ইমতিয়াজ মাহমুদ
না, একা একা বিদেশে যাওয়ার সময় নারীদের এই প্রশ্ন আগেও শুনতে হয়েছে। তসলিমা নাসরিন তো সেই কবেই লিখেছিলেন তার নিজের অভিজ্ঞতার কথা। বিদেশে যাচ্ছেন, এয়ারপোর্টে তাঁকে ইমিগ্রেশনের লোকজন জিজ্ঞাসা করেছে, একা যাচ্ছেন? সাথে কেউ নেই কেন? মূল কথাটা হচ্ছে যে মেয়েছেলে একা একা বিদেশে যাবে কেন বা ঘুরতে যাবে কেন! সাথে পুরুষ থাকতে হবে। প্রবণতাটা খানিকটা কমেছিল এর মধ্যে- আমাদের দেশ থেকে মেয়েরা অনেকেই একা একা বেড়াতে যায় এখন- দেশের মধ্যে তো বটেই, দেশের বাইরেও।
কিন্তু তিনটা মেয়ে একসাথে নেপালে যাবে ওদেরকে এয়ারপোর্টে একদম আটকেই দিতে পারে ইমিগ্রেশনের লোকেরা- সাথে পুরুষ সঙ্গী নাই বলে- এরকম অবস্থা তো এই দেশে গত তিরিশ বছরে কখনো ছিল বলে মনে পড়ছে না। তাইলে এই যে কদিন আগে যে তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে ইমিগ্রেশনে আটকে দেওয়া হলো, এরকম ঘটনা কি করে ঘটলো? আপনি একটু ভেবে চিনতে বলুন তো, গত কছুদিনের মধ্যে এই দেশে এমন কি পরিবর্তন হয়েছে যে পেট্রয়ার্কি এতোটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে যে এইরকম ঘটনা ঘটবে!
আমি একটা মতামত দিতে পারি, মতামতটা আপনাদের পছন্দ হয় কিনা দেখেন।
চব্বিশের যে আন্দোলনটা হয়েছে সেটা হয়েছে জামাতের নেতৃত্বে। সামনে অন্য অনেকেই ছিল- আমাদের সিপিবির কিছু লোকজনও ছিল, বাসদের লোকজন ছিল, নারীরাও ছিল, কিন্তু আন্দোলনটার মালিকানা ছিল জামাতের। ওদের সাথে মূল সহযোগী শক্তি ছিল হেফাজত খেলাফত নেজামত এইরকম নানা নামের ইসলামী দল ও সংগঠনগুলি। আর মাওবাদীরা বা সাবে মাওবাদীরা ছিল- এরা তো দুইজন তিনজনের দল একেকটা, ওদের আওয়ামী লীগ বিরোধিতার জন্যে টিভিতে আর ঢাকার সারাটায় উপস্থিত থাকা ছাড়া বিশেষ কোন ভূমিকা ছিল না।
জামাত এবং ওর মূল সহযোগীরা সবসময়ই চেষ্টা করেছে দেশকে একটা মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত করতে। আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হওয়ার পর ইসলামপন্থী মৌলবাদী চিন্তার লোকেরা তো একরকম যেন গোটা দেশের নিয়ন্ত্রণই পেয়ে গিয়েছিল। তখন ওরা রাষ্ট্রের সবকিছুই মুসলিম চেতনা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করতো, আর ওদের বিরোধ করলে আক্রমণ করতো, মারধোর করতো মানুষকে। সমাজের সর্বত্র নারীবিদ্বেষ বৃদ্ধি পেয়েছে সীমাহীন মাত্রায়। এখন জেতা এয়ারপোর্টে ঘটেছে, সেটা তারই ফল।
আপনাদের মনে আছে কিনা জানিনা, ইউনুস সাহেব একটা নারী কমিশনও গঠন করেছিলেন। সেই কমিশনের রিপোর্ট হাতে পেয়ে সেটা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও করেছিলেন। দুই একদিন পরই দেখা গেল যে ইসলামপন্থীরা সভা করে সেই কমিশনের সদস্যদের আচ্ছা করে গালাগালি করলেন, তসলিমা নাসরিনকেও গালাগালি করলেন, সাধারণভাবে সকল নারীবাদী ও নারী অধিকার কর্মীদেরকেও গাল্গালি করলেন। ইউনুস সাহেব এবং তার সরকার নারী কমিশনের রিপোর্ট হজম করে ফেললো পরিষ্কার।
একদিন নিশ্চয়ই গবেষকরা এটা নিয়ে আলোচনা করবেন, লিখবেন, স্টাডি করবেন। আমার দৃষ্টিতে জেন্ডার ইস্যু বিবেচনায় চব্বিশের আন্দোলন একটি নারীবিরোধী তথা নারীর অধিকার বিরোধী আন্দোলন ছিল। না, নারীরা কেউ কেউ ছিলেন নেতৃত্বের ভূমিকায়। সিপিবি বাসদ ওরাও ছিল, ওরা তো মোটেই পিতৃতান্ত্রিক দল নয়। কিন্তু আন্দোলনের মূল পেট্রন বা চালকের ভূমিকায় এরা ছিল না। সেই আন্দোলনে ওদের যোগ দেওয়া ভুল ছিল কিনা সেটা তো ভিন্ন কথা, কিন্তু ওদের আদর্শে আন্দোলন হয়নি।
শোনেন, যেসব রাজনৈতিক দল আন্দোলনে বিজয়ের পর প্রথম সুযোগেই বেগম রোকেয়ার ম্যুরালে কালি মাখে, বেগম রোকেয়াকে গালি দেয়, ওদের প্রভাব বাড়বে আর নারীদের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ হবেনা এটা কি হয়? হতে পারে? আপনিই বলুন।
