জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে হরহামেশা ভেসে ওঠে নিখুঁত ও আকর্ষণীয় চেহারার তরুণ-তরুণী। শুধু তা-ই নয়, অসম্ভব পেশিবহুল অ্যাথলেটদের ছবিও আমাদের অনেক সময় অবাক করে দেয়। প্রথম দর্শনে অনেককে দেখে সাধারণ মানুষ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি। অর্থাৎ এগুলো সম্পূর্ণ কৃত্রিম রূপ। প্রযুক্তি আমাদের জীবন সহজ করার পাশাপাশি সৌন্দর্য ও শারীরিক কাঠামোর এক নতুন, কিন্তু প্রায় অসম্ভব মানদণ্ড তৈরি করে দিচ্ছে। বাস্তব জীবনে এআই দিয়ে তৈরি নিখুঁত ত্বক, বলিরেখাহীন মুখ বা অতিরিক্ত সুঠাম শরীর পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এই প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত আমাদের সামনে ঠিক সেই ধরনের শারীরিক আদলকেই স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরছে। ফলে তরুণ প্রজন্মের মাঝে তৈরি হচ্ছে চরম মানসিক চাপ ও নিজের শরীর নিয়ে অসন্তোষ।
অবাস্তব ও বৈচিত্র্যহীন শারীরিক কাঠামো
ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর গবেষকদের পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, এআই প্ল্যাটফর্মগুলো অ্যাথলেট ও সাধারণ মানুষের ছবি তৈরিতে মারাত্মক অবাস্তবতা প্রদর্শন করে। এ গবেষণায় এআই দিয়ে তৈরি ৩০০ ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে। এসব ছবির পুরুষদের ৯৩ দশমিক ৩ শতাংশ তরুণ, ৬৮ দশমিক ৪ শতাংশ চর্বিহীন এবং ৫৪ দশমিক ২ শতাংশ পেশিবহুল। অন্যদিকে, নারীদের ছবির ক্ষেত্রে শতভাগ ছবির নারীই বয়সে তরুণ, তাঁদের ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত পাতলা এবং ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ অনাবৃত বা রিভেলিং পোশাক পরা। অ্যাথলেটদের ৯৮ দশমিক ৪ শতাংশ ছবি অতি-চর্বিহীন এবং ৯৩ দশমিক ৪ শতাংশ অত্যন্ত পেশিবহুল। শুধু ‘একজন অ্যাথলেট’-এর ছবি চাইলেও এআই ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে কেবল পুরুষের ছবি তৈরি করে। এসব ছবিতে কোনো ধরনের শারীরিক অক্ষমতা, অতিরিক্ত চর্বি, বলিরেখা বা টাকপড়া মানুষের দেখা মেলে না। অর্থাৎ, এআই মানুষের শরীর একমুখী ও অবাস্তব এক ছাঁচে ফেলে উপস্থাপন করছে।
কী কারণে এই পরিবর্তনগুলো আসছে
এআই নিজে থেকে কোনো ছবি বা বৈচিত্র্য তৈরি করে না। এটি ইন্টারনেটে থাকা কোটি কোটি পুরোনো ডেটা ও বৈষম্যমূলক ছবি বিশ্লেষণ করে শিখছে। আমাদের সমাজে আগে থেকে প্রচলিত মেদহীন ও নিখুঁত সৌন্দর্যের অন্ধ পক্ষপাত এআই অ্যালগরিদমগুলো পুনরুৎপাদন করে আমাদের সামনে ফেরত দিচ্ছে। কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিয়া পেরুমাল এবং মার্কেটিং ফ্রিল্যান্সার কেলি ওয়াটস সতর্ক করে জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআইয়ের তৈরি এসব ছবি চিহ্নিত বা লেবেল না করে ছড়িয়ে দেওয়ায় শিশুরা বেশি প্রভাবিত হচ্ছে। ১২ বছর বয়সী কিশোরীরাও এআইয়ের তৈরি রূপকে নিজের ‘স্বপ্নের শরীর’ ধরে নিয়ে চরম মানসিক কষ্টে ভুগছে।
শরীর ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব
সেন্টার ফর অ্যাপিয়ারেন্স রিসার্চের সাইকোলজির অধ্যাপক ফিলিপা ডিডরিচস জানান, সোশ্যাল মিডিয়ায় শারীরিকভাবে নিজেকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা মানুষের সহজাত। কিন্তু তুলনাটি রক্ত-মাংসের মানুষের পরিবর্তে নিখুঁত রোবট বা কৃত্রিম ছবির সঙ্গে হলে তরুণদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়ে। কার্ডিফ বিজনেস স্কুলের গবেষক জো লি এবং হান্না ম্যারিয়ট তাঁদের গবেষণায় দেখিয়েছেন, মানুষ যখন বুঝতে পারে, কোনো মডেল কৃত্রিম, তখন তারা সেই ছবি থেকে নিজেদের মানসিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে নেয় এবং নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি অবাস্তব ছবি ব্যবহারের কারণে তরুণদের স্বাস্থ্যকর শারীরিক চর্চা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার এবং খাবারের ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যাচ্ছে। এআইয়ের ব্যবহারে শতভাগ সচেতনতা ও প্রযুক্তি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনার মাধ্যমেই এই কৃত্রিম সৌন্দর্য ভীতি দূর করা সম্ভব বলেও জানিয়েছেন গবেষকেরা।
সূত্র: বিবিসি, দ্য কনভারসেশন
