাশাপাশি প্রেম, বিচ্ছেদ, দেহতত্ত্ব ও মনের মানুষের অনুসন্ধানও রয়েছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনেও তাঁর গান ছিল। ভাষা আন্দোলনের পক্ষে গান গেয়েছেন, অংশ নিয়েছেন কাগমারী সম্মেলনে। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাঁর গান মানুষের মধ্যে ছড়িয়েছে। ফলে শাহ আবদুল করিম গানকে বানিয়েছেন জনজীবনের কথা বলার একটি মাধ্যম।
