আফজাল হোসেন
০১
আমাদের এক বন্ধু এখন দেশ বিদেশ করে জীবন কাটায়। কেমন লাগে জিজ্ঞাসা করলে হাসে। আমরা বলি, এমন জীবন তো সুখের, আনন্দময়ই হওয়া উচিত।
দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়া তার স্ত্রীর কথা বলে সে। বলে, আমার জীবন খালি করে যেদিন ও চলে যায়, মনে হতো, ওর চলে যাওয়া মানে, জীবন শেষ হয়ে গেলো। না শেষ হয় না। জীবন আসলে অনেকগুলো অধ্যায়ের সমষ্টি।
এক অধ্যায় চলে যায়, আর একটা এসে হাজির হয়। জীবন কারো ইচ্ছা মত মতো চলে না। নিজের মতো, নিজস্ব নিয়মে গড়িয়ে চলে।
এ অধ্যায়ে আমি কেমন আছি, এক কথায় বলতে পারবো না। ভালো আছি বলাই উচিৎ। যেমন করে জীবন কাটছে এটাকেই সবাই ভালো থাকা বলবে। একটু একা হলে নিজেকে প্রশ্ন করি, এমন ভালো কি চেয়েছিলাম!
০২
বেশিরভাগ সময় এখন বন্ধুটিকে বিদেশে মেয়ে জামাইয়ের সাথে থাকতে হয়। অতি অল্পবয়সী দুটো নাতনির কথা মনে হতেই তার চোখ মুখে ফুটে ওঠে অতি আনন্দের উদ্ভাস। সে বলে, ওরাই হচ্ছে সব হারিয়ে ফেলার পর সব পূর্ণ করে দেয়া প্রাপ্তি।
আমরা বলি, তোর এখন এ জীবনই সুখের, উপভোগ্য মনে করা উচিৎ। মেয়ে এবং জামাই তোকে একা দেশে পড়ে থাকতে দেবে না, এটাও প্রাপ্তি রে। সে হাসে। বলে, জীবনকে আমরা নদীর সঙ্গে তুলনা করি। নদীর থাকে দুইটা তীর। জীবনও দুই তীরের।
আমি একা বলে দেশে থাকতে পারি না। বিদেশে বহু মানুষ একলা জীবন কাটায়। যারা একা, কারো উপর নির্ভরশীল নয় তারা। জীবন, বেঁচে থাকা নিয়ে কোনো অভিযোগ, অসহায়ত্ব নেই তাদের। দেশ তাদের পদে পদে মনে করিয়ে দেয়, পাশে আছি। সকল রকম মানুষের অধিকার নিয়ে সেখানে ভাবা হয়। এ অনুভবই জীবনে সুখ শান্তি ও স্বস্তি যোগ করে।
বন্ধুটি জানায়, দেশে আসবার জন্য মন অস্থির হয়। আসবার সময় কাছে এলে মনে মনে সে দিন গুনতে থাকে, আর মাত্র পাঁচ দিন, আর মাত্র তিন দিন। তারপর উড়াল দেবার দিন আসে। মেয়ে, জামাইয়ের উদ্বিগ্ন মুখ পিছনে রেখে দেশের উদ্দেশ্যে ওড়ে আকাশে।
প্লেনে বসে সে সময় গুনতে থাকে। কতক্ষণ লাগবে প্রাণের শহর ঢাকার মাটি ছুঁতে।
০৩
বন্ধুটি এই পর্যন্ত বলে থামে। মুখের হাসিটায় সামান্য বদল আসে। বলে, প্লেনটা মাটিতে নেমে দাঁড়ানো মাত্র যাত্রীরা যা শুরু করে দেয়, তা খুবই অবাক করে। সবারই জানা, দ্রুত নেমে কোনো লাভ নেই, লাগেজের জন্য লম্বা সময় তো অপেক্ষা করতেই হবে।
যাত্রীদের ছটফটানি, তাড়াহুড়ো করা দেখে বিমানের ক্রুরা অনুরোধ করতেই থাকে, দয়া করে সীটে বসে থাকুন, বসে থাকুন এখনই দাঁড়িয়ে পড়বেন না।
কেউ কথা কানে তোলে না। শোনে না। মান্য করে না অনুরোধ। দেশে পৌঁছানোর আনন্দ
০৪
কারো অনুরোধ কানে তোলার রীতি দেশে নেই। সবকিছুকে অমান্য করে চলাই হচ্ছে চালু রীতি। রীতি হচ্ছে, হঠাৎ তর্কে লিপ্ত হওয়া, ধমকের সুরে কথা বলা।
প্রায় প্রত্যেক মানুষই কথায়, আচরণে বোঝাতে চায়, আমার দাম আছে। এখানে কেউই কারো উপর সন্তুষ্ট নয়। সবাই অভিযোগ করতে ভালোবাসে, দোষ ধরতে, দোষী সাব্যস্ত করতে ভালোবাসে। কোটি কোটি মানুষ রোজ দেশ ভালো নেই, দেশ ভালো নেই বলে অসন্তোষ প্রকাশ করে। তাতে লাভ হয় না, লোকসান বাড়ে।
০৫
এক বন্ধু ফোড়ন কাটে, বুঝেছি খানিকটা বিদেশী হয়ে উঠেছিস। উত্তরে সে বলে, এসব কথা বাইরে বলি না। বলি না এরকম মন্তব্য শুনতে হবে বলে।
ধোঁয়া ওড়া চা আসে সাথে গরম সিঙ্গাড়া। সে সিঙাড়া হাতে নিয়ে বলে, পুরি সিঙাড়া খুব মিস করি। মিস করি জিলাপি, ছোলা বুট।
গরম চায়ে চুমুক দিয়ে সে গরম একটা অভিজ্ঞতার গল্প শোনায়। এক অফিসের দ্বিতীয় বড় কর্তার কাছে সে গিয়েছিল একটা সমস্যা নিয়ে। ভদ্রলোক সমস্যার কথা আধা শুনেই বুঝে গেলেন পুরোটা। তারপর সমাধানের জন্য কত টাকা ঘুষ দিতে হবে সরাসরি বলে ফেললেন।
বন্ধুটি খুবই অবাক হয়। বলে, ঘুষ দাবী করা লোকটার চোখে মুখে কোনো সংকোচ, দ্বিধা, লজ্জা, ভয় কিছুই দেখলাম না। আমাকে চা অফার করেন তিনি। তাঁকে আমার পূর্ব পরিচয় দেই। সে পরিচয়কে মোটেও পাত্তা দিলেন না।
দেশে থাকিনা সেটা বলতে হয়েছিল। ঘুষখোর সে লোকটা খুবই হতাশ ভঙ্গীতে বলেন, দেশের খুবই খারাপ অবস্থা। আপনাদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সুযোগ আছে, চলে গেছেন। আমরা নিরূপায়, আমাদের এখানেই মরে পঁচতে হবে।
০৬
তারপর সেই আড্ডায় আমরা পাঁচ বন্ধু আমাদের নানা অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুরু করি। আমাদের গল্পের অভাব হয় না। সবই মন্দ অভিজ্ঞতার গল্প। বলে কেউ দুঃখ করি না। দুঃখ হয় না। হাসি। তার মানে, আমরা দুঃখের কথাতেও হাসতে শিখে গেছি।
বন্ধুটি বলে, বিদেশে থাকতে হয় বলে দুঃখের কথায় হাসতে পারার অভ্যাসটা তৈরি হয়নি।
