ফ্রান্সে ব্যাপক ছাত্রবিক্ষোভে প্রলয়ঙ্করী অবস্থা। শতশত সরকারি ভবন, গাড়ি, প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট ভাঙ্গচুড়ের ঘটনা ঘটছে। সারা দেশে লক্ষ লক্ষ ছাত্রের আন্দোলনে জনজীবন প্রায় অচল। আন্দোলন চলাকালে পুলিশ গ্রেফতারই করেছে প্রায় ৬ হাজার বিক্ষোভকারীকে!
কিন্তু পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমে কোন খবর আছে? নেই। বাংলাদেশের কোন পত্রিকায় কোন সংবাদ আছে? না। কিন্তু বাংলাদেশের পত্রিকায় পাবেন ভারতের ককরোচ পার্টির৷ বিশাল সংবাদ। প্রতিবেশি ভারতে কি ফ্রান্সের চেয়ে বড় আন্দোলন হয়েছে, চলছে? কয়জন গ্রেফতার হয়েছে ভারতে? কতটা প্রলয় তৈরী করেছে তাদের ছাত্র বিক্ষোভ? ভারতে গ্রেফতার হয়েছে মাত্র ৬শ জন, দেড়শো কোটি মানুষের মধ্যে। আর ফ্রান্সে ৬ কোটির মধ্যে গ্রেফতার হয়েছে ৬ হাজার জন! ভাবতে পারেন কত বড় আন্দোলন?
কিন্তু মিডিয়া বলছে এই বুঝি ভারতের সরকার পড়ে গেল। ইরানে যখন সরকার বিরোধী বিক্ষোভ হয় তখন মানবাধিকার থাকে না, কিন্তু ফ্রান্সে হলে সেটা ঠিক আছে। সেখানে সরকার ফেলানোর কোন ছক থাকে না? কেন না? এর নামও রাজনীতি!
এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে বামপন্থীরা। ক্ষমতাসীন ও পশ্চিমা মিডিয়া আবার যাদেরকে বলছে উগ্রবামপন্থী। এই উগ্রবামপন্থীরা সংসদে তৃতীয় বৃহত্তম দল হলেও এরাই আসলে প্রকৃত বিরোধী দল। এরাই জনজীবনের সংকট নিয়ে, বৈষম্য ও সরকারের আগ্রাসন ও সাম্রাজ্যবাদীতার তীব্র বিরোধীতা করে।
ফ্রান্সের সংসদে মোট সিটের সংখ্যা ৫৭৭টি। সরকার গঠনের জন্য দরকার ২৮৯টি। এই পরিমান সিট কোন একক দলের নেই। প্রেসিডেন্ট ম্যাঁখোর দল ক্ষমতায় থাকলেও সংসদে তাদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। তাদের আছে মাত্র ৯০টি আসন। ফলে তাদেরকে বিভিন্ন দলের সমর্থন-সমঝোতায় ক্ষমতায় থাকতে হচ্ছে।
সংসদের প্রধান বিরোধী দলটি (ন্যাশনাল র্যালি – RN), চরম ডানপন্থী একটি দল। তারা প্রচন্ড অভিবাসন, ইসলামাইজেসন বিরোধী ও উগ্রজাতীয়তাবাদী এক রক্ষনশীল দল। সংসদে তাদের আসন আছে ১১৮টি। তাদের আন্দোলন-রাজনীতি মূলত জনজীবনের সংকটের থেকে ক্ষমতাকেন্দ্রীক।
তৃতীয় বৃহত্তম বামপন্থী তিন দলের (লা ফ্রঁস ইনসুমিজ LFI, সোসালিস্ট পার্টি PS, পরিবেশবাদী Ecologists) সংসদের আসন রয়েছে ১৭৫টি আসন (LFI ৭০টি, PS ৬৭টি, Ecologists ৩৮টি)। এরাই আসলে সংসদের প্রধান বিরোধী শক্তি।
ফলে ফ্রান্সের রাজনীতি এখন তিনভাগে, তিন মেরুতে বিভক্ত। উদার ডান, চরম-ডান ও বামপন্থী। এই বামপন্থীদের নেতৃত্বে ও সমর্থনেই ফ্রান্সে ব্যাপক আন্দোলন হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে অধিক বরাদ্দ না দিয়ে, শিক্ষক-নার্স, কর্মচারি নিয়োগ না দিয়ে, মূল্যস্ফীতি না কমিয়ে, বেকারত্ব ঘুচাতের কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে অস্ত্র ও সামরিক খাতে দ্বিগুণ বরাদ্দের তীব্র বিরোধীতা করছে বামপন্থীরা। নিজ দেশের নাগরিকদের বঞ্চিত করে, ইউক্রেনের যুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী ছকে কারি-কারি টাকা ঢালার তারা তীব্র বিরোধী। এটাই হচ্ছে ফ্রান্সের চলমান ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ ও জ্বালাও পোড়াও আন্দোলনের প্রধান কারণ। যেখানে স্বতস্ফুর্তভাবে যোগ দিয়েছে লক্ষ লক্ষ ছাত্র-জনতা।
সরকার স্বতস্ফুর্ত এই আন্দোলনকে দমন-পীড়নের পুলিশি নীতি নিলে ছাত্ররা ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পুলিশ এখন পিছু হটে যাওয়ায় ফ্রান্সের বীর ছাত্ররা রাজপথ দখল নিয়েছে। ছবিতে দেখছেন ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের কেন্দ্রে অবস্থিতি বিশ্বখ্যাত আইফেল টাওয়ারে দখলে নিয়েছে ছাত্ররা। এখানে প্রায় ৮ লাখ লোক জড়ো হয়েছে, সারা দেশে প্রায় ৩৫ লাখ বিভিন্ন স্থানে সমাবেত হয়েছে। সেখানে তারা সঙ্গীত-নৃত্য চলছে, বাদ্য বাজছে, ম্যাঁখো সরকারের বিরুদ্ধে গগন বিদারি স্লোগান দিচ্ছে। অনেকে তার পদত্যাগেরও দাবী করছে। সরকার কিছু দাবী মেনে নিলেও পুরোটা গ্রহণ করেনি।
আন্দোলনকারীরা বলছে, তাদের ব্যাপক বিক্ষোভে কিছু দুস্কৃতিকারি প্রবেশ করে জ্বালাও-পোড়াও করে তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করে জন সমর্থনের ক্ষতি করতে চেষ্টা করছে। তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে সরকার সংলাপ ও শান্তির ডাক দিয়েছে। কিন্তু এখনো অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট চলছে, বিক্ষোভ অব্যাহত আছে।
