আজকের বাংলাদেশের মানুষের কাছে শাহ আবদুল করিম ভাটি বাংলার সমৃদ্ধ সংগীতের এক অনন্য শিল্পী। কিন্তু তাঁর যে একটি বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ইতিহাস আছে, তা প্রায় বিস্মৃত।
১৯৫৪ সালের নির্বাচন। গণতন্ত্রী দলের হয়ে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী আবদুস সামাদ তখন সুনামগঞ্জের দিরাই-জগন্নাথপুর আসনে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। যুক্তফ্রন্টের প্রতীক ছিল নৌকা। তাঁর প্রচারণায় কোনো কেন্দ্রীয় নেতা আসেননি। করিমের গান শুনে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়। করিমের নিজের আত্মস্মৃতিতে আছে, নির্বাচনের কাজে এলাকায় এসে সামাদ তাঁর গান শোনেন। পরে তাঁকে ডেকে বলেন, শোষিত মানুষের কথা যে শিল্পী গান করে বলতে পারেন, সেই গান তখন দরকার মুসলিম লীগ সরকারকে উৎখাত করার জন্য। করিমকে সঙ্গে নিয়ে সামাদ গ্রামে গ্রামে প্রচারণা চালান।
আবদুস সামাদ আজাদও বহু বছর পরের এক সাক্ষাৎকারে সেই স্মৃতি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ১৯৫৪ সালে তিনি নৌকার প্রার্থী হয়ে পুরো নির্বাচনী এলাকায় শাহ আবদুল করিমকে সঙ্গে নিয়ে মালজোড়া গানের মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। করিম দোতারা ও একতারা বাজিয়ে নৌকার গান গাইতেন, সামাদ তবলা বাজিয়ে তাঁকে সহযোগিতা করতেন। কখনো দশ গ্রামের মানুষ এক জায়গায় জড়ো হলে সেখানেই চলত গান, তারপর নৌকার পক্ষে ভোট চাওয়া।
পরের বছর, ১৯৫৫ সালে, আবদুস সামাদ আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে কেন্দ্রীয় শ্রম সম্পাদক হন। এর পরের বছর, ২৬ নভেম্বর ১৯৫৬, শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমবার সুনামগঞ্জে আসেন। তখন তিনি পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী। সুনামগঞ্জের জনসভায় শাহ আবদুল করিম তাঁকে নিয়ে নিজের লেখা একটি গান গাইলেন, “পূর্ণচন্দ্রে উজ্জ্বল ধরা, চৌদিকে নক্ষত্রঘেরা, জনগণের নয়নতারা, শেখ মুজিবুর রহমান, জাগ রে জাগ রে মজুর-কৃষাণ।”
করিমের আত্মস্মৃতি অনুযায়ী, গান শুনে মুজিব তাঁকে ১০০ টাকা দেন। আরও বলেন, “আমরা আছি, করিম ভাই আছেন যেখানে।” সেই সফরের সময় সুনামগঞ্জ মহকুমা আওয়ামী লীগের প্রথম কার্যকরী কমিটিও গঠিত হয়। করিম নিজের স্মৃতিতে লিখেন, তিনি তখন সংগঠনের সাংস্কৃতিক সম্পাদক হন। অর্থাৎ ১৯৫৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় যে সম্পর্কের শুরু, অল্প সময়ের মধ্যেই তা রাজনৈতিক সংগঠনের ভেতরেও জায়গা করে নেয়।
১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে টাঙ্গাইলের কাগমারী সম্মেলন। করিম তখন কোনো কাউন্সিলর ছিলেন না। তাঁর আত্মস্মৃতিতে আছে, ডিসি তাঁকে ডেকে বলেছিলেন, সরকার তাঁকে কাগমারীতে যেতে বলেছে। ডিসি তাঁর যাতায়াতের ব্যবস্থা করেন, দেন একশ টাকা ও একটি কম্বল। কোনো কোনো গবেষক দাবি করেন, মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশেই জেলা প্রশাসক এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই দাবির স্বতন্ত্র সূত্র এখানে উল্লেখ নেই, ফলে তা অনুমান হিসেবেই থাকছে।
কাগমারীতে পৌঁছে প্রথমেই মুজিবের সঙ্গে দেখা হওয়ার পরের ঘটনাটি করিম খুব স্পষ্ট করে লিখেছেন। মুজিব তাঁকে দেখে বলেছিলেন, “আমার করিম ভাই এসেছে।” উপস্থিত সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, “আমার করিম ভাই, গণসঙ্গীত শিল্পী।” তাঁর শরীরের খবর নিয়েছিলেন, ডিসি খরচ দিয়েছেন কি না জানতে চেয়েছিলেন। পরে নিজের পকেটে থাকা দেড়শ টাকা বের করে করিমের হাতে দিয়ে বলেছিলেন, “এগিয়ে চল, নাই কোনো ভয়। গণসঙ্গীতগুলো যেন জোরদার হয়।”
একই সম্মেলনে করিম রমেশ শীলের সঙ্গে গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন এবং মওলানা ভাসানীরও সান্নিধ্য পান। কাগমারীর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্মেলনে তাঁর উপস্থিতি সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিসরে তাঁর অবস্থানেরই ইঙ্গিত দেয়।
কাগমারীতে মুজিবের সেই সম্বোধনই হয়তো এই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর শেষ দৃশ্য। ভাটির এক শিল্পীকে সবার সামনে ‘আমার করিম ভাই’ বলে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এমন এক রাজনীতিক, যিনি পরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি হবেন। আর সেই করিম, তখন দোতারা হাতে ভাটির মানুষের গান গাইছেন, একদিন হয়ে উঠবেন বাংলাদেশের প্রাণের সংস্কৃতির অন্যতম প্রতীক।(আওয়ামীলীগ পেইজ)
তথ্যসূত্রঃ
=======
১. করিম, শাহ আবদুল। “অগ্রন্থিত: গান ও আত্মস্মৃতি।” শাহ আবদুল করিম রচনাসমগ্র, সম্পাদনা করেছেন শুভেন্দু ইমাম, বইপত্র, ২০০৯।
২. সুমন কুমার দাস, “বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা প্রথম গান ও শাহ আবদুল করিম”, প্রথম আলো, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০।
৩. আবদুস সামাদ আজাদ, সাক্ষাৎকার, দৈনিক কাজির বাজার, ১৮ জুলাই ২০০১।
