তানভীর হোসেন
একসময় বলা হতো, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না। সেই সাম্রাজ্য বহু আগেই ইতিহাস হয়ে গেছে। এবার প্রশ্ন উঠছে, খোদ যুক্তরাজ্যই কি একদিন ভেঙে যেতে পারে?
প্রশ্নটি নতুন নয়। কিন্তু এবার ঘটনাটা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। স্কটল্যান্ডের এসএনপি, ওয়েলসের প্লাইড কামরি এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের শিন ফেইন, এই তিন স্বাধীনতাপন্থী দলের নেতারা একসঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন।
তাঁদের বক্তব্য, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও আয়ারল্যান্ডের মানুষকে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করার সুযোগ দিতে হবে। অর্থাৎ লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারই সব সিদ্ধান্ত নেবে – এই পুরোনো ব্যবস্থাকে তাঁরা চ্যালেঞ্জ করছেন।
• যুক্তরাজ্য আসলে কী?
আমরা সাধারণভাবে দেশটিকে ‘ব্রিটেন’ বলি। কিন্তু ইউনাইটেড কিংডম বা যুক্তরাজ্য গঠিত ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড নিয়ে।
এদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয় রয়েছে। স্কটল্যান্ডের নিজস্ব পার্লামেন্ট আছে। ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডেরও নিজস্ব আইনসভা ও সরকার রয়েছে। তবে পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা এখনো লন্ডনে ওয়েস্টমিনস্টারের হাতে।
• স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার চেষ্টা
স্কটল্যান্ড ইতিমধ্যেই একবার স্বাধীনতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। ২০১৪ সালে স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট হয়। ফলাফল ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রায় ৫৫ শতাংশ যুক্তরাজ্যে থাকার পক্ষে, ৪৫ শতাংশ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট পড়েছিল।
এরপর আসে ব্রেক্সিট। ২০১৬ সালের গণভোটে পুরো যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে ভোট দিলেও স্কটল্যান্ডের প্রায় ৬২ শতাংশ ভোটার ইইউতে থাকার পক্ষে ছিলেন। এতেই স্বাধীনতার বিতর্ক আবার জোরালো হয়।
• নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের গল্প আলাদা
নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি শুধু স্বাধীনতার নয়। সেখানে মূল প্রশ্ন, একদিন কি এই অঞ্চলটি যুক্তরাজ্য ছেড়ে রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে একীভূত হবে?
১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে অ্যাগ্রিমেন্ট অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এ বিষয়ে গণভোটের আইনি ব্যবস্থা রয়েছে। তাই তিন অঞ্চলের মধ্যে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সাংবিধানিক পথটি সবচেয়ে আলাদা।
• ওয়েলসও কি স্বাধীন হতে চায়?
ঐতিহাসিকভাবে ওয়েলসের স্বাধীনতার আন্দোলন স্কটল্যান্ডের তুলনায় দুর্বল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিষয়টি আরও দৃশ্যমান হয়েছে। প্লাইড কামরি দীর্ঘদিন ধরেই স্বাধীন ওয়েলসের পক্ষে। এবার স্কটল্যান্ড ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে তাদের প্রকাশ্য সমঝোতা তাই প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
• তাহলে কি যুক্তরাজ্য ভেঙে যাচ্ছে?
এখনই নয়।
এই সমঝোতা চুক্তির ফলে আগামীকাল স্কটল্যান্ড স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে না। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডও আলাদা হচ্ছে না। ওয়েলসও যুক্তরাজ্য ছাড়ছে না। এটি কোনো আইনি বিচ্ছেদ চুক্তিও নয়। কিন্তু ঘটনাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অন্য জায়গায়।
যুক্তরাজ্যের ইংল্যান্ড ছাড়া বাকি তিনটি জাতির শক্তিশালী স্বাধীনতাপন্থী রাজনৈতিক দল এখন একই সঙ্গে বলছে, বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামো চিরস্থায়ী ধরে নেওয়া যাবে না।
একসময় পৃথিবীর বিশাল অংশ শাসন করত ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। গত একশ বছরে সেই সাম্রাজ্যের প্রায় পুরোটাই হারিয়ে গেছে। এখন ইতিহাসের এক অদ্ভুত মোড়ে প্রশ্ন উঠছে, একদিন কি ইংল্যান্ডের চারপাশের জাতিগুলোও আলাদা হয়ে যাবে?
উত্তর এখনো অজানা। তবে ব্রিটিশ রাজনীতিতে প্রশ্নটি আর কেবল কল্পনা নয়। এটি এখন বাস্তব রাজনৈতিক আলোচনার অংশ।
